যিহূদা সর্বপ্রধান যাজক যোসেফ কাইয়াফার কাছে গিয়ে উপস্থিত হলেন এবং যীশুর গোপন আস্তানার সন্ধান বলে দিতে রাজী হলেন। কিন্তু মাত্র ত্রিশটি রৌপ্যমুদ্রার লোভে নয়, মনের এক নিদারুণ সংশয় নিরসনের জন্য। যাহোক, যিহূদার সাহায্যে জনসাধারণের অজান্তে গোপনেই যীশুকে ধরে ফেলার সুযোগ আছে বুঝে পুরোহিতেরা তাদের পূর্বপরিকল্পনা বদলে ফেলে নিস্তারপর্ব শুরু হওয়ার আগেই সবকিছু শেষ করে ফেলার আয়োজন করল।
শত্রুর সম্মুখীন যীশু:
“যখন তিনি কথা বলছেন, তখন যিহূদা, সেই বারোজনের একজন এল, এবং তার সাথে প্রধান পুরোহিতদের ও ইহুদীদের প্রাচীনবর্গের নিকট হতে বিস্তর লোক খড়গ ও লাঠি নিয়ে এল। যে তাঁকে সমর্পণ করল, সে তাদের এই বলে সংকেত দিয়েছিল, আমি যাকে চুম্বন করব, তিনিই সেই ব্যক্তি। তোমরা তাকে ধরো। সে তখনই যীশুর কাছে গিয়ে বলল, গুরু, মঙ্গল হোক, আর তাকে চুম্বন করল। যীশু তাকে বললেন, বন্ধু, যা করতে এসেছ, কর। তখন তারা কাছে এসে যীশুর উপরে হস্তক্ষেপণ করে তাঁকে ধরল।” (মথি, ২৬ : ৪৭-৫০)।
যীশুর বিচার মহাপুরোহিতের সামনে :
“যারা যীশুকে ধরেছিল, তারা তাঁকে মহা-পুরোহিত কাইয়াফার নিকট নিয়ে যায়। সেই স্থানে ধর্মগুরুরা ও প্রাচীনবর্গও সমবেত হয়। (মথি, ২৬ : ৫৭)। প্রধান পুরোহিতেরা ও সমস্ত মহাসভা যীশুকে প্রাণদণ্ড দেবার জন্য তাঁর বিপক্ষে মিথ্যেসাক্ষ্য অন্বেষণ করল, কিন্তু অনেক মিথ্যেসাক্ষী উপস্থিত হলেও তেমন সাক্ষ্য পাওয়া গেল না। শেষে দু’জন উপস্থিত হল; তারা বলল, এ বলেছিল, আমি ঈশ্বরের মন্দির ভেঙ্গে ফেলতে পারি আর তিনদিন পরে তা নির্মাণ করতে পারি। তখন মহা-পুরোহিত দাঁড়িয়ে তাঁকে বলল, তুমি কি কোন উত্তর দেবে না? এরা তোমার বিপক্ষে কেন সাক্ষ্য দিচ্ছে? কিন্তু যীশু নীরব, তাতে মহাপুরোহিত তাঁকে বলল, আমি তোমাকে জীবন্ত ঈশ্বরের দিব্যি দিয়ে বলছি, আমাদের বল, তুমি সেই ঈশ্বরের পুত্র কিনা। যীশু তাঁকে বললেন, ‘আপনিই বললেন।… এতে মহা-পুরোহিত আপনার বস্ত্র ছিঁড়ে বলল, এ ঈশ্বর-নিন্দা করল, আমাদের সাক্ষীতে আর দরকার কি? তোমরা ঈশ্বর-নিন্দা শুনলে; তোমাদের কি তাই মনে হয়? তারা উত্তরে বলল, “সে মৃত্যুর যোগ্য।” (মথি, ২৬: ৫৯-৬৬)।
উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, মহাপুরোহিতের সামনে যীশুর বিচার-প্রহসনের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যে সাক্ষ্য সংগ্রহ করে প্রাথমিক বিচারে তাকে অপরাধী সাব্যস্ত করা। তবে মহাপুরোহিত কাইয়াফা এ কথা ভালভাবেই জানতেন, যীশু এমন কোন কাজ করেননি, যা সত্যিই ইহুদী ধর্মের বিরুদ্ধে যায়, যার জন্য ইহুদী অনুশাসন অনুসারে তাকে প্রাণদণ্ড দেয়া যায়। আর ইহুদী বিচার-সভা কারও প্রাণদণ্ড দিলেও তা কার্যকর করা যাবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না রোমান শাসনকর্তা ঐ দণ্ড মঞ্জুর করেন। এ কারণে তিনি যীশুকে দেশাধ্যক্ষ পীলাতের নিকট সমর্পণ করার নির্দেশ দেন।
সুসমাচার রচয়িতা মথি বলেন:
“আর প্রভাত হলে প্রধান পুরোহিতেরা ও ইহুদীদের প্রাচীনবর্গ সকলে যীশুর বিরুদ্ধে মন্ত্রণা করল, যেন তার প্রাণদণ্ড দিতে পারে; আর তাকে বেঁধে নিয়ে গিয়ে দেশাধ্যক্ষ পীলাতের হাতে সমর্পণ করল।” (মথি, ২৭ : ১-২)।
তখন রোমান শাসনকর্তা পীলাত ইহুদীদের নিস্তার-পর্ব উপলক্ষে জেরুজালেমেই ছিলেন। তিনি মূলত ভূমধ্যসাগর তীরবর্তী হেরোদ-১ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত নুন নগরী সিজারিয়াতে বাস করতেন। শুধু ইহুদীদের বড় বড় তিনটি পর্বের সময়ই জেরুজালেমে এসে থাকতেন। ইহুদীদের সবচেয়ে বড় উৎসব নিস্তার-পর্বের সময়ে দিক-বিদিকের ইহুদীরা জেরুজালেমে এসে উপস্থিত হত। আর বহুলোক একত্র হলে ছোট কি বড় একটা-না–একটা দাঙ্গা-হাঙ্গামা বেঁধেই যেত। তাই তখন তিনি কিছুদিন জেরুজালেমে অবস্থান করে রোমান সৈন্যদের পাহারায় বসিয়ে শাস্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার চেষ্টা করতেন।
পীলাতের আদালতে যীশুর বিচার :
“…লোকেরা যীশুকে কাইয়াফার কাছ থেকে দেশাধ্যক্ষের প্রাসাদে নিয়ে গিয়ে … তারা যেন কলুষিত না হয়ে নিস্তার-পর্বের ভোজ আহার করতে পারে, সেজন্য তারা নিজেরা প্রাসাদে প্রবেশ করল না। অতএব, পীলাত বাইরে এসে তাদের কাছে বললেন, তোমরা এই লোকের বিরুদ্ধে কি অভিযোগ এনেছ? তারা উত্তরে তাকে বলল, এ যদি অপরাধী না হত আমরা আপনার হাতে এঁকে সমর্পণ করতাম না।” –(যোহন, ১৮ : ২৮-৩০)।
“পীলাত বিচারাসনে বসলে, তাঁর স্ত্রী (প্রাকুলা, দূত মারফত) পত্র পাঠালেন, সেই ধার্মিকের সাথে তোমার কোন সংস্রব না হোক, কারণ আমি আজ রাতে স্বপ্নে তার জন্য অনেক দুঃখভোগ করেছি।” (মথি, ২৭ : ১৯)। পীলাত এতে ভীত হলেন এবং যীশুর ধার্মিকতায় বিশ্বাসী হয়ে তাঁকে কৌশলে মুক্তি দেবার পথ খুঁজতে লাগলেন। যেহেতু, “তারা যে হিংসাবশতঃ তাঁকে সমর্পণ করেছে, তা তিনি জানতেন।” (মথি, ২৭ : ১৮)।
“পর্বের সময় দেশাধ্যক্ষের এই রীতি ছিল যে, লোকেরা যাকে দাবী করত এমন একজন বন্দীকে তিনি মুক্ত করে দিতেন। তখন যীশু বরাব্বা নামক তাদের একজন বিশেষ বন্দী ছিল। অতএব, তারা একত্র হলে, পীলাত তাদের বললেন, তোমরা কি চাও, আমি কাকে মুক্ত করে দেব, যীশু বরাব্বাকে না যাকে খ্রিস্ট বলে সেই যীশুকে?” (মথি, ২৭: ১৫-১৭)।
