“প্রধান পুরোহিত ও প্রাচীনবর্গ লোকদের প্ররোচিত করল যেন তারা বরাব্বাকে চেয়ে নেয় এবং যীশুকে নাশ করে। সুতরাং, দেশাধ্যক্ষ যখন তাদের পুনর্বার বললেন, তোমরা কি চাও, এ দুজনের মধ্যে কাকে মুক্ত করে তোমাদের দেব? তখন তারা বলল, বাব্বাকে। পীলাত তাদের বললেন, তবে যীশু, যাকে খ্রিস্ট বলে, তার বিষয়ে কি করব? তারা সবাই বলল, তাঁকে ক্রুশে দেয়া হোক। দেশাধ্যক্ষ তাদের বললেন, কেন, সে কি অপরাধ করেছে? কিন্তু তারা আরও বেশি চিৎকার করে বলল, তাঁকে ক্রুশে দেয়া হোক।” (মথি, ২৭ : ২০-২৩)।
বাইবেলের পূর্বোক্ত বর্ণনায়, যীশুর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ সম্বন্ধে জানা যায়, তাদের অভিযোগগুলোর মূলে কোন সত্য ছিল না। ইহুদীরা বিশেষতঃ ইহুদী পণ্ডিত-পুরোহিত ও সমাজপতিরা যীশুর শিক্ষার ফলে নিজেদের প্রভাব প্রতিপত্তির এবং শাসন-শোষণের সুযোগ-সুবিধের ক্ষতি হচ্ছে দেখে, হিংসেবশতঃ তাঁর বিরুদ্ধে এই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল। পীলাতও যে এ ধরনের বিশ্বাস করতেন, মথির প্রদত্ত বিবরণ থেকে তাও স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।
ইহুদীরা যখন যীশুকে ক্রুশে আবদ্ধ করার জন্য চরম হৈ-হল্লা শুরু করে দিল, পীলাত তখন বললেন, “কেন, সে কি অপরাধ করেছে?”
মূলত, পীলাত যে যীশুকে একজন ধার্মিক ও নিরপরাধ ব্যক্তি বলে মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন, এতে কোনই সন্দেহ নেই। তাঁর স্ত্রীর স্বপ্ন থেকেও বুঝা যাচ্ছে, যীশুর প্রাণরক্ষার জন্য বিশেষভাবে ব্যাকুল হয়ে পড়াই ছিল তার পক্ষে খুবই স্বাভাবিক। মার্কের পনেরো অধ্যায়েও অনুরূপ বর্ণনাই লিপিবদ্ধ আছে। সুতরাং, লুক রচিত সুসমাচার থেকে কয়েকটি প্রাসঙ্গিক বিষয়ের উল্লেখ করা হল:
“আর তারা তাঁর বিরুদ্ধে এই বলে অভিযোগ করলো, আমরা জেনেছি যে এই লোকটি আমাদের জাতিকে বিপথগামী করছে, কৈসরকে কর দিতে নিষেধ করেছে, আমি খ্রিস্ট, রাজা। (লুক, ২৩ : ২)। পীলাত আবার রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করলেন এবং যীশুকে ডেকে বললেন, “তুমি কি ইহুদীদের রাজা? যীশু তাঁকে উত্তর দিলেন, আপনি কি নিজ থেকে এটা বলছেন, না অন্যেরা আমার বিষয়ে এ কথা আপনাকে বলে দিল? পীলাত উত্তর দিলেন, আমি কি ইহুদী? তোমার স্বজাতীয়েরা ও প্রধান পুরোহিতেরা আমার হাতে তোমাকে সমর্পণ করেছে; তুমি কি করেছ; যীশু উত্তর দিলেন আমার রাজ্য এ জগতের নয়, আমার রাজ্য যদি এ জগতের হত, তবে যাতে আমি ইহুদীদের হাতে সমর্পিত না হই, সেজন্য আমার অনুচরেরা প্রাণপণে সংগ্রাম করত। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমার রাজ্য এ স্থানের নয়। পীলাত তাঁকে বললেন, তবে কি তুমি ইহুদীদের রাজা? যীশুর উত্তর, আপনিই বলছেন, আমি রাজা। সত্যের বিষয়ে সাক্ষ্য দেবার জন্যই আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং জগতে এসেছি; যে-কেউ সত্যের অনুগত সে আমার কথা শুনে। পীলাত তাঁকে বললেন, ‘সত্য কি? এই বলে তিনি আবার বাইরে ইহুদীদের নিকট গেলেন ও তাদের বললেন, “আমি এর কোনই দোষ পাচ্ছিনে।” (যোহন, ১৮ : ৩৩-৩৮)। কিন্তু ইহুদীরা পীলাতের মুখে যীশুর নির্দোষিতার ঘোষণা বারবার শুনে তারা তার বিরুদ্ধে নতুনভাবে অভিযোগ উপস্থিত করল, “তারা আরও জিদ করে বলতে লাগল, এই ব্যক্তি সমগ্র যিহূদীয়ায় এবং গালীল থেকে শুরু করে এই স্থান পর্যন্ত শিক্ষা দিয়ে প্রজাবৃন্দকে উত্তেজিত করে তুলেছে। পীলাত গালীলের কথা শুনে লোকটি গালীলীয় কিনা জিজ্ঞেস করলেন, আর যীশু হেরোদের অধিনস্থ লোক, তা জানতে পেরে তিনি তাঁকে হেরোদের নিকট পাঠালেন; তখন হেরোদও জেরুজালেমে ছিলেন। (লুক, ২৩ : ৫-৭)।
বর্ণিত রয়েছে যে, ‘পীলাত যীশুকে হেরোদের কাছে পাঠিয়েছিলেন’–এই হেরোদ হচ্ছেন গালিলী প্রদেশ ও জর্ডনের পূর্বপারের দক্ষিণ অঞ্চল পেরিয়া প্রদেশের রাজা অ্যান্টিপাস হেরোদ। তিনি রাজা হেরোদের তৃতীয় পুত্র। রাজা হেবোদ সাঁইত্রিশ বছর রাজত্ব করে সত্তুর বছর বয়সে দারুণ অশান্তি ভোগ করতে করতে মৃত্যুমুখে পতিত হন। মৃত্যুশয্যায় শুয়ে শুয়েই তিনি এক উইল করে তার বিস্তৃত রাজ্য তাঁর তিন জীবিত পুত্রের মধ্যে ভাগ করে দেন। বড় ছেলে আরকেলস পান জুডিয়া, স্যামেরিয়া আর ইডুমিয়া। দ্বিতীয় পুত্র ফিলিপ পান জর্ডন নদীর পূর্ব পারের সমস্ত উত্তর অঞ্চল। পরবর্তীকালে সিজেরিয়া ফিলিপাই এ অঞ্চলের রাজধানী ছিল। তৃতীয় পুত্র অ্যান্টিপাস পান গালিলী প্রদেশ ও জর্ডনের পূর্ব পারের দক্ষিণ অঞ্চল পেরিয়া প্রদেশ। এভাবে বিস্তৃত রাজ্য ভাগ করে দিলেও হেরোদ তার উইলের এগজিকিউটর করে যান সম্রাট অগাস্টাসকে। এরপর রাজা হেরোদ মারা যেতে না যেতেই সারা প্যালেস্টাইন জুড়ে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠে। এই বিদ্রোহ দমন করতে গিয়ে আরকেলস তিন হাজার ইহুদীকে হত্যা করে ফেলে। এরপর ব্যাপারটা চরম আকার ধারণ করলে আরকেলস তার বন্ধু সিরিয়ার রোমান গভর্নরের উপর তার রাজ্যভার চাপিয়ে দিয়ে স্বয়ং ম্রাটের সাথে দেখা করতে যান রোমে। এক দল মাতব্বর ইহুদীও তখনই সম্রাটের কাছে দরবার করতে যান, যেন হেরোদ-পুত্রদের কেউ রাজত্ব করতে না পারে। বরং, ম্রাট যেন নিজেই সমগ্র প্যালেস্টাইনের শাসনভার গ্রহণ করেন। তারা ভেবেছিলেন, পুরাকালে পারস্য সম্রাটের অধীনে তারা যেমন আনন্দে ছিলেন, রোম সম্রাটের হাতে পড়লে ঠিক তেমনটিই সুখে থাকবেন। কিন্তু ম্রাট ইহুদী মাতব্বরদের কথায় কান না দিয়ে মোটামুটি হেরোদের উইলের শর্তগুলো বজায় রাখলেন। তবে তিনি আরকেলসকে জুডিয়া বা স্যামেরিয়ার ঠিক রাজা করলেন না এবং রাজা নাম গ্রহণ করারও অধিকার তাঁকে দিলেন না। আর একটু নীচুদরের শাসনকর্তার পদে নামিয়ে তার পদবী দিলেন ইহুদীদের কুলপতি। ফিলিপ আর অ্যান্টিপাস নিজ নিজ অঞ্চলের শাসনকর্তা রয়ে গেলেন। তবে জর্ডন নদীর ওপারের গ্রীক শহরগুলো নিয়ে কোপোলিস বলে যে অঞ্চল গড়ে উঠেছিল, তা সিরিয়ার রোমান বড়লাট (Viceroy)-এর শাসনাধীন হয়ে গেল।
