ফাঁতিনে তবু বলে যেতে লাগল, তিনি প্যারিসের দিকে গেছেন। কিন্তু তাঁকে অতদূর যেতে হবে না। মঁতফারমেল হল প্যারিসের বাঁ দিকে অল্প কিছু দূরে। গতকাল আমি যখন তাকে কসেত্তের কথা বলেছিলাম তখন তিনি বলেছিলেন, ‘শিগগির এসে যাবে।’ সে কথা মনে আছে তোমাদের? তিনি আমাকে চমক লাগিয়ে দিতে চান। তিনি থেনার্দিয়েরদের একটা চিঠি লিখে আমাকে দিয়ে সই করিয়ে নিয়েছিলেন। সব টাকা মিটিয়ে দিলে তারা আমার মেয়েকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে। সব টাকা মিটিয়ে দিয়ে কেউ কখনও কারও ছেলেকে ধরে রেখে দিতে পারে? দয়া করে আমাকে কথা বলতে নিষেধ করবে না সিস্টার। আমার এখন খুব আনন্দ হচ্ছে। আমি এখন সুস্থ। আমি কসেত্তেকে দেখতে পাব। আমার এখন খিদে পেয়ে গেছে। পাঁচ বছর তাকে আমি দেখিনি। মা’র ওপর সন্তানের প্রভাব কতখানি তা জান না তোমরা। তোমরা দেখবে মেয়েটা দেবদূতের মতো। শৈশবে তার হাতের আঙুলগুলো সরু সরু আর গোলাপি ছিল। তার হাত দুটো খুব সুন্দর হবে। এখন তার বয়স সাত। এখন অনেকটা বড় হয়ে উঠেছে। আমি তাকে কসেত্তে বলে ডাকি। তার আসল নাম হল ইউফ্রেসি। আজ সকালেই আমার মনে হয়েছিল আমি তাকে শীঘ্রই দেখতে পাব। নিজের সন্তানকে বছরের পর বছর না দেখে থাকা যায় না। সেটা উচিতও নয়। মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী; চিরকাল কেউ বাঁচে না। মঁসিয়ে ম্যাদলেন তাকে আনতে গিয়ে খুব ভালো কাজ করেছেন। আজ খুব ঠাণ্ডা ছিল, তাই নয় কি? আমার মনে হয় তার একটা খুব গরম ওভারকোট আছে এবং তারা আগামীকালই এসে যাবেন। কাল শুভ দিন। কাল ফিতেওয়ালা জামাটা পরার কথা আমাকে মনে করিয়ে দেবে তো? মঁতফারমেল এখান থেকে অনেক দূর। আমি একদিন সেখান থেকে সমস্ত পথ হেঁটে এসেছি। কত কষ্টকিন্তু ঘোড়ার গাড়ি খুব তাড়াতাড়ি যায়। তারা কালই এসে পড়বে। মঁতফারমেল এখান থেকে কত দূর?
দূরত্ব সম্বন্ধে সিস্টারের কোনও ধারণা ছিল না। সে বলল, তিনি আগামীকালই নিশ্চয় এসে পড়বেন।
ফাঁতিনে বলল, কাল আমি কসেত্তেকে দেখব। কাল। কাল। হে আমার প্রিয় সিস্টার, আমার কোনও রোগ নেই। আমি আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠেছি। তোমরা আমাকে বললে আমি এখন নাচতেও পারব।
যারা তাকে মাত্র পনেরো মিনিট আগে দেখেছে তারা এখন তাকে দেখলে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাবে। মুখখানা উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। তার কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। মাঝে মাঝে আপন মনে কী বলছিল। সন্তানগর্বে গরবিনী মাতার আনন্দে আনন্দিত শিশুর মতো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
সিস্টার বলল, ঠিক আছে, এখন তুমি যখন খুশি, তা হলে আমাদের কথা শোনা উচিত তোমার। তুমি আর কথা বলবে না।
ফাঁতিনে শান্ত কণ্ঠে বলল, হ্যাঁ, আমি যখন আমার সন্তানকে ফিরে পাচ্ছি তখন আমি ভালো হয়ে উঠব।
এই কথা বলে সে নীরবে শুয়ে পড়ল। শুধু বিস্ফারিত চোখ দুটো মেলে তাকিয়ে রইল।
সে এবার ঘুমিয়ে পড়বে ভেবে সিস্টার মশারিটা মেলে দিল।
সন্ধে সাতটা থেকে আটটার মধ্যে ডাক্তার এল। কোনও শব্দ না করে ডাক্তার মশারিটা তুলে দেখল ফাঁতিনে শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে।
ফাঁতিনে বলল, আমার মেয়েটার জন্য আমার পাশে একটা ছোট বিছানা পাততে হবে। ঘরেতে জায়গা আছে।
ডাক্তার ভাবল, ফাঁতিনে ভুল বকছে। সে সিস্টার সিমপ্লিসকে জনান্তিকে ডেকে নিয়ে গিয়ে কথা বলল। সিস্টার সিমপ্লিস বলল, মঁসিয়ে ম্যাদলেন দু একদিনের জন্য বাইরে গেছেন। কিন্তু রোগিণী ফাঁতিনে ভেবেছে তিনি তার মেয়েকে আনার জন্য তফারমেলে গেছে। কিন্তু সে তার ভুল ভাঙেনি এবং তাকে এই বলে আশ্বাস দিয়েছে যে তিনি মঁতফারমেলে গেছেন। ডাক্তার তা সমর্থন করে আবার ফাঁতিনের বিছানার পাশে গেল।
ফাঁতিনে বলল, সারারাত আমি তার শ্বাস-প্রশ্বাস শুনতে পাব। আমার ভালো ঘুম হয় না রাতে। সকালে সে জেগে উঠলেই আমি তাকে সুপ্রভাত জানাতে পারব।
ডাক্তার বলল, তোমার হাত দাও।
ফাঁতিনে তার হাতটা বাড়িয়ে হেসে উঠল। বলল, দেখুন আমি অনেকটা ভালো আছি। আগামী কাল কসেত্তে এখানে এসে যাবে।
রোগীর অবস্থা এখন ভালো দেখে ডাক্তার আশ্চর্য হয়ে গেল। রোগীর হাতের নাড়ির স্পন্দন আগের থেকে অনেক বলিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। তার মনের সেই চঞ্চল অবস্থাটা আর নেই। এক নতুন জীবনের ঢেউ যেন তার অবসন্ন দেহটাকে সঞ্জীবিত করে তুলেছে।
ফাঁতিনে বলল, সিস্টার আপনাকে বলেনি? মেয়র নিজে আমার মেয়েকে আনতে গেছেন।
ডাক্তার তাকে চুপ করতে বলল। গোলমাল করতে নার্সদের নিষেধ করল। সে কুইনাইন আর একটা হালকা ধরনের ওষুধের পিলের ব্যবস্থা করল। যদি রাতে জ্বর বাড়ে তা হলে তাকে খাওয়াতে হবে। সে যাওয়ার সময় সিস্টারকে বলল, রোগীর অবস্থার সত্যিই উন্নতি হয়েছে। সৌভাগ্যক্রমে মেয়র যদি সত্যিই তার মেয়েকে নিয়ে আসেন তা হলে ভালো হয়। এ ধরনের কত আশ্চর্য ঘটনা ঘটে। বড় রকমের সুখ বা আনন্দ অনেক সময় আশ্চর্যভাবে রোগ সারিয়ে তোলে। রোগটা ভেতরে ভেতরে বেড়ে গেছে ঠিক। কিন্তু ব্যাপারটা সত্যিই রহস্যময়। হয়তো তাকে আমরা সারিয়ে তুলতে পারব। হয়তো সে এ যাত্রা বেঁচে যাবে।
.
৭
রাত্রি আটটার সময় ম্যাদলেনের গাড়িটা অ্যারাসের হোটেল দ্য লা পোস্তের গেটের মধ্যে ঢুকল। গাড়িটা দেখেই হোটেলের ভৃত্যরা অভ্যর্থনা জানাতে এল নবাগতকে। ম্যাদলেন গাড়ি থেকে নেমে অন্যমনস্কভাবে স্বল্প কথায় তাদের অভ্যর্থনার উত্তর দিল। তার পর বাড়তি ভাড়াটে ঘোড়াটা সেই ছেলেটার মারফত পাঠিয়ে দিয়ে তার ঘোড়াটা আস্তাবলে নিয়ে গেল। এরপর সে নিচের তলায় বিলিয়ার্ড খেলার ঘরটা খুলে একটা টেবিলের ধারে চেয়ারে বসল। এ একটানা চৌদ্দ ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে এসেছে। তার আসার কথা ছিল ছটার মধ্যে। কিন্তু দেরি হয়ে যাওয়ার জন্য সে দায়ী নয়। সুতরাং এ বিষয়ে কোনও ক্ষোভ বা আক্ষেপ ছিল না তার অন্তরে।
