.
৪
ঘড়িতে রাত্রি তিনটে বাজল। পাঁচ ঘণ্টা ধরে ক্রমাগত পায়চারি করছে সে ঘরে। একটুও থামেনি। অবশেষে সে চেয়ারটায় বসে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়ল সে। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখতে লাগল।
অন্য সব স্বপ্নের মতো এ স্বপ্নও তার বর্তমান মর্মান্তিক অবস্থাকে নিয়েই গড়ে ওঠে। তবু স্বপ্নটা তার মনের ওপর এমনভাবে রেখাপাত করে যে পরে সে কথা লিখে রাখে সে। তার মৃত্যুর পর যেসব দরকারি কাগজপত্র পাওয়া যায় তার মধ্যে এই স্বপ্নের বিবরণটা পাওয়া যায়। এ স্বপ্ন হল একটি রুগণ আত্মা হতে উদ্ভুত এক কল্পনা।
একটা খামের ভেতর স্বপ্নের বিবরণটা ভরা ছিল। তার উপর লেখা ছিল, সে রাতে আমি যা স্বপ্নে দেখি।
আমি তখন এমন এক বিশাল বন্ধ্যা প্রান্তরে দাঁড়িয়ে ছিলাম যেখানে রাত-দিন বলে কিছু ছিল না। আমি তখন আমার ভাইয়ের সঙ্গে পথ হাঁটছিলাম যে ভাইয়ের কথা আমি আর ভাবি না এবং যার কথা আমি ভুলে গিয়েছি।
আমরা দু জনে কথা বলতে বলতে পথ হাঁটছিলাম। আমাদের পাশ দিয়ে কত লোক চলে যাচ্ছিল। আমরা এমন একটি মহিলার কথা বলছিলাম যে মহিলাটি আমাদের প্রতিবেশিনী ছিল। যখন সে আমাদের পাড়ায় থাকত তখন সে সর্বক্ষণ তার ঘরের জানালা খোলা রেখে কাজ করত। কথা বলতে বলতেই আমরা যেন সেই ভোলা জানালা দিয়ে আসা কনকনে ঠাণ্ডাটা অনুভব করছিলাম।
কোথাও কোনও গাছপালা ছিল না।
একটা লোক আমাদের খুব কাছ দিয়ে চলে গেল। সে ছিল সম্পূর্ণ নগ্ন, তার গায়ের রংটা ছিল ধূসর। সে একটা ঘোড়ার উপর চড়ে যাচ্ছিল আর তার ঘোড়ার রংটা ছিল মাটির মতো। তার মাথায় চুল ছিল না। তার ন্যাড়া মাথায় শিরাগুলো পর্যন্ত দেখা যাচ্ছিল। তার হাতে একটা জাদুকাঠি ছিল। জাদুকাঠিটা আঙুরগাছের ডালের মতো নরম হলেও লোহার মতো ভারী। সে আমাদের পাশ দিয়ে চলে গেল, কিন্তু কোনও কথা বলল না।
আমার ভাই বলল, ওই নিচু রাস্তাটা দিয়ে চল। কিন্তু সে পথে কোনও কাঁটাগাছ বা কোনও শ্যাওলা ছিল না। চারদিকে কোনও গাছপালা, ঘরবাড়ি কিছুই নেই, শুধু মাটি আর মাটি। আকাশটাও ছিল মাটি রঙের। আমি যেতে যেতে কী একটা কথা বললাম। কিন্তু কোনও উত্তর পেলাম না, দেখলাম, আমার ভাই চলে গেছে। এরপর আমি একটা গাঁয়ে চলে গেলাম। গাঁ-টা দেখে বুঝলাম গাঁটার নাম রোমানভিলে।
যে রাস্তা দিয়ে আমি গা-টাতে ঢুকলাম সেটা একেবারে জনশূন্য ছিল। আমি অন্য একটা পথ ধরে এগোতে লাগলাম। সে রাস্তাটার এক কোণে একজন লোক গাছে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়েছিল। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, এ জায়গাটার নাম কি, আমি এখন কোথায়? কিন্তু সে কোনও উত্তর দিল না। আমি তখন একটা বাড়ির দরজা খোলা পেয়ে তার মধ্যে ঢুকে পড়লাম।
সেই বাড়ির ভেতরে প্রথম যে ঘরটা পেলাম তার মধ্যে কোনও লোক ছিল না। আমি অন্য একটি ঘরে গেলাম। সে ঘরের পেছন দিকের দেয়ালের গা ঘেঁষে একটা লোক দাঁড়িয়েছিল। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, এটা কার বাড়ি? জায়গাটার নাম কী? কিন্তু কোনও উত্তর দিল না সে। সেই বাড়ির পেছনে একটা বাগান ছিল।
আমি সেই বাগানে চলে গেলাম। বাগানে কোনও লোক ছিল না। কিন্তু ভেতরে এগিয়ে যেতেই দেখলাম একটা গাছের পেছনে একটা লোক দাঁড়িয়েছিল। তাকে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, এ বাগানটা কিসের বাগান? আমি কোথায়? সে কোনও উত্তর দিল না।
আমি গাঁয়ের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যেতে লাগলাম। দেখলাম, সেটা একটা শহর। কিন্তু পথে কোনও লোক নেই। সমস্ত বাড়ির দরজা খোলা, কোনও লোক নেই। কোনও বাড়ি বা রাস্তায় একটা জ্যান্ত লোককেও দেখতে পেলাম না। কিন্তু প্রতিটি রাস্তার শেষ প্রান্তে, প্রতিটি ঘরের পেছনের দেয়ালে, বাগানের প্রতিটি গাছের পেছনে একটা করে লোক দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু তাদের মুখে কোনও কথা নেই। কিন্তু একসঙ্গে একটার বেশি লোক কোথাও দেখিনি আমি। আমি চলে যাচ্ছিলাম। তারা আমার পানে তাকিয়ে ছিল।
আমি শহর ছেড়ে মাঠে চলে গেলাম।
কিছুক্ষণ পরে আমি পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখলাম এক বিরাট জনতা আমার পিছু পিছু আসছে। শহরে যেসব লোককে আমি দেখেছিলাম সেই জনতার ভিড়ের মধ্যে তাদের দেখতে পেলাম। কোনও ব্যস্ততা না দেখিয়েও তারা আমার থেকে জোরে হাঁটছিল। তারা পথ হাঁটার সময় মুখে কোনও শব্দ করছিল না। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা আমাকে ঘিরে ফেলল। তাদের মুখগুলো মাটি রঙের।
শহরে ঢুকেই আমি প্রথমে যাকে প্রশ্ন করেছিলাম সেই লোকটা আমাকে বলল, কোথায় যাচ্ছ তুমি? তুমি কি জান না তুমি অনেক আগেই মরে গেছ?
আমি উত্তর দেওয়ার জন্য মুখ খুলতেই দেখি সেখানে কেউ নেই।
স্বপ্নটা ভেঙে যেতেই উঠে পড়ল সে। তার মুখ ঠাণ্ডা লাগছিল। তখনও ভোর হয়নি, তবু ভোরের মতোই উতল ঠাণ্ডা বাতাসের আঘাতে জানালার কপাটগুলো থেকে শব্দ হচ্ছিল। আগুনটা নিবে গেছে। বাতিটা জ্বলতে জ্বলতে প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। রাত্রি তখনও শেষ হয়নি।
ঘুম থেকে উঠেই জানালার ধারে গেল সে। দেখল আকাশে তখন কোনও তারা ছিল না। খোলা জানালা দিয়ে সে বাড়ির উঠোন আর রাস্তা দেখতে পাচ্ছিল। পথ থেকে একটা শব্দ কানে আসছিল তার। শব্দটা শুনে নিচে তাকাল সে। দেখল দুটো লাল তারা যেন বড় রাস্তাটার ওধার থেকে এগিয়ে আসছে তার বাড়ির দিকে। যতই এগিয়ে আসছে ততই সেগুলো বড় হয়ে উঠছে আকারে। পরে সে বুঝতে পারল ওটা এক ছোট্ট ঘোড়ার গাড়ি। ছোট ধরনের একটা সাদা ঘোড়া টেনে আনছে গাড়িটাকে। পথের উপর ওই ঘোড়র ক্ষুরের শব্দ শুনেই চমকে উঠেছিল সে।
