ম্যাদলেন যখন তিনকেতে পৌঁছল তখন গোধূলি হয়ে আসছিল। ছেলেমেয়েরা স্কুল থেকে পালিয়ে যাচ্ছিল। তারা দেখল একটা ঘোড়ার গাড়ি করে একজন পথিক ঢুকল। শহরে। ম্যাদলেন তিনকেতে থামল না। শীতের দিনে তাড়াতাড়ি সন্ধে হয়ে যায়। শহর থেকে ম্যাদলেন যখন গাড়ি চালিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল তখন একটা লোক রাস্তা মেরামত করতে করতে তার দিকে তাকিয়ে বলল, ঘোড়াটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। আপনি কি অ্যারাসে যাচ্ছেন?
ম্যাদলেন বলল, হ্যাঁ।
কিন্তু সেখানে যেতে আপনার অনেক সময় লাগবে।
ম্যাদলেন তার ঘোড়ার লাগাম ধরে বলল, অ্যারাস এখান থেকে কতদূর?
পুরো চৌদ্দ মাইল।
সে কী! ভাবের লোক বলছে দশ মাইলের কিছু বেশি।
কিন্তু রাস্তা মেরামত হচ্ছে। আপনাকে ঘুরে যেতে হবে।
অন্ধকার হয়ে আসছে, পথ হারিয়ে ফেলব।
আপনি এ অঞ্চলের লোক নন?
না।
আপনি তিনকের একটা ভালো হোটেলে রাতটা কাটান। আপনার ঘোড়াটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। হোটেলের ছেলেটাকে বলে একটা ঘোড়া ভাড়া করার ব্যবস্থা করুন।
লোকটার পরামর্শমতো ম্যাদলেন তিনকের সেই হোটেলে গেল। আধঘণ্টার মধ্যে একটা বাড়তি ঘোড়া ভাড়া করে গাড়িটাতে জুড়ল। হোটেলের ছেলেটাকে পথ দেখাবার জন্য সঙ্গে নিল। ম্যাদলেন তাকে বলল, ঠিক পথে গাড়ি চালাও। আমি তোমাকে ডবল মজুরি দেব।
পথের সামনে একটা গাছের ডাল পড়ে ছিল। ছেলেটা বলল, এই পথটা অন্ধকারে দুর্গম হয়ে ওঠে। আমরা ভোর হওয়ার আগে অ্যারাসে পৌঁছতে পারব না।
ম্যাদলেন বলল, একটা দড়ি আর ছুরি আছে তোমার কাছে?
ছেলেটা বলল, আছে।
ম্যাদলেন ছুরি দিয়ে ডালটা কেটে পরিষ্কার করল। তাকে কুড়ি মিনিট কেটে গেল। তার পর গাড়িটা চলতে লাগল ঠিকমতো।
এরপর ওরা একটা ফাঁকা মাঠ পেল। ধোয়ার মতো কুয়াশায় মাঠটা আর পাহাড়ের মাথাগুলো ঢেকে ছিল। আকাশে মেঘ ছিল। সমুদ্র থেকে ছুটে আসা বাতাসের গর্জন শোনা যাচ্ছিল। শীতের রাতের কনকনে ঠাণ্ডায় কাঁপছিল ম্যাদলেন।
শীতের হাওয়া ম্যালেনের হাড় ভেদ করে কাঁপুনি ধরাচ্ছিল। গতকাল রাত থেকে সে কিছু খায়নি। অতীতের আর এক রাতের কথা মনে পড়ল তার। সে রাতে দিগনের প্রান্তে ফাঁকা মাঠটায় একা একা পথ হাটছিল সে। সেটা আট বছর আগের কথা, কিন্তু মনে হচ্ছে যেন কালকের কথা।
চার্চের ঘড়িতে টং টং করে সাতটা বাজল।
ছেলেটা বলল, অ্যারাস এখান থেকে মাত্র ছ মাইল। আমরা আটটার সময় পৌঁছে যাব।
এবার ম্যালেনের প্রথম মনে হল যে কাজের জন্য সে এত চেষ্টা করে এর অ্যারাসে সেই কাজটা পণ্ড হয়ে গেল। তার সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গেল। সে জানে না মামলাটা কখন হবে। আগে সময়টা জেনে নেওয়া উচিত ছিল। সে সময়ে যেতে পারবে কি না
তা না জেনে এত তাড়াহুড়ো করে এখানে আসা উচিত হয়নি। সে এখন হিসাব করে দেখতে লাগল। সাধারণত কোর্টের অধিবেশন বসে সকাল ন’টায়। এ মামলা বেশিক্ষণ চলবে না। আপেল চুরির মামলা একটা তুচ্ছ ব্যাপার। তার পর আছে শনাক্তকরণের ব্যাপারটা। কয়েকজন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করতে হবে। উকিলদের বলার কিছু নেই। সে অ্যারাসে পৌঁছবার আগেই হয়তো সব শেষ হয়ে যাবে।
ছেলেটা ঘোড়াটাকে চাবুক মারল। ওরা নদী পার হয়ে ম সেন্ট এলয় পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে লাগল।
তখন রাত্রির অন্ধকার আরও ঘন হয়ে উঠল।
.
৬
এদিকে ঠিক সেই রাতে ফাঁতিনের একেবারে ঘুম হয়নি। সারারাত কেশেছে, প্রবল জ্বরের ঘোরে প্রলাপ বকেছে। কুস্বপ্ন দেখছে। পরদিন সকালে ডাক্তার এসে দেখল সে তখনও প্রলাপ বকছে। ডাক্তার বিচলিত হয়ে পড়ল এবং বলল, মঁসিয়ে ম্যাদলেন ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গেই তাকে যেন খবর দেওয়া হয়।
সারা সকাল ফাঁতিনে কেমন উদাসীন হয়ে রইল। সে বিছানার চাদরটা হাতের মুঠোয় ধরে রইল। নিজের মনে দূরত্ব গণনা করতে লাগল। তার চোখদুটো কোটরে ঢুকে গিয়েছিল। চোখের দৃষ্টিটা শূন্য এবং নিষ্প্রাণ দেখাচ্ছিল, কিন্তু এক একসময় আকাশের তারার মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। মনে হচ্ছিল পৃথিবীর আলো ছেড়ে অনেক অন্ধকার পার হয়ে স্বর্গের আলোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
সিস্টার সিমপ্লিস যতবার ফাঁতিনেকে সে কেমন আছে তা জিজ্ঞাসা করেছে ততবারই সে বলেছে, খুব ভালো, আমি শুধু মঁসিয়ে ম্যাদলেনকে দেখতে চাই।
কয়েক মাস আগে ফাঁতিনে যখন সব লজ্জা ও শালীনতা ঝেড়ে ফেলে এক ঘৃণ্য ও অবাঞ্ছিত জীবন যাপন করতে শুরু করে তখন তাকে দেখে মনে হয় আগেকার সেই সুন্দরী ফাঁতিনের সে যেন ছায়ামাত্র। এখন আবার রোগে ভুগে ভুগে তার চেহারা আরও খারাপ হয়ে যাওয়ায় তাকে তারই প্রেতাত্মার মতো মনে হচ্ছিল। তার দৈহিক রুগ্ণতা। আত্মিক রুগণতাকে অনেক বাড়িয়ে দেয়। মাত্র পঁচিশ বছরের এক যুবতী বলে তাকে চেনাই যাবে না। তার কপালে কুঞ্চন দেখা দিয়েছে, ঘাড়ের হাড় বেরিয়ে গেছে। মুখে সব দাঁত নেই, গালে মাংস নেই। রুগ্ণ চুলগুলোতে জট পাকিয়ে গেছে। রোগ মানুষের বয়সকে অনেক বাড়িয়ে দেয় অল্প দিনের মধ্যে।
ডাক্তার আবার দুপুরের দিকে এল। নার্সদের কিছু নির্দেশ দিল। ম্যাদলেন এসেছে। কি না জিজ্ঞাসা করল।
মঁসিয়ে ম্যাদলেন রোজ বেলা তিনটের সময় দেখতে আসত ফাঁতিনেকে। এ বিষয়ে তার নিয়মানুবর্তিতার অভাব হত না। সেদিন বেলা আড়াইটে বাজতেই অধৈর্য হয়ে উঠল ফাঁতিনে। সে প্রায়ই কটা বাজে তা ঘন ঘন জিজ্ঞাসা করতে লাগল।
