পথের ধারে একটা বিচ্ছিন্ন বাড়ি দেখতে পেল ভলজাঁ। বাড়িটার লোকজন তখনও ঘুমিয়ে আছে। সে ভাবল, এখনও ঘুমোচ্ছে লোকগুলো? আমরা যখন আনন্দে উফুল্ল হয়ে থাকি তখন ঘোড়ার ক্ষুর, গাড়ির চাকা প্রভৃতির শব্দ আমাদের ভালো লাগে, কিন্তু বিষণ্ণ অবস্থায় থাকলে এইসব শব্দকে ভালো লাগে না।
এইসব বস্তুকে সে ভালোভাবে না দেখলেও তাদের উপস্থিতি সম্বন্ধে সে পূর্ণমাত্রায় সচেতন ছিল এবং তাদের ছায়া-ছায়া অন্ধকারে আচ্ছন্ন উপস্থিতি তার মনের উত্তেজিত অবস্থাটাকে বিষাদে ভরিয়ে দিচ্ছিল।
ভলজাঁ যখন হেসিনে পৌঁছল তখন রোদ উঠে গেছে। তার নিজের বিশ্রাম আর ঘোড়টাকে খাওয়াবার জন্য একটা হোটেলে গিয়ে উঠল।
শফেয়ার ঠিকই বলেছিল, ঘোড়াটা ছিল বুলোনাই জাতীয়। তার মাথাটা আর পেটটা মোটা। ঘাড়টা ছোট। তবে বুকটা চওড়া, পাগুলো দড়ির মতো সরু সরু। কিন্তু পায়ের ক্ষুরগুলো খুব শক্ত। পাগুলো তীব্র গতিসম্পন্ন। ঘোড়াটা দেখতে কদাকার, কিন্তু বেশ বলিষ্ঠ। ঘোড়াটা দুঘণ্টায় দশ মাইল পথ অতিক্রম করেছে, অথচ একটু ঘাম ঝরেনি তার দেহে।
গাড়ি থেকে নামেনি ভলজাঁ। হোটেলের একটা ছেলে এসে ঘোড়াটাকে খাবার দিল। সে গাড়ির বাদিকের চাকাটা দেখে বলল, আপনি কি এই গাড়ি নিয়ে অনেক দূরে যাচ্ছেন?
কেন?
আপনি কি অনেক দূর থেকে আসছেন?
প্রায় দশ মাইল।
তাই নাকি?
তার মানে?
ছেলেটা আর একবার গাড়ির চাকাটার দিকে তাকাল এবং দাঁড়িয়ে রইল। বলল, দশ মাইল পথ এসেছে বটে, কিন্তু আর এক মাইলও যেতে পারবে না।
ভলজাঁ গাড়ি থেকে লাফ দিয়ে নেমে পড়ল। কী বলছ তুমি?
ছেলেটি বলল, এটা আশ্চর্যের ব্যাপার যে আপনি দশ মাইল পথ এসেছেন, অথচ গাড়িটা কোনও গর্তে পড়েনি। আপনি চাকাটা নিজে দেখতে পারেন।
চাকাটা সত্যিই ধাক্কায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পথে ডাকগাড়ির সঙ্গে ধাক্কা লাগায় তার দুটো নাভিদণ্ড ভেঙে যায় এবং তার মুহুড়িটা আলগা হয়ে যায়।
ম্যাদলেন ছেলেটাকে বলল, চাকা মেরামতের একজন লোক পাওয়া যাবে?
হ্যাঁ যাবে।
তুমি তাকে নিয়ে আসবে?
সে পাশেই থাকে, বুরগেলার্দ।
বুরগেলার্দ কাছেই ছিল। সে এসে চাকাটা দেখে ঠোঁট কামড়ে দাঁড়িয়ে রইল।
ম্যাদলেন বলল, তুমি কি চাকাটা এখন মেরামত করে দিতে পারবে?
হ্যাঁ মঁসিয়ে।
তা হলে কখন আমি গাড়ি নিয়ে রওনা হতে পারব?
আগামীকাল।
আগামীকাল!
একদিনে কাজ। মঁসিয়ের কি খুব তাড়াতাড়ি আছে?
হ্যাঁ, খুব তাড়াতাড়ি। আমাকে খুব জোর এক ঘণ্টা পরেই বার হতে হবে।
মঁসিয়ে, তা অসম্ভব।
তুমি যা টাকা চাও তাই দেব।
তা হলেও পারব না।
দু’ঘণ্টা সময় যদি দেওয়া হয়?
তবুও হবে না। আমাকে দুটো নাভিদণ্ড আর একটা মুহুড়ি তৈরি করতে হবে। আপনি আগামীকালের আগে যেতে পারবেন না।
আমার কাজ আজকেই সারতে হবে। কাল পর্যন্ত অপেক্ষা করলে চলবে না। মেরামত তাড়াতাড়ি না হলে অন্য একটা চাকা লাগিয়ে দিতে পার?
তার মানে?
তুমি চাকা মেরামত করো। তুমি একটা চাকা আমাকে বিক্রি করতে পারো। তা হলে আমি এখনি যেতে পারি।
একটা চাকা? অন্য চাকা তো এতে লাগবে না। চাকা সব সময় জোড়া জোড়া বিক্রি হয়।
তা হলে একটা জোড়াই বিক্রি কর।
কিন্তু সে চাকা তো এ গাড়িতে লাগবে না।
তা হলে একটা গাড়ি ভাড়া করে দিতে পার?
বিক্রি করার মতো গাড়ি আমার নেই।
হালকা ধরনের কোনও গাড়ি নেই?
আমাদের গাঁ-টা ছোট। তবে আমার দোকানে একটা গাড়ি পড়ে আছে। এক ভদ্রলোক গাড়িটা মাঝে একবার করে ব্যবহার করেন। আমি গাড়িটা দিতে পারি, তবে মালিককে জানালে চলবে না। কিন্তু গাড়িটাকে দুটো ঘোড়ায় টানতে হবে।
আবার ডাকগাড়ির ঘোড়া ভাড়া করতে হবে।
আপনি কোথায় যাবেন?
আমি অ্যারাসে যাব।
আপনি আজকেই যেতে চান?
হ্যাঁ, আজকেই যেতে হবে।
আপনার পরিচয়পত্র আছে?
হ্যাঁ।
কিন্তু তা হলেও আপনি আগে পৌঁছতে পারবেন না। পথে অনেক পাহারা। তাছাড়া এখন চাষিদের মাঠে চাষ দেওয়ার সময়। একটা জায়গায় দেরি হবে।
ম্যাদলেন বলল, তা হলে আমাকে গাড়ি ছেড়ে ঘোড়ায় চড়ে যেতে হবে। আমাকে একটা জিন কিনে দিতে পার?
হ্যাঁ। কিন্তু এটা চড়ার ঘোড়া?
ও, তা-ও তো বটে। তুমি মনে করিয়ে দিয়ে ভালো করেছ। এ তো পিঠে জিন লাগাতে দেবে না।
তা হলে?
তা হলে এ গাঁ থেকে একটা ঘোড়া ভাড়া করে দাও।
কিন্তু আপনি তো এখানে কোনও ভাড়া পাবেন না আর কিনতেও পাবেন না।
তা হলে আমি কী করব?
আমার পরামর্শ যদি নিতে চান তা হলে বলব আমাকে চাকাটা মেরামত করতে দিন এবং আগামীকাল আপনি যাবেন।
ম্যাদলেন বলল, অ্যারাস যাওয়ার ডাকগাড়ি কখন আসবে?
চাকা মেরামঁতকারী মিস্ত্রি বলল, আজ রাত্রিতে আসবে, তার আগে নয়।
কিন্তু চাকাটা মেরামত করতে সারাদিন লাগবে?
হ্যাঁ, দুটো লোক লাগালেও সারাদিন লাগবে। দশজন লাগালেও তার আগে হবে না।
এ গাঁয়ে কোনও গাড়ি পাওয়া যাবে না?
না।
আর কোনও চাকা মেরামতের লোক নেই?
হোটেলের সেই ছেলেটা আর বুরগেলার্দ একসঙ্গে দু জনে ঘাড় নাড়ল।
এটা নিশ্চয় ঈশ্বরের বিধান। ম্যাদলেন একটা পরম স্বস্তি অনুভব করল। দৈবক্রমে তার গাড়ির চাকাটা ভেঙে গেছে। যে দৈব বিধানকে সে অবহেলা করেছিল এটা হল সেই দৈব বিধানের নির্দেশ। অ্যারাসে যাওয়ার জন্য সে যথাশক্তি চেষ্টা করেছে। সমস্ত সম্ভাবনা সে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে দেখেছে। দারুণ শীত, পথক্লান্তি বা খরচ কোনও দিক দিয়েই সে দমে যায়নি। কোনও দিক দিয়ে নিজেকে নিজের গাফিলতির জন্য তিরস্কার করার কিছু নেই। যদি সে আর যেতে না পারে তা হলে তাতে তার কোনও দোষ, তার কিছু করার নেই। তার জন্য ঐশ্বরিক বিধানই দায়ী।
