এসব নির্দেশ খ্রিস্টজন্মের তের-চৌদ্দশ বছর পূর্বে মুসা ও হারুণকে নিস্তার পর্বের বলি বা কোরবানীকৃত পশুসমূহের অস্থি ও মাংসের ব্যবহার সম্বন্ধে দেয়া হয়। এরমধ্যে কোরবানীকৃত পশুর হাড় ভাঙ্গতে নিষেধ করা হয়েছিল মুসার সমসাময়িক ইহুদীদেরকে। এরসাথে যীশুর ক্রুশে আবদ্ধ হওয়ার বা তার পা না ভাঙ্গার বিন্দুমাত্রও সম্বন্ধ-সংস্রব নেই। আসল কথা এই যে, যীশুর পরবর্তী সুসমাচার লেখকেরা তাদের আবিষ্কৃত অভিনব খ্রিস্টধর্মের সমর্থন-সংগ্রহের আগ্রহাতিশয্যের ফলে, এভাবে নিজেদেরকে বিচারের দৃষ্টিতে হেয় করে ফেলেছেন। পূর্বেই বলা হয়েছে, পীলাতের আদেশ অনুসারে তাঁর সৈন্যেরা অন্য দু’জন অপরাধীর পা ভেঙ্গে দিয়েছিল; কিন্তু যীশুর পা ভাঙ্গতে বিরত হয়েছিল। সে সময়ের পূর্বেই যীশু মরে গেছেন বলে তারা বিরত থাকে–এটা পরবর্তীকালের একটি দুষ্ট কল্পনা। যীশুর সাথী অপরাধীদ্বয় যে তখনও বেঁচেছিল, এটা তারাও স্বীকার করেছেন; আর পীলাতের সতর্কতা ও সহানুভূতি সত্ত্বেও যীশু তাদের পূর্বেই মরে গেলেন, এর কোনই কারণ থাকতে পারে না। কোন ব্যক্তিকে কুশে দিলে সে একদিনে মরত না। ক্রুশবিদ্ধ অবস্থায় অনেকে সাতদিন পর্যন্ত জীবিত থাকত। ক্রুশ শূল নয়, পরন্তু ত্রিশুল কাঠ, যাতে অপরাধী ব্যক্তির হাত, পা ও স্বন্ধের চামড়া টেনে পেরেক ঠুকে টাঙ্গিয়ে দেয়া হত। যাহোক, যীশুকে মাত্র কয়েক ঘন্টা ক্রুশে রাখার পর নামানো হয়। যখন তাঁকে ক্রুশ থেকে নামানো হল তার পূর্বে একজন সৈনিক বর্শা দিয়ে তার পার্শ্বদেশে আঘাত করল, আর সাথে সাথে তরল রক্ত বের হল (যোহন, ১৯ : ৩৪)।
উল্লেখ্য যে, লন্ডনে মুদ্রিত বৃটিশ ও বিদেশী বাইবেল সোসাইটির যোহন লিখিত সুসমাচারের ১৯ অধ্যায় ৩৪ পদের এই বর্ণনার অর্থ তখনও যীশু জীবিত ছিলেন। কারণ, কোন মৃতদেহ থেকে রক্ত বের হয় না, বরং কোন দেহে রক্তের বর্তমান তা জীবনের অভ্রান্ত লক্ষণ।
একটু দৃষ্টিপাত করলেই স্পষ্ট হয়, নিস্তার-পর্বের বলিকৃত পশুর অস্থির ভাঙ্গার নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছিল যীশু-জন্মের তের-চৌদ্দশ’ বছর পূর্বে হযরত মুসার সময়। অধিকন্তু, সে আদেশে বলা হয়েছে : বলিকৃত পশুর একখানি অস্থিও তোমরা ভেঙ্গো না। পক্ষান্তরে, সাধু যোহন খ্রিস্ট-জন্মের তের-চৌদ্দশ’ বছর পূর্বের ঐ আদেশের উল্লেখ করেছেন : বলিকৃত পশুর স্থলে আল্লাহর প্রিয় নবী হযরত ঈসার উপর অকর্মক ক্রিয়া হিসেবে ‘তার’ স্থলে ‘তাঁর’ বসিয়ে ‘নির্দেশের’ স্থলে ‘সংবাদ’ হিসেবে ‘তাঁর একখানি অস্থিও ভাঙ্গা হবে না’ বলে।
যাহোক, পীলাত ও হেরোদ উভয়েই যীশুকে নিরপরাধী বলে স্বীকার করেছেন এবং রক্তলোলুপ ইহুদীদের পৈশাচিক কবল থেকে রক্ষা করার জন্য যীশুর প্রকৃত শিষ্য হাওয়ারীদেরকে গোপনে সাহায্য-সহায়তাও করেছিলেন। হাওয়ারী-সমাজ সম্বন্ধে আলোচনায় প্রবৃত্ত হওয়ার পূর্বে ভূমিকা হিসেবে একটি প্রাসঙ্গিক বিষয়ের অবতারণা করা হচ্ছে :
যীশু যখন ইহুদীদের দ্বারা গ্রেফতার হলেন, “তখন শিষ্যরা তাকে পরিত্যাগ করে পালিয়ে গেল” (মখি, ২৬ : ৫৬; মার্ক, ১৪ : ৫০), প্রধানতঃ এরইফলে কুশের ব্যাপারে কোন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য-বিবরণ সুসমাচার চতুষ্টয়ের কোন স্থানে দেখা যায় না। পরবর্তী যুগের এই সুসমাচারগুলোতে যেসব বিবরণ পাওয়া যায়, সেসব অনেক পরবর্তী সময়ের সংকলন এবং খ্রিস্টান-প্রধানদের নব আবিষ্কৃত প্রায়শ্চিত্তবাদ বা Atonment theory-কে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যই এই মতবাদের আবিষ্কার হয়েছিল।
যীশু যখন গ্রেফতার হলেন, “তখন শিষ্যরা তাকে পরিত্যাগ করে পালিয়ে গেল” বাইবেলের এই বর্ণনাকে সম্পূর্ণ সত্য বলে গ্রহণ করা যায় না। প্রকৃত কথা এই যে, যীশুর আবির্ভাবের প্রথম অবস্থা থেকেই শক্তগ্রীব’, ইহুদী জাতি তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করে আসছিল। তার প্রভাব প্রতিপত্তি ক্রমশঃ বেড়ে চলছে দেখে অবশেষে যীশুকে তারা হত্যা করার ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছিল। এজন্যই যীশুকে তারা যুগপৎভাবে রাজদ্রোহী ও ইহুদীদের বিপথগামী করছে বলে সমাজে এবং রাজদরবারে অভিযোগ আনা হয়।
সাধারণ নিয়মানুসারে যীশুর শিষ্যদের মধ্যে একদল ছিল সত্যিকার ধর্ম পরায়ণ, সত্যিকার বিশ্বাসী ও আত্মসমর্পিত মুসলিম’। আর একদল ছিল লঘুচেতা ও ছদ্মবেশী বিশ্বাসঘাতক। এই শেষোক্তদলের লোকেরাই যীশুর বিপদের সূচনা দেখে পালিয়ে যায় আর তাদের অনেকেই তাকে ইহুদীদের হাতে ধরিয়ে দিয়েছিল। এমনকি, বিপদের চরম অবস্থায় এই ভণ্ডের দল তার প্রতি হীন ব্যবহার করতেও কুণ্ঠাবোধ করেনি।
পক্ষান্তরে, যীশুর সত্যিকার শিষ্য ‘হাওয়ারীদল ইহুদীদের দূরভিসন্ধি প্রথম থেকেই সতর্কতার সাথে অনুসরণ করে আসে এবং অনতিবিলম্বে যীশুর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ যে রোমান আদালতে উপস্থিত করা হবে, তাও তারা অবগত ছিল।
উপরে যাদের সম্বন্ধে ইঙ্গিত করা হল, তাদের অবস্থা সম্বন্ধে সন্ধান নিলে জানা যাবে যে, গ্রীক দর্শন, বিজ্ঞান বিশেষতঃ দ্রব্যগুণ ও চিকিৎসাশাস্ত্রের সাথে তারা সুপরিচিত ছিল। পীলাত যদি ইহুদীদের আন্দোলনে ভীত হয়ে পড়েন এবং যীশুকে ক্ৰশে টাঙ্গিয়ে নিহত করার আদেশ দিয়ে বসেন, সে অবস্থায় যীশুকে রক্ষা করার আর কোনই উপায় থাকবে না এটা তারা ভাল করেই বুঝেছিল, পীলাত ও অন্যান্য রাজকীয় কর্মচারীদের সাথে তারা মোটামুটিভাবে একটি ব্যবস্থাও করে রেখেছিল। এমনকি, ক্রুশে আবদ্ধ করে নিহত করার দণ্ডপ্রাপ্ত আসামীদের জন্য তদানীন্তন দণ্ড-বিধিতে ‘পা ভেঙ্গে দেয়া’ ইত্যাদি যে সমস্ত প্রাথমিক শাস্তির ব্যবস্থা ছিল, যীশুর প্রতি যাতে সেসবের প্রয়োগ না হতে পারে, তার ব্যবস্থাও তারা পূর্বথেকেই করে রেখেছিল।
০৪. ভূমিকার বদলে
ড. মরিস বুকাইলি তাঁর গবেষণা ও পর্যালোচনা শেষে একটি সুস্পষ্ট সত্য বের করে এনেছেন, আর তা হল : এখন আমাদের নিকট আসমানী কিতাব হিসেবে যে-কয়টি ধর্মগ্রন্থ বিদ্যমান, সেসব ধর্মগ্রন্থ সম্পর্কে পাশ্চাত্য জগৎ অথবা পাশ্চাত্য-শিক্ষিত কোনো কোনো মহল যে ধারণা বা মনোভাব পোষণ করেন, তাদের সেই ধারণা এবং মনোভাব তাঁদের অজ্ঞতারই প্রকাশ। কারণ, তাদের সেই ধারণা ও মনোভাব আদৌ সত্যতো নয়ই, বরং তাদের পূর্ণধারণাই ভিত্তিহীন বা অলীক।
