পিতা, তুমি আমার কথা শুনেছ বলে আমি তোমাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি; তুমি সর্বদা আমার কথা শুনে থাক, এটা আমি জানতে পেরেছি।” (যোহন, ১১: ৪১-৪২)।
পূর্বোক্ত ঘটনাক্রম থেকে জানা যাচ্ছে যে, যীশু ক্রুশের লাঞ্ছিত মৃত্যু থেকে বাঁচার জন্য সদাপ্রভুর নিকট কাতর হয়ে প্রার্থনা করেছিলেন এবং বাইবেল বলে তার সেই প্রার্থনা সদাপ্রভু ঈশ্বর গ্রহণ করেছিলেন (হিব্রু ৫: ৭)।
এমতাবস্থায়, যদি স্বীকার করা হয় যে, ক্রুশ-ঘটনার সাথে সাথে যীশুর জীবনের অবসান ঘটেছিল, তবে ন্যায়ের অনুরোধে যুগপৎভাবে এটা স্বীকার করতে হবে যে, তাঁর নবী-জীবনটি সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়ে গিয়েছিল। কারণ, বাইবেলের বর্ণনানুসারে এই কর্তব্য পালনের বহুআগেই ক্রুশে তাঁর মৃত্যু হয়। এ অবস্থায় হয় স্বীকার করতে হবে, ক্রুশে যীশুর প্রাণদানের কথা মিথ্যে, না হয় স্বীকার করতে হবে বনি-ইস্রায়ীলের হারানো গোত্রগুলোর উদ্ধারের জন্য তাঁর আগমন হয়নি।
ক্রুশ কাহিনীর গোপন-রহস্য:
যীশুর ইহুদীদের সাথে সম্পত্তি নিয়ে বা ব্যক্তিগতভাবে কোন ঝগড়া ছিল না, যে-জন্য তাকে তারা হত্যা করতে চাইত; বরং বায়েত গ্রহণকারী, দীক্ষাদাতা যোহন (John The Baptist) বা ইয়াহইয়া নবী (আঃ)-এর ভবিষ্যদ্বাণীর মূলে যীশুর মিথ্যেবাদী হওয়া সম্বন্ধে ইহুদীদের এমন দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, যীশুর অনুসারীদের নিকট তা প্রমাণ করতে এবং তাকে মানার দায় থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য তাওরাতের শাস্তি (দ্বিতীয় বিবরণ, ২১ : ২৩) অনুযায়ী তাকে তারা ক্রুশে বধ করে মিথ্যেবাদী ও লাঞ্ছিত প্রমাণ করতে চেয়েছিল।
আর এ জন্য তারা যুগপৎভাবে যীশু-বিরোধী আন্দোলন চালানোর পর আঞ্চলিক শাসনকর্তা পীলাতের বরাবরে এই অভিযোগ পেশ করতে থাকল যে, যীশু রাজদ্রোহী নিজেকে তিনি ইহুদীদের রাজা বলে ঘোষণা করেন; লোকদের রাজকর দিতে নিষেধ করেন; ইহুদীদের পবিত্র ধর্মমন্দির সম্বন্ধে অবৈধ আক্রমণ করতে এবং নিজেকে খোদার পুত্র বলে ঘোষণা করতেও কুণ্ঠিত হন না, প্রভৃতি। এসব অপরাধের জন্য তাঁকে ক্রুশে টাঙ্গিয়ে নিহত করা হোক। এই ছিল ইহুদীদের দাবী। কিন্তু, প্রচলিত বাইবেলের বর্ণনানুসারে রাজদরবারের বিচারে ইহুদীদের দাবী সত্য বলে সাব্যস্ত হলে প্রমাণিত হবে যে যীশুকে ক্রুশে দিয়ে নিহত করা হয়েছিল, অন্যথায় প্রমাণিত হবে যে তাঁকে ক্রুশে দিয়ে নিহত করা হয়নি।
জোয়েল কারমাইকেল (Joel Carmichael) বলেছেন, ‘যীশু মন্দির আক্রমণ করেছিলেন’ কথাটি ঠিক নয়, বরং বিষয়টি ছিল রাজনৈতিক। কারণ, ইহুদীদের ধর্মজীবন নিয়ে বোম কখনও মাথা ঘামায়নি, কিন্তু এ কথা প্রমাণিত যে, তা কোন গণউত্থান কিম্বা গণবিদ্রোহ অথবা রোমের বিরুদ্ধে বিপ্লবের কোন ঘটনা নয়। তা যদি হত তবে তাদের ইতিহাসে সে কথা ফলাও করে লেখা থাকত। ঘটনাটি নিঃসন্দেহে মারাত্মক কিছু ছিল না। তবে, এ কথা প্রমাণিত সত্য যে, শিষ্যবর্গসমেত যীশুকে হঠাৎ গা ঢাকা দিতে হয়েছিল। কিন্তু কারণ?
‘উপদেশাবলী’ বলে, যীশু জানতেন, তাঁর জীবন বিপন্ন; তাই তিনি সশিষ্য পালিয়ে গিয়েছিলেন জেরুজালেমের উপকণ্ঠে কামরান উপত্যকার পূর্বে ত্রিশৃঙ্গ জয়তুন পর্বতে। তারপর নতুন নিয়মের সেই নাটকীয় বিবরণ সবারই জানা। যীশুকে হস্ত চুম্বন করে শত্রুদের নিকট ধরিয়ে দিয়েছিল তারই এক শিষ্য ঈস্কারিয়োতীয় যীহূদা।
কিন্তু প্রশ্ন জাগে, কি কারণে যিহূদা ইস্কারিয়োত যীশুর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল? যীশু তো ছিলেন শান্তশিষ্ট ভদ্র, সবাই তো তাকে ভালবাসতো। লোকের মঙ্গল বৈ মন্দ কখনও তিনি চাননি। তিনি যা করেছেন, খোলাখুলিভাবে সবার চোখের সামনেই তা করেছেন। সাধারণ মানুষ, সমাজপতি, ধর্মগুরু, দখলদার রোম-সেনা, সবাই তাকে ভালো করেই চিনতো, জানতো। শাসককুল তাঁকে গ্রেফতার করতে পারতো যে কোনদিন, ডেকে আনতে পারতো জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্যে। তবে এমন সর্বজনপরিচিত মানুষটিকে হাতে চুম্বন করে যীহূদা ইস্কারিয়োত-এর সনাক্ত করার দরকার হল কেন? ‘উপদেশাবলী’ বলে, পুরোহিত এবং সমাজপতিদের নাকি যীহুদা ইস্কারিয়োত বলেছিল, ‘যাকে আমি চুম্বন করব, জানবে সেই যীশু’। এইভাবে চিনিয়ে দেয়া থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যীশু ছদ্মবেশে ছিলেন। তাছাড়া, সুসমাচারের বিবরণ থেকে এটাও প্রমাণিত যে, পিতর ইত্যাদি শান্তিপূর্ণ ভ্রাতৃসঙ্ঘের সদস্যবৃন্দ সম্পূর্ণ সশস্ত্র অবস্থায় ছিল, যেমন, ‘পিতরের নিকট তখন তরবারী থাকাতে তিনি তা খুলে মহাযাজকের দাসকে আঘাত করে তার ডান কান কেটে ফেললেন। সে দাসের নাম মল্ক (যোহন, ১৮ : ১০)। কিন্তু যীশু বুঝতে পেরেছিলেন, সেখানে বাধাদানের চেষ্টা বৃথা, তাই তিনি বললেন, ‘তরবারী কোষবদ্ধ কর’। অতএব, যীশুকে তারা ধরে নিয়ে গেল। আর তাঁর শিষ্যরা ডামাডোলের মধ্যে অন্ধকারে ঝোপেঝাড়ে লুকিয়ে গা-ঢাকা দিল।
‘যীশুকে দণ্ড দেয়া হয়েছিল অকারণে’ এই বিষয়ে সুসমাচারে লেখকগণ একমত। বিচারসভা এবং মহাযাজকেরা তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দাঁড় করেছে, বিরুদ্ধ সাক্ষ্য অন্বেষণ করেছে, কিন্তু যীশুকে দোষীসাব্যস্ত করতে পারেনি। তবে, জানা যায়নি কি অপরাধের সংবাদ বিশ্বাসঘাতক যিহূদা ইস্কারিয়োত তাদেরকে দিয়েছিল। বিচারকালের কোন প্রতিবেদন এখনও পাওয়া যায়নি, শুনানীর সময়ও কখনো তাঁকে দেখা যায়নি।
