ঘড়িতে তিনটে বাজতেই বিছানায় উঠে বসল ফাঁতিনে। অথচ তার নড়াচড়ার ক্ষমতা ছিল না। তার হলুদ হয়ে যাওয়া শীর্ণ হাতদুটো জড়ো করা ছিল। দরজার দিকে তাকিয়ে ফাঁতিনে এমনভাবে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল যাতে মনে হল তার বুকের উপর থেকে যেন একটা ভারি বোঝা নেমে গেছে।
কিন্তু কেউ দরজা খুলে ঘরে ঢুকল না।
এইভাবে দরজার দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে পনেরো মিনিটকাল বসে রইল ফাঁতিনে। মনে হচ্ছিল তার শাস রুদ্ধ হয়ে গেছে। ভয়ে কথা বলতে পারছিল না নার্স। ঘড়িতে ফ্রাঁসোয়া চারটের একটা ঘণ্টা বাজতেই হতাশ হয়ে সে বালিশের উপর ঢলে পড়ল। সে কোনও কথা বলল না। শুধু বিছানার চাদরের আঁচলটা হাতের মুঠোর মধ্যে ধরে রইল।
এইভাবে আরও একটা ঘণ্টা কেটে গল। ঘড়িতে ঘণ্টা বাজার শব্দ হতেই আগ্রহভরে উঠে বসল সে। দরজার দিকে তাকাল। কিন্তু দরজা খুলে কেউ না আসায় আবার হতাশ হয়ে শুয়ে পড়ল।
তার মনের মধ্যে কী ছিল তা সবাই জানত। সে নিজে কিন্তু কোনও কথা বলত না, কারও বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ করত না। সে শুধু কাশত। মর্মবিদারক তার সে কাশি দেখে মনে হত তার হৃৎপিণ্ডটা যেন ছিঁড়ে যাবে। একটা বিরাট ছায়া ধীরে ধীরে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে তার গোটা দেহটাকে। তার গাল দুটো বিবর্ণ ও ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছে। আর ঠোঁট দুটো নীল দেখাচ্ছে।
অবশেষে পাঁচটা বাজলে ফাঁতিনেকে ক্ষীণ কণ্ঠে এক অনুযোগ করতে শোনা গেল, কাল আমি চলে যাচ্ছি, অথচ আজ তিনি এখনও এলেন না।
মঁসিয়ে ম্যাদলেন এখনও এল না দেখে সিস্টার সিমপ্লিস নিজেই আশ্চর্য হয়ে গেল। বিছানায় শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল ফাঁতিনে। সে যেন কী স্মরণ করার চেষ্টা করছিল। খুব নিচু গলায় একটা ঘুমপাড়ানি গান গাইতে শুরু করল সে। যখন তার মেয়ে। খুব ছোট ছিল তখন এই গানটা গেয়ে ঘুম পাড়াত তাকে। গত পাঁচ বছরের মধ্যে এ গানের কথা একবারও মনে পড়েনি তার। গানটা ছিল বড় করুণ ও মধুর। তার সুরের। মধ্যে ছিল সুখ-দুঃখ, আনন্দ, বেদনা, লাভ-ক্ষতির একটা মিশ্রিত অনুভূতি। ফাঁতিনে গানটা এখন হৃদয়গ্রাহী করে গাইল যে তা শুনে হাসপাতালের নার্সরা পর্যন্ত কেঁদে ফেলল। সিস্টার সিমপ্লিসের মতো নিষ্ঠুর প্রকৃতির মেয়ের চোখেও জল এল।
ঘড়িতে ছ’টা বাজল। কিন্তু সেদিকে আর কোনও খেয়াল করল না ফাঁতিনে। সে তার চারপাশের কোনও কিছুর দিকে একবার তাকালও না।
সিস্টার সিমপ্লিস একসময় হাসপাতালের একজন ঝিকে ম্যাদলেনের কারখানায় পাঠাল। মেয়র ফিরেছে কি না সে দেখে এসে খবর দেবে। মেয়েটি কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে এল। ফাঁতিনে তখন স্তব্ধ হয়ে শুয়ে কী ভাবছিল।
মেয়েটি ফিরে এসে সিস্টারকে চুপি চুপি জানাল, মঁসিয়ে ম্যাদলেন আজ সকাল হতেই একটা ঘোড়ার গাড়ি ভাড়া করে বেরিয়ে গেছেন। তিনি বলে গেছেন আজ রাতে না-ও ফিরতে পারেন। কেউ কেউ বলছে তাকে নাকি অ্যারাসের কোনও এক রাস্তায় দেখা গেছে।
সিস্টার সিমপ্লিস যখন মেয়েটির সঙ্গে কথা বলছিল চুপি চুপি তখন তা দেখে হঠাৎ বিছানার উপর উঠে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল ফাঁতিনে। তার হাতের মধ্যে বিছানার চাদরের আঁচলটা ধরা ছিল।
ফাঁতিনে হঠাৎ বলে উঠল, তোমরা মঁসিয়ে ম্যালেনের কথা বলছ। কিন্তু চুপি চুপি বলছ কেন? তিনি কী করছেন এখন? কেন তিনি আসেননি?
তার গলার স্বর পুরুষের কণ্ঠস্বরের মতো মোটা শোনাচ্ছিল। সে আবার তাদের বলল, উত্তর দাও আমার কথার।
সিস্টার সিমপ্লিস বলল, তার ভৃত্য বলেছে তিনি আজ আসতে পারবেন না। শুয়ে পড় বাছা। শান্ত হও। তা না হলে রোগ আরও বেড়ে যাবে।
সে কথায় কান না দিয়ে ফাঁতিনে জোরে চিৎকার করে বলল, আসতে পারবেন না? কিন্তু কেন পারবেন না? তোমরা তার কারণ জান। তোমরা সে কথা বলাবলি করছিলে। আমি তা জানতে চাই।
হাসপাতালের সেই ঝি সিস্টারকে বলল, বল তিনি মিটিংয়ে গেছেন।
সিস্টার সিমপ্লিসের মুখখানা অপ্রতিভ হয়ে উঠল। তাকে মিথ্যা কথা বলতে হবে। আবার ভাবল সে যদি সত্যি কথা বলে তা হলে তার এই বর্তমান অবস্থায় সে কথার পরিণাম হবে মারাত্মক। যাই হোক, সব কুণ্ঠা সব দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে সে ফাঁতিনের দিকে গম্ভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, শহরের বাইরে গেছেন।
ফাঁতিনের চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে তার পায়ের উপর ভর দিয়ে বসল। এক অনির্বচনীয় সুখের ভাব ফুটে উঠেছিল তার মুখের উপর। সে বলল, তিনি কসেত্তেকে আনতে গেছেন।
তার মুখখানা উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল। এক নীরব নিরুচ্চার প্রার্থনায় ঠোঁট দুটো কাঁপছিল। একটু থেমে সে আবার বলতে লাগল, আমি এবার শুয়ে পড়ব। আমাকে যা করতে বলবে আমি তাই করব। কিছুক্ষণ আগে আমি খুব খারাপ ব্যবহার করেছি। তোমাদের সঙ্গে চিৎকার করে কথা বলেছি। আমি জানি সেটা অন্যায়। আশা করি তোমরা আমায় ক্ষমা করবে। আমি এখন সুখী। ঈশ্বর বড় দয়ালু। মঁসিয়ে ম্যাদলেনও আমার প্রতি বড় দয়ালু। তিনি আমার কসেত্তেকে আনছেন মঁতফারমেল হতে।
সে চিত হয়ে শুয়ে পড়ল শান্তভাবে। সিস্টার বালিশটা ঠিক করে দিল। নার্স তাকে একটা রুপোর ক্রস দিয়েছিল। তার গলায় সেটা ঝুলছিল। সে সেটাকে চুম্বন করল।
সিস্টার সিমপ্লিস বলল, চুপ করে শুয়ে থাক। তোমার আর কথা বলা উচিত নয়।
ফাঁতিনে তার একটা উত্তপ্ত হাত বাড়িয়ে দিল। তার গায়ে তখনও প্রবল জ্বর ছিল দেখে সিস্টার ব্যথা পেল।
