ইতিপূর্বে দেখা গেছে,
“পীলাত সমস্ত প্রধান পুরোহিত ও অধ্যক্ষ সকলকে এবং জাতির, লোককে ডেকে একত্র করলেন ও তাদের বললেন, লোকটি জাতিকে বিপথগামী করছে বলে তোমরা তাকে আমার সামনে উপস্থিত করেছ; আর আমি তোমাদের সাক্ষাতে অনুসন্ধান করে, তোমরা এঁর নামে যে যে দোষারোপ করেছ তার কোনও দোষ এর মধ্যে পাইনি; হেরোদও পাননি; কারণ তিনি তাঁকে আমাদের কাছে ফেরৎ পাঠিয়েছেন; বাস্তবিক প্রাণদণ্ডের যোগ্য কোন কাজ এ করেনি; অতএব আমি তাকে শাস্তি দিয়ে ছেড়ে দেব।” (লুক, ২৩ : ১৩-১৬)।
সুতরাং, বাইবেল থেকেই প্রমাণিত হচ্ছে যে, পীলাত যীশুকে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করতে কখনো প্রস্তুত ছিলেন না এবং বিপুল ইহুদী জনতার সামনে নিজের এই সংকল্পকে প্রকাশ্যভাবে ঘোষণা করতেও তিনি কুণ্ঠিত হননি। যীশুর প্রাণরক্ষার জন্য তিনি বাস্তবে যা করেছিলেন, তার কয়েকটি প্রমাণ নিমে উদ্ধৃত করা হলঃ
এক. পীলাত যীর বিচার উদ্দেশ্যমূলকভাবে শুক্রবারে করেছিল এবং তার রায়কে কার্যকর করার জন্য সে উদ্দেশ্যমূলকভাবে সেদিনই আদেশ জারী করেছিল, কারণ সে জানত যে পরদিন পবিত্র সাবাত এবং যীশুকে শুক্রবার সূর্য অস্ত যাওয়ার পূর্বেই ক্রুশ থেকে নামিয়ে নিতে হবে।
দুই. যীশুকে ক্রুশে দেয়ার পূর্বে এবং পরেও সিরকা এবং মদ জাতীয় দ্রব্য পান করতে দেয়া হয়, যাতে তিনি বেহুশ থাকেন এবং তার কষ্ট কম হয়।
তিন. ইহুদীদের ব্যবস্থাশাস্ত্রে নির্দেশিত (দ্বি: বিঃ ২১ : ২২-২৩)। মুসার বিধি-ব্যবস্থায় বর্ণিত বিধানের যাতে ব্যতিক্রম করা না হয় সেজন্য ইহুদীদের অনুরোধে পীলাতের নির্দেশে তাঁর সৈনিকেরা যীশুর সাথে ক্রুশবিদ্ধ দু’ব্যক্তির পা ভাঙ্গে, কিন্তু যীশুর পা ভাঙ্গতে বিরত থাকে।
পীলাত যে কেমন সতর্কতার সাথে নিজের প্রতিজ্ঞা পালন করে আসছিলেন, শেষোক্ত ঘটনাটিই তার উজ্জ্বল প্রমাণ। এর কৈফিয়ত দিতে গিয়ে খ্রিস্টান লেখকদের কেউ কেউ যে-সব যুক্তি প্রদান করেন, তার সারমর্ম এই যে, রাজকীয় সৈনিকেরা মনে করেছিল যে যীশু ইতিমধ্যে মরে গেছেন, সুতরাং তাঁর পা ভাঙ্গার প্রয়োজন নেই। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে যীশুকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যই যে দেশাধ্যক্ষ পীলাতের ইঙ্গিত অনুসারে তার সৈনিকেরা যীশুর ভাঙ্গতে বিরত হয়েছিল ঐশ কাহিনীর আনুষঙ্গিক বিবরণ থেকেই তা প্রমাণিত হয়।
“ক্রুশে যীশুর মৃত্যু হয়েছিল, অথচ তার পা ভাঙ্গা হয়নি”–এই পরস্পর বিরোধী উক্তির কৈফিয়ৎ দিতে গিয়ে খ্রিস্টান প্রচারকেরা বাইবেলের নিমোক্ত উক্তিটি প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেন :
“এসব ঘটল, যেন এই শাস্ত্রীয় বচন পূর্ণ হয় : তাঁর একখানি অস্থিও ভাঙ্গা হবে না।” (যোহন, ১৯ : ৩৬)।
কিন্তু যোহন এখানে যে শাস্ত্রীয় বচনের বরাত দিয়েছেন, তার সাথে যীশুর ক্রুশে মৃত্যু বা তার পা না ভাঙ্গার বিন্দুমাত্রও সম্বন্ধ সংস্রব নেই। যীশুর পরবর্তীকালে, অর্থাৎ পৌত্তলিক রোমান ও গ্রীক জাতির সাথে খ্রিস্টানদের ধর্মীয় আচার-ব্যবহার সম্বন্ধে যে আপোষ-নিষ্পত্তি হয়, তার মর্যাদা রক্ষার জন্য তল্কালীন খ্রিস্টান প্রধানরা নিজেদের শাস্ত্রে ও সমাজ-জীবনের বিভিন্ন স্তরে যেসব বিকৃতি করেছিল, যোহনের এই বিবরণটি তার একট সুস্পষ্ট নজীর।
বিষয়টি পরিষ্কারভাবে বুঝানোর জন্য যোহনের আলোচ্য উক্তিটি উদ্ধৃত করে দেয়া হল। যীশুর ভাঙ্গা প্রসঙ্গে যোহন বলছেন, “এসব ঘটল, যেন এই শাস্ত্রীয় বচন পূর্ণ হয়–তার একখানি অস্থিও ভাঙ্গা হবে না”–এর মাধ্যমে যোহন বোঝাতে চাচ্ছেন যে, ইহুদী ধর্মশাস্ত্রে এই ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে যে কুশে যীশুর একখানি অস্থিও ভাঙ্গা হবে না। প্রচলিত বাইবেলগুলোর টীকায় উক্ত ধর্মশাস্ত্রের পরিচয় দেয়ার জন্য তাদের পাঠকবর্গকে যাত্রা পুস্তকের বারো অধ্যায়ের তেতাল্লিশ পদ দেখার উপদেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু যোহনের বর্ণিত ঘটনার সাথে যাত্রা পুস্তকের ঐ বর্ণনার বিন্দুমাত্রও সম্বন্ধ সংস্রব নেই। বনিইস্রায়ীল জাতি দীর্ঘ চারশ’ ত্রিশ বছর মিসর রাজের গোলামী-শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকার পর, যে রাতে হযরত মুসার নেতৃত্বে মিসর থেকে পালিয়ে আসেন, সেই রাতে তারা তাড়িশূন্য পিঠে তৈরি করেছিলেন এবং তা খেয়ে পুনরায় যাত্রা শুরু করেন। এই পবিত্র রাতের স্মৃতি রক্ষার্থে তারা প্রতিবছর ঐ দিনে ‘নিস্তার-পর্ব’ নামে একটি পর্বোত্সব বা ‘ঈদ’ পালন করে থাকেন। এই ধর্মীয় উৎসবে যেসব পশুবলি (কোরবানী) দেয়া হবে, তার মাংসাদির ব্যবহার সম্বন্ধে মোশির ‘যাত্রা পুস্তকে’ কয়েকটি বিধি-নিষেধ প্রকাশিত হয়েছে। এই ব্যবস্থাটি সম্পূর্ণভাবে পরবর্তীতে উদ্ধৃত করা হচ্ছে, পাঠক সাধারণ এর মাধ্যমে যোহনের বর্ণিত ভবিষ্যদ্বাণীর প্রকৃত স্বরূপটি অবগত হতে পারবেন। যাত্রা-পুস্তকের আলোচ্য অধ্যায়ে বলা হয়েছে :
“আর সদাপ্রভু মোশি ও হারুণকে বললেন, নিস্তার-পর্বের বলির বিধি এই–অন্য জাতীয় কোন লোক তা ভোজন করবে না। কিন্তু কোন ব্যক্তির যে দাস রৌপ্য দ্বারা ক্রীত হয়েছে, সে যদি ছিন্নত্বক হয়, তবে খেতে পাবে; প্রবাসী কিংবা বেতনভোগী তা খেতে পাবে না। তোমরা এক গৃহমধ্যে তা ভোজন করো; সেই মাংসের কিছুই ঘরের বাইরে নিয়ে যেয়ো না; এবং তার একখানি অস্থিও ভেঙ্গো না।” (যাত্রা পুস্তক, ১২ : ৪৩-৪৬)।
