একটি কথা অবশ্য জানা যায়, প্রধান পুরোহিতগণ তাঁকে ত্রিশটি রৌপ্যমুদ্রা দিয়েছিলেন। কিন্তু কেন দিয়েছিলেন? দিয়েছিলেন, যেন মানুষটিকে সারা নগরের লোক চেনে, তাঁকেই সনাক্ত করতে। কিন্তু সনাক্তকরণ চুম্বন ব্যতীত যদি তার বিরুদ্ধে অভিযোগের নিশ্চিদ্র কোন প্রমাণ সে দিতে পারত তবে কি কর্তারা অমন অসহায়বোধ করতেন। তাই তখন থেকেই সম্পূর্ণ ব্যাপারটি বিভ্রান্তিকর হয়ে দাঁড়ায়। তাছাড়া, মাত্র ত্রিশটি রৌপ্যমুদ্রার জন্য যিহূদা অবশ্যই বিশ্বাসঘাতকতা করেননি। বস্তুতঃ কারণ নিশ্চয় অন্য কিছু ছিল, যা যিহূদার আত্মহত্যার কারণে কোনদিন আর প্রকাশ পায়নি।
যাহোক, ইহুদিদের দাবি ছিল, তাদের এক ব্যবস্থা আছে, সে ব্যবস্থানুসারে যীশুর প্রাণদণ্ড হওয়া উচিত। কেননা, সে নিজেকে খোদার পুত্র করে তুলেছে। কিন্তু এসবকথা নিয়ে রোমানরা মাথা ঘামাবে কেন? ধর্মীয় ঝগড়ায় তাদের উৎসাহ ছিল না। তবুও, যোহন বলছেন :
“পীলাত যখন একথা শুনলেন, তিনি আরও ভীত হলেন’ (১৯ : ৮)।
কিসের ভয়? তার হাতে তো পুলিশ ছিল, তাছাড়া, সৈন্য-সামন্ত এবং সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ক্ষমতা। নীরব যীশুকে তিনি বলছেন :
‘তুমি কি জান যে, তোমাকে ক্রুশে দেয়ার ক্ষমতা আমার আছে এবং তোমাকে ছেড়ে দেয়ার ক্ষমতাও আমার আছে’ (১৯ : ১০)। তাহলে পীলাতের ভয়টা কিসের? শাসক হিসেবে পীলাত এমনই অত্যাচারী এবং ইহুদী-বিদ্বেষী ছিল যে রোম তাঁকে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিল। যাহোক, শেষপর্যন্ত যীশুকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়। রাজনৈতিক কারণ একটি নিশ্চয় ছিল, আর এ তো অজানা কথা নয় যে, রাজনৈতিক কারণের উল্লেখ নথিপত্রে বড় একটা থাকে না।
০৩. যীশুকে গ্রেফতারের বিস্তারিত বিবরণ
“তখনই প্রধান-পুরোহিতেরা ও ইহুদীদের প্রাচীনবর্গ কাইয়াফা নামক মহাপুরোহিতের প্রাঙ্গণে একত্র হয়ে এই সিদ্ধান্ত নিল, ছলে-বলে যীশুকে হত্যা করতে হবে। তবে, এটা পর্বের সময় নয়, পিছে লোকদের মধ্যে গোলমাল হতে পারে’।(মথি ২৬ : ১-৫)।
তখন বারোজনের একজন, যাকে যিহূদা ঈস্কারিয়োতলা হয়, সে প্রধান পুরোহিতদের কাছে গিয়ে বলল :
“আপনারা আমাকে কি দিতে চান, আমি তাকে আপনাদের হাতে তুলে দেব? তখন তারা তার হাতে ত্রিশটি রৌপ্যমুদ্রা দিল এবং সেই সময় থেকেই সে যীশুকে তাঁদের হাতে তুলে দেয়ার সুযোগ খুঁজতে লাগল।” (মথি, ২৬ : ১৪-১৬)।
যদিও আগেই বলা হয়েছে, মাত্র ত্রিশটি রৌপ্যমুদ্রার জন্য যিহূদা নিশ্চয় এ কাজটি করেননি। কারণ ছিল অন্যকিছু।
এ সম্পর্কে মনস্তত্ত্ববিদদের অনেকেই মনে করেন, যিহূদার এ কাজটি ছিল সাইকোলজিক্যাল। তার মনস্তাত্ত্বিক মনের একটি বিচিত্র খেলা। তিনি ছিলেন শিক্ষিত লোক, সবকথা তার যাচাই করে নেবার অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল। যীশুর অন্য শিষ্যদের মতো যা দেখছেন, যা শুনছেন, সবই নির্বিচারে ধ্রুব সত্য বলে মেনে নেয়াটা বোধহয় তার ধাতে ছিল না। লেখাপড়া জানার অভিশাপ মনে সন্দেহ জাগা, মনে মনে তর্কবিতর্ক করা, বাছবিচার করা, যাচাতে যাওয়া ইত্যাদি; যা তারও উপর বর্তেছিল। তাই, যিহূদা যীশুকে ইহুদীশাস্ত্রে লেখা মেশায়া বলে নিঃসন্দেহে মেনে নিতে পারেননি। যদিও, যীশুর অন্য শিষ্যদের মধ্যেও অনেকেই তাকে মেশায়া বলে ধরতে পারেননি, যদিও তারা ইহুদীদের রাজা মেশায়া বলে মেনে নিতে একটুও দ্বিধাসংকোচ করেননি। যিহূদা দেখলেন, তিনি ইহুদী পুরাণে মেশায়ার যে বর্ণনা পড়েছেন, যীশুর সঙ্গে তার কোথাও কোন মিল নেই। যীশু, ক্ষমাশীল, করুণাময়। তাঁর ব্যবহারও তো রাজার মত উগ্র দাম্ভিক নয়। তিনি মানুষকে বিনীত হতে, নিরভিমান হতে, মারমুখো না হতে শিক্ষাদান করেন। তিনি রোমানদের বিরুদ্ধে কখনও একটি কথাও বলেন না। তিনি কি করে ইহুদীদের রোমানদের কবল থেকে উদ্ধার করে তাদের দুর্গতি নাশ করবেন? খুব সম্ভব, এরকম নানা চিন্তা-বিচিন্তা যিহূদাকে একেবারে অস্থির করে তুলেছিল।
মূলত, ভুল হয় মেশায়া কথাটার অর্থ নিয়ে, সকল ইহুদীর মত যিহূদার কাছেও মেশায়া’ হচ্ছেন : পার্থিব দুর্গতি থেকে ইহুদীদের উদ্ধারকর্তা, রাজা। যীশুর কাছে মেশায়ার অর্থ মোক্ষদাতা, যিনি অমৃতলোকের সন্ধান দেন, অনন্ত জীবনের পথ দেখান, পাপতাপ, দুঃখ-শোক, বিবাদ-বিসংবাদ হরণ করে নিয়ে জগতকে শান্তিতে ভরে দেন। যিহুদা সেই মেশায়াকে একেবারেই বুঝে উঠতে পারেননি। তাছাড়া, যীশু যে এখন অতি সাবধানে, অতি সন্তর্পণে চলাফেরা করছেন, আত্মগোপন করে রয়েছেন, যিহূদার সেটা কোনভাবেই মনঃপুত হচ্ছে না। পুরাণে তো আছে, মেশায়াকে কেউ কিছু করে উঠতে পারবে না। ধরতে ছুঁতেই পারবে না তো মেরে ফেলা। দেখা যাক, যীশুকে ধরিয়ে দিলে পুরোহিতেরা তাঁকে বাঁধতে পারবেন কিনা? ভোজপর্বে যীশুর কথায় তার মনে হল যে, দীর্ঘকাল ধরেই তাদের এই অজ্ঞাতবাস চলতে থাকবে। তখনই যিহূদার মনস্থির হয়ে গেল। সুসমাচার রচয়িতা লকের ভাষায়:
তখন শয়তান এসে ঈষ্কারিয়োতীয় নামক যিহূদার মনে প্রবিষ্ট হল (২২: ৩)।
পথে যেতে যেতে যিহুদা নিশ্চয় ভাবলেন যে, যীশু যদি সত্যিই মেশায়া হন তো ঋত্বিক-পুরোহিত-আচাৰ্য্য-উপাধ্যায় সবাই মিলে তাঁদের সমগ্র বলপ্রয়োগ করে তার কেশাগ্রেরও কোন ক্ষতি সাধন করতে পারবে না। শাস্ত্র কখনও মিথ্যা হতে পারে না। কিন্তু যদি যীশু মেশায়া না হন…? যাকগে সে কথা … দূর হোক সে-চিন্তা …।
