জেভার্তের সঙ্গে তার দেখা হওয়ার পর থেকে এই প্রথম একটা গভীর স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়ল ম্যাদলেন। যে লোহার একটা হাত কুড়ি ঘণ্টা ধরে তার বুকের ভেতরটা শক্ত করে রেখেছিল সে হাতটা সহসা আলগা হয়ে গেল। তার সহায় এবং তিনি সব সমস্যার সমাধান করে দিলেন। নিজেকে সে বলল, সে যা কিছু করার করেছে এবং এখন সে তার বিবেককে সহজেই শান্ত করতে পারবে।
এতক্ষণ ধরে তাদের মধ্যে যেসব কথাবার্তা হচ্ছিল সেসব কথাবার্তা যদি হোটেলের ভেতরে হত এবং তা বাইরের কেউ না শুনত তা হলে ব্যাপারটার এখানেই অবসান ঘটত, তা হলে এরপর আর কোনও ঘটনা ঘটত না। কিন্তু গাঁয়ে কোনও নবাগত এলে এবং সেই সঙ্গে কোনও বিষয়ে কোনও কথাবার্তা হলে সাধারণত তা আর পাঁচজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ম্যাদলেন যখন হোটেলের ছেলেটা আর বুরগেলার্দের সঙ্গে তার গাড়ির চাকা নিয়ে কথা বলছিল তখন তাদের কাছে ছোটখাটো একটা ভিড় জমে যায়।
এমন সময় ভিড়ের মধ্য থেকে একটা ছেলে বেরিয়ে ছুটে গিয়ে গাঁয়ের এক বুড়িকে ডেকে আনে।
ম্যাদলেন যখন এ বিষয়ে একেবারে মনস্থির করে ফেলেছিল তখন সেই বুড়ি তার। সামনে এসে বলল, মঁসিয়ে, আপনি কি একটা ছোট গাড়ি ভাড়া করতে চান?
সরলভাবে উচ্চারিত এই সামান্য নির্দোষ কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে ঠাণ্ডার মধ্যেও ঘাম দেখা দিল ম্যাদলেনের শরীরে। যে লোহার হাতটা আগে তার গলাটা ধরে রেখেছিল সে হাতটা আবার অন্ধকারের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে তার গলাটা ধরার জন্য প্রস্তুত হতে লাগল।
ম্যাদলেন বলল, হ্যাঁ ম্যাদাম, একটা গাড়ি ভাড়া করতে চাই, কিন্তু কোনও গাড়ি পাওয়া যাচ্ছে না।
বুড়ি বলল, কিন্তু গাড়ি আছে।
কোথায়?
আমার বাড়ির উঠোনে।
ম্যাদলেন আবার ভয়ে কাঁপতে লাগল। সেই লোহার অদৃশ্য হাতটা আবার তার গলাটা টিপে ধরল।
বুড়িটার বাড়ির উঠোনে সত্যিই একটা গাড়ি পড়ে ছিল। হোটেলের ছেলেটা আর বুরগেলার্দ একজন খরিদ্দারকে হারাতে হবে ভেবে হতাশ হয়ে গাড়িটার নিন্দা করতে লাগল। বলল, গাড়িটা খারাপ, দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকার ফলে চাকাগুলোতে মরচে পড়ে গেছে। এই চাকাভাঙা গাড়িটা ভাড়া করা মোটেই ভালো হবে না। সে গাড়ি নিয়ে এত পথ যাওয়া উচিত হবে না এবং সেটার ওপর নির্ভর করা বাতুলতার কাজ হবে।
কথাটা সত্যি এবং গাড়িটা পুরনো হলেও গাড়িটার দুটো চাকা ছিল। ম্যাদলেন তার গাড়িটা মেরামত করতে দিয়ে বুড়িকে ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে ভাড়াটে গাড়িটাতে ঘোড়াটাকে জুড়ে অ্যারাসের পথে তখনি রওনা হয়ে পড়ল।
সে নিজের মনে মনে স্বীকার করল, কিছুক্ষণ আগে তাকে আর যেতে হবে না ভেবে আনন্দ অনুভব করছিল। এখন সেই আনন্দের কথা ভেবে রেগে গেল সে। সে আনন্দকে অবান্তর মনে হল তার। মোটের ওপর সে নিজের স্বাধীন ইচ্ছাতেই অ্যারাস যাচ্ছে। কেউ যেতে বাধ্য করেনি তাকে। সে নিজে অন্য মত না করলে সে যাওয়া বন্ধ হবে না।
হেদসিন গা-টা ছেড়ে আসতেই একটা ছেলের গলা শুনতে পেল ম্যাদলেন। যে ছেলেটা বুড়িকে ডেকে দেয় সেই ছেলেটা তাকে গাড়ি থামাতে বলছিল চিৎকার করে। সে ছুটতে ছুটতে আসছিল গাড়ির পিছু পিছু।
ম্যাদলেন বলল, কী চাই?
ছেলেটা বলল, আমিই আপনার গাড়ি ভাড়ার ব্যবস্থা করে দিই, আমাকে কিছু দিলেন না।
ম্যাদলেন সাধারণত দানশীল হলেও সে দেখল ভাড়া হিসেবে বুড়িকে সে যথেষ্ট দিয়েছে। সুতরাং এ দাবি অতিরিক্ত। তাই সে বলল, তুমি আর কিছু পাবে না।
এই বলে ঘোড়াটাকে চাবুক মেরে গাড়িটা চালিয়ে দিল।
পনেরো মাইল পথ যাওয়ার পর সেন্ট পল নামে একটা জায়গায় এসে একটা হোটেলে উঠল ম্যাদলেন।
হোটেল মালিকের স্ত্রী এসে বলল, মঁসিয়ে, কিছু খাবেন?
ম্যাদলেন বলল, হ্যাঁ, আমার ক্ষিদে পেয়েছে।
মহিলাটির মুখখানা বেশ হাসিখুশিতে ভরা। ম্যাদলেন তার পিছু পিছু হোটেলের ভেতর নিচু ছাদওয়ালা একটা ঘরে গিয়ে ঢুকল। টেবিলের উপর অয়েলক্লথ পাতা ছিল।
ম্যাদলেন বলল, তাড়াতাড়ি কর, আমার সময় নেই।
এতক্ষণে তার মনে পড়ল তার প্রাতরাশ খাওয়া হয়নি।
তাকে খাবার দেওয়া হলে ম্যাদলেন একটা রুটি কামড়ে খেয়ে আর খেতে পারল না। পাশের একজন লোককে জিজ্ঞাসা করল, এখানকার রুটি তেতো কেন?
যাই হোক, এক ঘণ্টা বিশ্রামের পর আবার রওনা হয়ে পড়ল ম্যাদলেন। এরপর সে গিয়ে থামবে তিনকেতে। অ্যারাস থেকে তিনকে বারো মাইলের পথ।
অ্যারাস যাওয়ার পথে কী ভাবছিল সে? সকালের মতোই পথের ধারে ধারে গাছপালা। খড়ের ঘর, চষা মাঠ প্রভৃতি দৃশ্যগুলো দেখতে দেখতে যেতে লাগল সে। এইসব দৃশ্যমান বস্তুগুলো এক একটা চিন্তার আকার ধারণ করতে লাগল। প্রথম এবং শেষবারের মতো অসংখ্য বস্তু দেখার মতো দুঃখজনক এবং মর্মান্তিক আর কিছুই হতে পারে না। কোনও দূর পথে ভ্রমণ করতে যাওয়া মানেই জীবন-মৃত্যুর মধ্য দিয়ে অজস্র রূপান্তর লাভ করা। আমাদের মনের মধ্যে অনেক সময় আমাদের জীবন আর বহির্জগতের চলমান দৃশ্যাবলি সমান্তরালভাবে প্রভাব বিস্তার করে চলে। আলো অন্ধকারে মিলে মিশে জীবনের সব উপাদান আমাদের কাছ থেকে দূরে পালিয়ে যেতে চায়। আমরা তখন দু হাত বাড়িয়ে ধরতে যাই তাদের। এইভাবে পথে যেতে যেতেই আমরা হঠাৎ বৃদ্ধ হয়ে পড়ি। অজস্র অভিজ্ঞতা আর চিন্তার মধ্য দিয়ে আমাদের বয়স বেড়ে যায়। ঘনায়মান অন্ধকারে আমরা অভিভূত হয়ে পড়ি। আমাদের সামনে দেখি। একটা কালো দরজা, আমাদের জীবনকে মনে হয় এক পলাতক অশ্বের পৃষ্ঠে উপবিষ্ট এক অসহায় সওয়ার। সেই কালো দরজাটার ওপারের ছায়ান্ধকারে অবগুণ্ঠিত এক অচেনা মানুষ সেই সওয়ারকে নামাবার জন্য প্রতীক্ষায় থাকে।
