সে ভাবল, এ সব গাড়ি কেন? এ সময় কে গাড়ি ডেকেছিল?
এমন সময় তার ঘরের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হল। তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত। কাঁপতে লাগল এবং প্রচণ্ড রাগের সঙ্গে চিৎকার করে উঠল, কে ডাকে?
আমি, মঁসিয়ে মেয়র।
সে বুঝতে পারল যে বুড়ি মেয়েটি তার বাড়িতে কাজ করে এ তার কণ্ঠস্বর। তখন সে বলল, ঠিক আছে, কী ব্যাপার?
একটু পরেই পাঁচটা বাজবে মঁসিয়ে।
ঠিক আছে।
গাড়ি এসে গেছে।
কী গাড়ি?
ঘোড়ার গাড়ি।
কেন?
মঁসিয়ে একটা ঘোড়ার গাড়ি ভাড়া করেননি?
সে বলল, না।
ড্রাইভার বলছে সে আপনার জন্যই গাড়িটা এনেছে।
কোন ড্রাইভার?
মাস্টার শফেয়ারের ড্রাইভার।
হঠাৎ সে ব্যাপারটা বুঝতে পারল। সবকিছু মনে পড়ে গেল তার। হ্যাঁ হ্যাঁ, মাস্টার শফেয়ার।
ঠিক এই সময় তার মুখের উপর এমন একটা ভাব ফুটে ওঠে যে বুড়ি মেয়েটি তা দেখলে হতবুদ্ধি হয়ে পড়ত।
এরপর ভলজাঁ চুপ করে রইল। বাতিটার দিকে তাকিয়ে কিছুটা মোম নিয়ে সে গোল করে পাকিয়ে আঙুলের মধ্যে ধরে রইল।
এবার বুড়ি মেয়েটি অসহিষ্ণু হয়ে বলল, মঁসিয়ে, ওকে কী বলব?
ওকে বল, আমি যাচ্ছি।
.
৫
সে কালে অ্যারাস আর মন্ত্রিউল-সুর-মের শহরের মধ্যে যেসব ডাকগাড়ি যাতায়াত করত সেসব গাড়ি দু চাকার এবং ছোট। তাতে মাত্র দুটো সিট থাকত–তার একটাতে ড্রাইভার আর একটাতে একজন যাত্রী বসত। একটা বড় কালো ডাকবাক্স গাড়ির পেছনে চাপানো থাকত।
সেদিন সাতটার সময় অ্যারাস থেকে একটা ডাকগাড়ি ছেড়ে প্যারিস মেলের ডাক নিয়ে মন্ত্রিউল শহরে যখন পৌঁছল তখন ভোর পাঁচটা বাজতে কিছু বাকি। গাড়িটা শহরে ঢোকার আগে সেদিন পাহাড় থেকে নামার সময় একটা ঢালের উপর একটা সাদা ঘোড়ায় টানা একটা দ্রুতগতি ঘোড়ার গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা লাগে ডাকগাড়িটার। ডাকপিয়ন উল্টোদিকে থেকে আসা গাড়িটার চালককে গাড়ি থামাতে বলে, কিন্তু একটা বড় কোট পরে যে লোকটা গাড়ি চালাচ্ছিল সে গাড়ি না থামিয়ে জোরে চালিয়ে নিয়ে যেতে লাগল।
ডাকপিয়ন বলল, লোকটা শয়তানের মতো গাড়ি চালাচ্ছে।
কিন্তু ডাকপিয়ন যদি জানত যে ওইভাবে গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সে কে এবং কেনই বা এত কষ্ট করে এই সময়ে গাড়ি চালিয়ে কোথায় যাচ্ছে তা হলে অনুকম্পা জাগত তার মনে। তা হলে সে কখনই এ কথা বলতই না। আসলে কোথায় যাচ্ছে লোকটা নিজেই তা জানে না। সে অ্যারাসের দিকেই যাচ্ছিল। মাঝে মাঝে একথা বুঝতে পারায় সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠছিল তার।
অন্ধকারের মধ্য দিয়ে গাড়িটা চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল সে। তার মনে হচ্ছিল নরকের অন্ধকার গর্ভে নেমে যাচ্ছে সে। এক অদৃশ্য শক্তি তাকে সামনের দিকে ঠেলে দিচ্ছিল আর একটা অদৃশ্য শক্তি তাকে টানছিল পেছন থেকে। তার মনের অবস্থাটা তখন এমনই ছিল যে সেকথা সকলেই বুঝতে পারলেও কেউ তা ভাষায় ঠিকমতো প্রকাশ করতে পারবে না। এমন কেউ কি আছে যে এই ধরনের এক কৃষ্ণকুটিল অনিশ্চয়তাকে জীবনে অন্তত একবার অনুভব করেছে? সে কোনও কিছুই সংকল্প করেনি, কোনও কিছুই সিদ্ধান্ত করেনি, সে কিছুই ঠিক করেনি। বেদনার যে জটিল আবর্তে তার বিবেক আবর্তিত হচ্ছিল সে আবর্ত থেকে কোনও সংকল্প বা সিদ্ধান্ত বেরিয়ে আসতে পারল না। এত চিন্তাভাবনার পরেও যেখান থেকে সে রওনা হয়েছিল সেখানেই ফিরে এসেছে সে।
কিন্তু অ্যারাসে কেন সে যাচ্ছে?
যে যুক্তি সে গাড়ি ও ঘোড়া ভাড়া করার সময় দেখিয়েছিল সেই যুক্তিরই পুনরাবৃত্তি করল সে।
পরিণামে যাই হোক, নিজের চোখে সব কিছু দেখে সিদ্ধান্ত নিলে তাতে কোনও ক্ষতি হবে না। কী ঘটেছে তা নিজে গিয়ে জানা হবে বিজ্ঞজনোচিত কাজ। নিজে ভালো করে না দেখে বা ভালো করে খুঁটিয়ে সব বিচার না করে কোনও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা ঠিক হবে না। দূর থেকে উইঢিবিকেও পর্বত বলে মনে হয়। শ্যাম্পম্যাথিউকে ভালো করে দেখে যদি বোঝে সে নিঃসন্দেহে এক অপদার্থ ব্যক্তি তা হলে তার বিবেকই তাকে বলে দেবে সে তার জায়গায় জেলখানায় যাক। অবশ্য জেভাৰ্ত থাকবে, গ্রিভেত, শিনেলদো, কোশেপেন নামে যেসব পুরনো কয়েদি তাকে চিনত তারাও থাকবে সেখানে, কিন্তু তারা কেউ বর্তমানে ম্যাদলেন নামধারী ভলর্জকে চিনতে পারবে না কিছুতেই। কোনওক্রমে তাদের পক্ষে তাকে চেনা সম্ভব নয়। এমনকি জেভার্তও ভুল করেছে। সমস্ত সন্দেহ এবং অনুমান কেন্দ্রীভূত হয়েছে শ্যাম্পম্যাথিউর ওপর।
সুতরাং তার কোনও বিপদ নেই। তবু এটা তার জীবনে সবচেয়ে অন্ধকারময় মুহূর্ত। কিন্তু এ জীবন তাকে যাপন করতেই হবে। তার ভাগ্য যত খারাপই হোক তার হাতের মুঠোর মধ্যে আছে। এখন সে নিজেই তার ভাগ্য গড়ে তুলবে। সে এই চিন্তাটাকেই আঁকড়ে ধরে রইল।
অ্যারাসে যাওয়ার কোনও আন্তরিক ইচ্ছা তার ছিল না।
যাই হোক, সে যেখানে যাচ্ছে ঘণ্টায় সাত-আট ঘণ্টা বেগে ঘোড়াটাকে চাবুক মেরে চালাচ্ছে তার দিকে।
সকাল হতেই গাড়িটা একটা ফাঁকা প্রান্তরে গিয়ে পড়ল। সে দেখল মন্ত্রিউল শহর অনেক পেছনে পড়ে গেছে। সে দেখল সামনে দূর দিগন্তে ভোরের আলো ফুটে উঠেছে। শীতের সকালে ঠাণ্ডা কনকনে হাওয়া বইছিল। সন্ধ্যাবেলার মতো সকালবেলাতেও অনেক বস্তুকে প্রেতের মতো দেখায়। গাছপালা ও পাহাড়ের মাথাগুলো ছায়া-ছায়া অন্ধকারে। ভূতের মতো দেখাচ্ছিল। তবে সে সব কালো মূর্তি দেখে চিনতে পারছিল বস্তুগুলোকে।
