একদিন আমি লক্ষ্য করলাম, একজন যুবক গাছে ঠেস দিয়ে শান্তভাবে সম্মিলিত কিছু লোকের সাথে কথা বলছেন। ওরা আমাকে বলল, লোকটি যীশু। যেহেতু লোকটিকে আমি বিরক্ত করতে চাইনি; তাই আমি নিজের পথে পা বাড়ালাম; শুধু আমার সচিবকে বললাম, ওদের সাথে দাঁড়িয়ে কথা শোন।
পরে আমার সচিব আমাকে বলল, লোকটির বক্তব্যের সাথে আমার পঠিত দার্শনিক গ্রন্থাবলীর বক্তব্যের কোন মিল নেই। এবং লোকটি জনসাধারণকে উচ্ছন্নে ঠেলে দিচ্ছে না, এমনকি তাদের ক্ষেপিয়েও তুলছে না। এ জন্যই আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম যীশুকে রক্ষা করতে হবে। তার ইচ্ছানুসারে আচরণের কথা বলার ও সভা ডাকার স্বাধীনতা ছিল। এ সীমাহীন স্বাধীনতার জন্য ইহুদীরা ক্ষেপে যায়। কিন্তু দরিদ্রের কোন ক্ষত হয়নি। আবার ধনী ও ক্ষমতাবানরা এতে অস্বস্তিবোধ করে। পরবর্তীতে যীশুকে একটি পত্র লিখি–ফোরাম (Forum) এ তাঁর সাক্ষাৎকার প্রার্থনা করে। তিনি এসেছিলেন। এই অসাধারণ ব্যক্তিটিকে আমি কিছুটা বুঝতে চেষ্টা করি। তাঁর অবয়ব বা চরিত্রে দোষণীয় কিছু ছিল না। তার উপস্থিতিতে আমি গভীর শ্রদ্ধাবোধ করি। তিনি আমাদের সবাইকে তাঁর সারল্য, নম্রতা ও প্রেম দ্বারা প্রভাবিত করেন। হে মহান সম্রাট এ-সবই নাসরতীয় যীশু সম্বন্ধে ভাবনার বিষয়। এবং আমি এ বিষয়ে আপনাকে বিস্তারিত অবগত করলাম। আমার অভিমত হল যীশু কোন অপরাধমূলক কাজ করেননি। আমাদেরকে স্বীকার করতেই হবে যে, যীশু বাস্তবিকই ঈশ্বর সেবক।
আপনার অনুগত ভৃত্য,
পন্তিয়াস পীলাত”
যাহোক, যীশুকে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করতে দেশাধ্যক্ষ পীলাত আদৌ প্রস্তুত ছিলেন না এবং বিপুল ইহুদী-জনতার সামনে নিজের সেই সংকল্পকে প্রকাশ্যভাবে ঘোষণা করতেও তিনি কুণ্ঠিত হননি। পক্ষান্তরে, ঐতিহাসিক বিচারালোচনার দ্বারা এ সত্যটিই অনাবিলরূপে ভাস্বর হয়ে উঠেছে যে, যীশুর প্রাণরক্ষার জন্য পীলাত প্রথম থেকেই সচেষ্ট হন এবং এতোদ্দেশ্যে তিনি যীশুর প্ৰকত শিষ্য হাওয়ারীদেরকে প্রথম থেকে সহায়তা করেও আসছিলেন। এ দাবীর স্বপক্ষে সুস্পষ্ট দলিল-প্রমাণ বাইবেলে রয়েছে। উপস্থিত ইহুদীদের কারও প্রাণ নাশ করা আমাদের পক্ষে বিধেয় নয়–এই সাধুতার কারণ সম্বন্ধে দু’একটি কথা বলে যায় :
পীলাতের প্রস্তাবের উত্তরে ইহুদীরা বলছে, “কারও প্রাণনাশ করা আমাদের পক্ষে বিধেয় নয়।” কিন্তু অন্য লোকের কথা দূরে থাকুক, আল্লাহর প্রেরিত নবী-রসূলদেরকে হত্যা করতেও তারা পূর্বে কোনদিনই দ্বিধাবোধ করেনি। তাদের ধর্মীয় ইতিহাসেও এর অনেক নজীর আছে। এ অবস্থায়, বিশেষতঃ যীশুকে হত্যা করার জন্য তাদের এই ব্যাকুল ব্যগ্রতা সত্ত্বেও তারা নিজেদের শাস্ত্রীয় ব্যবস্থানুসারে যীশুকে ক্রুশে টাঙ্গিয়ে বধ করতে অসম্মত হন বিশেষ দুটো কারণে। প্রথমত, রাজ-শক্তির বিরূপ মনোভাব, প্রকাশ্যভাবে যীশুর বিরুদ্ধে উত্থান করার মত সৎ-সাহস এই কাপুরুষ জাতির ছিল না। দ্বিতীয়ত, তখন স্বয়ং ইহুদী সমাজে আন্তঃবিদ্রোহ উপস্থিত হওয়ার প্রবল আশংকা এবং যীশুর প্রকৃত শিষ্য হাওয়ারীদের সুসংহত ও সংঘবদ্ধ প্রতিরোধের প্রবণতা।
যাহোক, পীলাত যখন ঘোষণা করলেন, বাস্তবিক প্রাণদণ্ডের যোগ্য কোন কাজ এ করেনি; তাই আমি তাকে শাস্তি দিয়ে ছেড়ে দেব, তখন তিনি লোকদের বললেন :
“দেখ, আমি এঁকে তোমাদের নিকট বাইরে আনছি যেন তোমরা জানতে পার, আমি এঁর কোন দোষ পাচ্ছি না।” (যোহন, ১৯ : ৪)।
কিন্তু প্রধান পুরোহিতেরা ও অনুচরেরা চেঁচিয়ে বলল, “কুশে দাও, কুশে দাও।” পীলাত তাদের বললেন, “তোমরা নিজেরা এঁকে নিয়ে গিয়ে ক্রুশবিদ্ধ কর; কারণ এঁর কোন দোষ আমি পাচ্ছি না।”
ইহুদীরা তাকে উত্তর দিল, আমাদের এক বিধি-ব্যবস্থা আছে, আর আমাদের ব্যবস্থানুসারে তাঁর মৃত্যু হওয়া উচিত কারণ এ নিজেকে ঈশ্বর-পুত্র বলে দাবী করেছে। পীলাত এ কথা শুনে অত্যন্ত ভীত হলেন; তিনি আবার রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করে যীশুকে বললেন, তুমি কোথা থেকে এসেছ? কিন্তু যীশু তাঁকে কোন উত্তর দিলেন না। এতে পীলাত তাঁকে বললেন, তুমি কি আমার সাথে কথা বলবে না? তুমি কি জান না, তোমাকে মুক্ত করার ক্ষমতা আমার আছে আর তোমাকে ক্রুশবিদ্ধ করার ক্ষমতাও আমার আছে? যীশু তাকে উত্তর দিলেন, উর্ব থেকে তোমাকে দেয়া না হলে, আমার বিরুদ্ধে প্রয়োগ করার কোন ক্ষমতাই তোমার থাকত না; এজন্য তোমার হাতে যে আমাকে সমর্পণ করেছে, তারই পাপ বরং গুরুতর।” (যোহন, ১৯ : ৬-১১)।
“এরপরে পীলাত তাকে মুক্তিদান করতে চেষ্টা করলেন (যোহন, ১৯ : ১২)। তিনি আবার বাইরে গিয়ে ইহুদীদের কাছে বললেন, আমি এর কোনই দোষ পাচ্ছি না; তোমাদের এক রীতি আছে যে, নিস্তার-পর্বের সময় আমি একজনকে মুক্ত করে তোমাদের দিই? তারা সবাই আবার চেঁচিয়ে বলল, এঁকে যদি মুক্তিদান করেন, তবে আপনি কৈসরের বন্ধু নন। যে কেউ আপনাকে রাজা বলে প্রতিপন্ন করে, সে কৈসরের বিরোধী। একথা শুনে পীলাত যীশুকে বাইরে এনে, যে স্থানকে শিলাস্ত রণ বলে (ইব্রীয় নাম ‘গাব্বাথা) সেই স্থানে বিচারাসনে বসলেন। সেদিন নিস্তারপর্বের আয়োজনের দিন, বেলা প্রায় ছয় ঘটিকা, পীলাত তাদের বললেন, এই দেখ, তোমাদের রাজা। তারা চিৎকার করে বলল, দূর কর, এঁকে ক্রুশে দাও। পীলাত তাদের বললেন, তোমাদের রাজাকে কি ক্রুশবিদ্ধ করবে? প্রধান পুরোহিতেরা উত্তর দিল, কৈসর ব্যতীত আমাদের রাজা নেই।” (যোহন, ১৯ : ১২-১৫)।
