ইহুদীদের কুলপাতিরূপে আরকেলস রোম থেকে ফিরে এসে প্রায় দশ বছর শাসন চালিয়েছিলেন। ওই দশ বছরে তার অত্যাচারের মাত্রা এমনই বেড়ে যায় যে জুডিয়া আর স্যামেরিয়ার মানুষ একজোট হয়ে নিজেদের ক’জন বাছা বাছা প্রধানকে রোমে পাঠালো ম্রাটের কাছে নালিশ জানাতে। সম্রাট সব শুনে একটি বিহিত করার লক্ষ্যে আরকেলসকে তৎক্ষণাৎ রোমে ডেকে পাঠালেন। আরকেলস রোমে আসার সাথে সাথে তাকে ফ্রান্সে নির্বাসিত করে দেয়া হলো। জুডিয়া, স্যামেরিয়া ও ইজুমিয়া সিরিয়ার রোমান বড়লাটের অধীনে চলে গেল। একজন বিচক্ষণ রোমান রাজপুরুষ বড়লাটের নিচে তার ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধি (Procurator) হিসেবে এসব প্রদেশের শাসনভার নিজের হাতে তুলে নেন। ইনিই নতুন নিয়মের পরিভাষায় ‘দেশাধ্যক্ষ’ নামে অভিহিত হয়েছেন।
যাহোক, যীশু হেরোদ অ্যান্টিপাসের অধীনস্থ লোক, তা জানতে পেরে পীলাত তাঁকে হেরোদের নিকট পাঠিয়ে দেন।
“যীশুকে দেখে হেরোদ তো অত্যন্ত আনন্দিত। কারণ, তার বিষয়ে অনেক কথা শুনে তিনি অনেকদিন থেকে তাকে দেখতে ইচ্ছেপোষণ করছিলেন, আর তার সাধিত কোন লক্ষণ দেখার আশা করছিলেন।” (লুক, ২৩ : ৮)। সুতরাং, “তিনি যীশুকে অনেক কথা জিজ্ঞেস করলেন … আবার পীলাতের কাছে পাঠিয়ে দিলেন।” (লুক, ২৩ : ৯, ১৯)।
ফলে, ইহুদীদের রাজনৈতিক আন্দোলনের বিপরীত ফল ফলল। মূলতঃ হেরোদ যীশুকে দেখে আনন্দিত হলেন এবং অপেক্ষমাণ প্রধান পুরোহিত ও ধর্মগুরুদের উপেক্ষা করে তিনি তাঁকে অক্ষতদেহে পীলাতের নিকট ফেরৎ পাঠালেন এবং তারপরেই–
“পীলাত সমস্ত প্রধান পুরোহিত ও অধ্যক্ষ সকলকে এবং জাতীর লোককে ডেকে একত্র করলেন ও তাদের বললেন, লোকটি জাতিকে বিপথগামী করছে বলে তোমরা তাঁকে আমার সামনে উপস্থিত করেছ; আর আমি তোমাদের সাক্ষাতে অনুসন্ধান করে, তোমরা এর নামে যে যে দোষারোপ করেছ তার কোনও দোষ এরমধ্যে পাইনি; হেরোদও পাননি, কারণ তিনি তাঁকে আমাদের কাছে ফেরৎ পাঠিয়েছেন, বাস্তবিক প্রাণদণ্ডের যোগ্য কোন কাজ এ করেনি; অতএব, আমি তাকে শাস্তি দিয়ে ছেড়ে দেব।” (লুক, ২৩ : ১৩-১৬)।
সুতরাং, আঞ্চলিক শাসনকর্তা পীলাত যীশুকে নির্দোষ ও নিরপরাধী বলে ঘোষণা করেছেন, ইহুদীয়ার রাজা হেরোদও নিরপরাধী বলে তাঁকে সসম্মানে মুক্তি দিয়েছেন। তাই স্পষ্টভাবে জানা যায়, এ অবস্থায় ধার্মিক, নিরপরাধ ও নিঃসহায় যীশুকে ক্রুশে টাঙ্গিয়ে হত্যা করার নিষ্ঠুর আদেশ দেয়া বা কোনপ্রকারে তার সহায়তা করা শাসনকর্তাদের কারওপক্ষে কোনক্রমেই সম্ভব বলে বিবেচিত হতে পারে না।
পরবর্তী ঐতিহাসিক ঘটনা :
ইতিপূর্বে জানা গেছে, প্রাদেশিক শাসনকর্তা পীলাত ও রাজা হেরোদ কেউই যীশুকে কোনওপ্রকারে অপরাধী সাব্যস্ত করেননি, তাকে ক্রুশে দিয়ে বধ করার দায়িত্বও তারা গ্রহণ করেননি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এ অবস্থায় তাঁকে এ দণ্ডদানের ব্যবস্থা করার ভার অর্পিত হয়েছিল কার বা কাদের উপর? কেউ কেউ অনুমান করতে পারেন, পীলাত যখন তাঁকে ক্রুশে টাঙ্গিয়ে বধ করতে প্রস্তুত হননি, বরং তাকে নির্দোষ বলে ঘোষণা করেছেন, অন্যদিকে ইহুদীরা যখন তাকে ক্রুশে দিয়ে বধ করার জন্য চরমভাবে উৎসুক হয়ে উঠেছিল, তখন সঙ্গতভাবে অনুমান করা যায়, ইহুদীরাই তাঁকে ক্রুশে দিয়ে নিহত করেছিল। তবে এমন অনুমান করা সঙ্গত হবে না। কারণ, প্রধানত যে বাইবেলকে কেন্দ্র করে খ্রিস্টানদের মৌলিক বিশ্বাস ও সংস্কারগুলোর বিচার আলোচনায় প্রবৃত্ত হয়েছি, তাতে এই অনুমানের বিপরীত প্রমাণই পাচ্ছি। সাধু যোহনের বর্ণনায় দেখা যাচ্ছে–ইহুদীদেরকে কোনপ্রকারে নিরস্ত করতে না পেরে, “পীলাত তাদেরকে বললেন, তোমরাই একে নিয়ে যাও, নিজেদের ব্যবস্থামতে এর বিচার কর। ইহুদীরা তাকে বলল, কারও প্রাণনাশ করা আমাদের পক্ষে বিধেয় নয়।” (যোহন, ১৮ : ৩১-৩২) –এ থেকে জানা যায়, যীশুকে ক্রুশে দেয়ার ভার ন্যস্ত হয়েছিল সম্পূর্ণভাবে পীলাতের উপর, ইহুদীদের উপর নয়। মথির বর্ণনা থেকে জানা যাচ্ছে যে, “তখন দেশাধ্যক্ষের সৈন্যেরা যীশুকে … ক্রুশবিদ্ধ করার জন্য নিয়ে গেল।” (মথি, ২৭: ২৭-৩১)
কিছুটা অবান্তর হলেও এখানে পাঠকদেরকে পীলাতের ঘোষণাটি আবার স্মরণ করিয়ে দেয়া উচিত : “বাস্তবিক প্রাণদণ্ডের যোগ্য কোন কাজ এ করেনি। অতএব আমি তাকে শাস্তি দিয়ে ছেড়ে দেব।” (লুক, ২৩ : ১৫-১৬)।
পাঠকদের অবগতির জন্য এখানে ঐতিহাসিক একটি প্রতিবেদন পত্রস্থ করাও প্রয়োজন? এই প্রতিবেদনটি যীশুর নির্দোষিতার স্বপক্ষে এবং তাঁকে রক্ষা করার অভিপ্রায়ে গভর্নর পীলাত মহামান্য তাইবেরিয়াস সিজার-এর নিকট পাঠিয়েছিলেন। চামড়ার উপর লেখা সেই প্রতিবেদনটি এখনও রোমের ভ্যাটিক্যান লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত আছে। আর এর ইংরেজি অনুবাদটি সংরক্ষিত আছে লাইব্রেরি অব কংগ্রেস, ওয়াশিংটনে। স্প্যানিস দার্শনিক আন্দ্রেজ ফিবার কাইজার-এর পুস্তক থেকে প্রতিবেদনটি গ্রন্থস্থ করা হল:
তাইবেরিয়াস সিজার সমীপে—
“গালীলে ঈশ্বর প্রেরিত এক যুবকের আবির্ভাব ঘটে, যে তার প্রভুর নামে নতুন আইন ঘোষণা করে–আইনটি হলো নম্রত্ব। প্রথম আমি মনে করেছিলাম ঐ যুবকের অভিপ্রায় হল জনসাধারণকে রোমানদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী করে তোলা। কিন্তু আমার ধারণা অনতিবিলম্বে ভুল প্রমাণিত হয়। নাসরতীয় যীশু ইহুদীদের চেয়ে রোমানদের প্রতিবেশি ভ্রাতৃত্বসুলভভাবে কথা বলেন।
