“পীলাত তখন দেখলেন, এতে কোন লাভ হচ্ছে না, বরং আরও গোলমাল হচ্ছে, তখন পানি নিয়ে তিনি লোকদের সামনে হাত ধুয়ে বললেন, এই ধার্মিকের রক্তপাতের সম্বন্ধে আমি নির্দোষ; তোমরাই তা বুঝবে। তাতে সকল তোক উত্তরে বলল, তাঁর রক্তপাতের দায়িত্ব আমাদের ও আমাদের সন্তানদেরই উপরে বর্তুক। তখন তিনি বরাব্বাকে মুক্ত করে তাদের দিলেন এবং যীশুকে চাবুক মেরে ক্রুশবিদ্ধ করার জন্য তাদের হাতে সমর্পণ করলেন। (মথি, ২৭ : ২৪-২৬)। তখন দেশাধ্যক্ষের সৈন্যেরা যীশুকে … ক্রুশবিদ্ধ করার জন্য নিয়ে গেল। (মথি, ২৭ অধ্যায়)।
“সৈন্যেরা কাঁটার একটি মুকুট গেথে তাঁর মস্তকে দিল এবং তাঁকে ‘বেগুনী’ রংয়ের পোশাক পরাল।” (যোহন, ১৯ : ২)। তারা যখন তাকে নিয়ে যাচ্ছিল তখন কুরীণী নিবাসী শিমোন নামে একটি লোক পল্লীগ্রাম থেকে আসছিল, তাকে ধরে তারা তার কাঁধে ক্রুশ রাখল, যেন সে যীশুর পিছনে পিছনে তা বহন করে।” (লুক, ২৩ : ২৬)।
“আরও দু’জন দুষ্কৃতিকারী হত হওয়ার জন্য তাঁর সাথে নীত হল।” (সূক, ২৩ : ৩২)। যোহন বলেছেন, তিনি নিজের ক্রুশ নিজে বহন করে মাথার খুলির স্থান, যাকে ইব্রীয় ভাষায় গগথা বলে, এক্ষেত্রে, উপস্থিত হলেন।” (১৯ : ১৭)।
সুতরাং দেখা যায়, ইহুদী পণ্ডিত-পুরোহিতদের ষড়যন্ত্র সার্থক হলে কুশে টাঙ্গানোর জন্য দেশাধ্যক্ষের নির্দেশ প্রকাশ্যভাবে ঘোষিত হল অর্থাৎ, ইহুদী পণ্ডিত-পুরোহিতেরা যীশুকে আদালতে দোষী সাব্যস্ত করতে না পারলেও এবং পীলাত যীশুকে নির্দোষ জানলেও ইহুদী জনগণ এবং বিশেষ করে পণ্ডিত পুরোহিতদের চাপে পড়ে যীশুকে ক্রুশের শান্তি দিতে বাধ্য হলেন।
অতঃপর যীশুকে সৈন্যদের হাতে সমর্পণ করা হলে যথারীতি তার মাথায় কাঁটার তাজ পরান হল, তাঁর পরিহিত বস্ত্র অপহৃত হল এবং নিজের ক্রুশ নিজে বহন করে তিনি গগথা বদ্ধভূমির পানে এগিয়ে গেলেন দুজন দুকৃতপরায়ণ অপরাধীর সহচররূপে।
যীশুর জয়যাত্রা:
খ্রিস্টান লেখকদের মতে, এখান থেকে শুরু করে যীশুর জীবন অবসানের শেষ অধ্যায়। কিন্তু, নিরপেক্ষ সংস্কারমুক্ত চিন্তাধারা নিয়ে আলোচনা করলে জানা যাবে যে, বস্তুতঃ গলগথা থেকে শুরু হয় যীশুর নবীজীবনের প্রথম বিজয় অভিযান পীলাত ও হাওয়ারীদের সম্মিলিত উদ্যোগ আয়োজনের বাস্তব রূপায়ন।
ইহুদী যাজক, পুরোহিত এবং ইহুদী সমাজের জনসাধারণ বা নিজেদের ষড়যন্ত্রের সাফল্যগর্বে আত্মহারা হয়ে ছুটে এসেছিল গগথার বধ্যভূমিতে, যীশুর ‘অভিশপ্ত’ জীবনের শেষ তামাশা দেখতে। কিন্তু সেখানে এসে তারা দেখতে পেল, ক্রুশের উপর পীলাতের যে ‘চার্জসীট বা অপরাধ-পত্র’ টাঙ্গানো হয়েছে, তাতে লেখা আছে, ‘নাসরতীয় যীশু, ইহুদীদের রাজা’। সুসমাচার রচয়িতাদের বিবরণ থেকে এও জানা যাচ্ছে যে, স্থানীয় জনসাধারণের সবাই যাতে ঐ চার্জ সীটটি পড়তে ও বুঝতে পারে, সেজন্য তা লেখা হয়েছিল, হিব্রু, রোমান ও গ্রীক ভাষায়। এই সম্পূর্ণ বিপরীত পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে ইহুদীদের যে কিরূপ দুরবস্থা ঘটেছিল, তা সহজেই অনুমেয়। তখন তারা দিশেহারা হয়ে পীলাতের নিকট উপস্থিত হল এবং তাকে বলল, “ইহুদীদের রাজা এই কথা বাদ দিয়ে লিখে দিন, এই ব্যক্তি বলত আমি ইহুদীদের রাজা। এথেকে জানা গেল, পীলাতও বধ্যভূমির নিকটবর্তী কোন স্থানে অবস্থান করছিলেন। সে যাই-হোক, পীলাতের সকল উদ্যোগ আয়োজন তখন সম্পূর্ণ হয়ে গেছে। কাজেই তিনি আর ইহুদী বিদ্রোহের আশংকায় ভীত’ হলেন না, বরং সুদৃঢ় ভাষায় জানিয়ে দিলেন, “আমি যা লিখেছি, তা লিখেছি।” আরবি সুসমাচারে এখানে কাদ’ শব্দ থাকাতে শীলাতের উক্তির অনুবাদ হবে, যা লিখেছি, ঠিক লিখেছি (কাদ কৃদিবাতুন) অর্থাৎ, তার আর কোন পরিবর্তন ঘটতে পারবে না। যীশুর অনুকূলে, পীলাতের এই দৃঢ়তা থেকে ভাবী অবস্থার একটি স্পষ্ট আভাষ পাওয়া যায়। ইহুদীরাও এটা বুঝতে পেরেছিল এবং এজন্য সাধ্যমত সতর্কতা অবলম্বন করতেও কটি করেননি। কিন্তু যীশুর শিষ্য হাওয়ারীরাও চুপ করে বসে থাকেননি। তাদের দূরদর্শিতা ও কর্মকুশলতার পরিচয় পরবর্তী ঘটনাক্রম থেকে জানা যাবে।
যাহোক, দিনের তৃতীয় ঘটিকায় তারা তাঁকে ক্রুশবিদ্ধ করল। তার দোষ পত্রে লেখা হল ইহুদীদের রাজা’। তার সাথে তারা দু’জন দস্যুকেও ক্রুশবিদ্ধ করল, একজনকে তাঁর ডানপাশে, আর একজনকে তাঁর বামপাশে দিল (মার্ক, ১৫: ২৫-২৭; মোহন, ১৯ : ১৮)।
যীশু উচ্চকণ্ঠে চিৎকার করে বললেন, ‘এলোই, এলোই, লামা শবক্তানী’ অর্থাৎ ‘প্রভু, প্রভু আবার কেন আমায় পরিত্যাগ করেছ?’ (মার্ক, ১৫ : ৩৪; মথি, ২৭ : ৪৬)। তাতে যারা সেখানে উপস্থিত ছিল … একথা শুনে তাদের মধ্যে একজন অমনি দৌড়ে গিয়ে একটি স্পঞ্জ নিল, তা ‘সিরকা’ দিয়ে সিক্ত করল এবং একগাছা নলে লাগিয়ে তা যীশুকে পান করতে দিল’ (মার্ক, ১৫ : ৩৬)। সেইস্থানে সিরকাপূর্ণ একটি পান পাত্র ছিল। (যোহন, ১৯ : ২৯)।
“আয়োজনের দিন ছিল বলে, বিশ্রাম-বারে দেহগুলো যাতে ক্রুশের উপর না থাকে। কারণ, সেই বিশ্রাম-বার বিশেষ দিন ছিল–এজন্য ইহুদীরা (রাষ্ট্রীয় বিধান অনুসারে) পীলাতের নিকট অনুরোধ করল যেন পা ভেঙ্গে দিয়ে তাদের সরান হয়। তাতে সৈনিকেরা এসে সেই প্রথম জনের পা ভাঙ্গল এবং যীশুর সাথে ক্রুশবিদ্ধ সেই অন্যজনেরও ভাঙ্গল; তারা যীশুর নিকট এসে, তিনি ইতিমধ্যে মরে গেছেন মনে করে, তার পা ভাঙ্গতে বিরত রইল; কিন্তু সৈন্যদের একজন বর্শা দিয়ে তাঁর পার্শ্বদেশ বিদ্ধ করল; আর তখনই তরল রক্ত বের হল।” (যোহন, ১৯ : ৩১-৩৪)।
