বাতিদান দুটো আগুনের কাছ থেকে তুলে নিয়ে যেখানে ছিল সেখানেই রেখে দিল। তার ক্রমাগত বিষণ্ণ পায়চারির শব্দে নিচের তলায় একটি ঘুমন্ত লোকের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটছিল।
এই ক্রমাগত পায়চারি আর ঘোরাফেরার কাজটা একই সঙ্গে তাকে কিছুটা সান্ত্বনা দিচ্ছিল আর উত্তেজিত করে তুলছিল। অনেক সংকটজনক মুহূর্তে আমরা ইতস্তত ঘোরাফেরা করে কিছুটা স্বস্তি পাই। আমাদের চোখে দেখা বিভিন্ন বস্তু থেকে আমরা পরামর্শ বা সান্ত্বনা পেতে চাই। কিন্তু ভলজাঁ এখন যতই ইতস্তত ঘোরাফেরা করতে লাগল ঘরের ভেতর ততই তার বর্তমানের জটিল অবস্থার প্রতি সচেতনতাটা বেড়ে যেতে লাগল। শ্যাম্পম্যাথিউ নামে লোকটাকে জাঁ ভলজাঁ মনে করে হয়তো ভুল করা হয়েছে এবং যে ঘটনাটা ঈশ্বরের বিধানে তার আত্মিক মুক্তির জন্য দৈবাৎ ঘটে গেছে, সে ঘটনা তার পায়ের তলা থেকে সব মাটি কেড়ে নিচ্ছে। সে পর পর দুটো সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে, কিন্তু এখন সে সিদ্ধান্তকেই অসম্ভব ভেবে বাতিল করে দিল।
এই চরম হতাশার মুহূর্তে নিজেকে ধরা দেওয়ার সব সম্ভাব্য পরিণামগুলোকে খুঁটিয়ে ভেবে দেখতে লাগল। ভেবে দেখতে লাগল তাতে সে কী হারাবে আর কী পাবে। যদি সে ধরা দেয় তা হলে তার এই বর্তমানের সুখী নির্দোষ জীবন, স্বাধীনতা, মানসম্মান, জনপ্রিয়তা সব কিছুকে বিদায় জানাতে হবে চিরদিনের জন্য। সে তাহলে আর মাঠে-ঘাটে স্বাধীনভাবে বেড়াতে পারবে না, পাখির গান শুনতে পারবে না, দুস্থ ছেলেমেয়েদের পয়সা দিতে পারবে না, সাদর অভ্যর্থনা বা কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে কেউ তার পানে তাকাবে না। যে বাড়ি সে গড়ে তুলেছে, যে ছোট্ট ঘরটায় সে সুখে-স্বচ্ছন্দে বাস করে সে বাড়িঘর তাকে ছেড়ে চলে যেতে হবে। তার যে একমাত্র বৃদ্ধা ভৃত্য সকাল হতেই প্রতিদিন তাকে কফি করে এনে দেয়, আর সে তাকে কফি এনে দেবে না। এইসব আরাম, স্বাচ্ছন্দ্য, স্বাধীনতা সব কিছু ছেড়ে দিতে হবে। তার পরিবর্তে জেলখানার ভেতর শৃঙ্খলিত অবস্থায় লাল জামা পরে খেটে যেতে হবে, জেলখানার ছোট ঘরের মধ্যে কাঠের তক্তায় শুতে হবে এবং আর যেসব ভয়াবহ অবস্থার মধ্যে তাকে কাটাতে হবে তা তার সব জানা আছে। এই বয়সে এবং এত কিছু সুখশান্তির পর! যদি সে যুবক থাকত বয়সে তা হলেও-বা হত। কিন্তু এখন তার বয়স হয়েছে; এই বয়সে পায়ে লোহার বেড়ি পরে কত অপমান, কত গালাগালি সহ্য করতে হবে। প্রতিদিন জেলখানার প্রহরীকে সকাল-সন্ধ্যায় দু বার করে লোহার বেড়িপরা পাগুলো দেখাতে হবে। যেসব বাইরের লোক জেল পরিদর্শন করতে আসবে তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে হবে। জেল কর্তৃপক্ষ তার সম্বন্ধে পরিদর্শককে বলবে, এই সেই বিখ্যাত জাঁ ভলজাঁ যে একদিন মন্ত্রিউল-সুর-মের শহরের মেয়র ছিল।… ভাগ্য, ভাগ্য মানুষের বুদ্ধির মতোই কুটিল, মানুষের মতোই নির্মম নিষ্ঠুর।
যতই সে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ভাবতে লাগল ততই সে দেখল দুটো পথ খোলা আছে তার সামনে–হয় তাকে এই সুখের স্বর্গকে আঁকড়ে ধরে থেকে তাকে শয়তান হতে হবে অথবা নরকে ফিরে গিয়ে তাকে সাধু হতে হবে। কী সে করবে? কোনদিকে যাবে?
যেসব অন্তর্বেদনাকে কিছু আগে অতিকষ্টে মন থেকে বিতাড়িত করে দিয়েছিল সেগুলো আবার ফিরে এল তার মধ্যে, আবার তারা আচ্ছন্ন করে ফেলল তার মনটাকে, আবার তার চিন্তাগুলো জট পাকিয়ে জটিল হয়ে উঠল। হতাশাজনিত একটা উদাসীন ভাব পেয়ে বসল তাকে। হঠাৎ তার স্মৃতিতে ‘রোমানভিলে’ এই নামটা ভেসে উঠল আর সেই সঙ্গে বহু দিন আগে শোনা একটা গানের দুটো ছত্র মনে পড়ল। রোমানভিলে প্যারিসের নিকটবর্তী এক বনের নাম, যেখানে বসন্তকালে তরুণ প্রেমিক-প্রেমিকারা লিলাক ফুল তুলতে যায়। সে যেন দেহে-মনে ক্রমশই দুর্বল হয়ে পড়ছিল, চলৎশক্তি রহিত হয়ে পড়ছিল। শিশুর প্রথম হাঁটতে শেখার মতো টলছিল।
এই অবসাদ আর অনীহার সঙ্গে লড়াই করতে করতে সে তার চিন্তার মধ্যে শৃঙ্খলা আনার চেষ্টা করতে লাগল। যে উভয়সংকট তার মনের সব শক্তিকে ক্ষয় করে দিয়েছে তার সম্মুখীন হয়ে এক স্থির সংকল্পে উপনীত হওয়ার জন্য চেষ্টা করতে লাগল সে। সে ধরা দেবে, না চুপ করে থাকবে? কিন্তু স্পষ্ট করে কিছুই বুঝতে পারল না সে। যেসব অস্পষ্ট ধারণা ভেসে বেড়াচ্ছিল তার মনের মধ্যে, সেগুলো কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে উঠল সহসা, ধোয়ার মতো মিলিয়ে গেল মুহূর্তে। একটা জিনিস স্পষ্ট বুঝতে পারল সে, যেদিকেই সে যাবে, যে পথই ধরবে, তাকে একটা জিনিস হারাতেই হবে। সে বাঁ দিকে বা ডান দিকে যেদিকেই যাবে, তার জীবনের সুখ অথবা ধর্মকে হারাতে হবে। একে একে আবার সব অনিশ্চয়তাগুলো ফিরে এল তার মনে। এত চিন্তার পরেও যেখান থেকে সে শুরু করেছিল সেখান থেকে এক পা-ও এগোতে পারল না।
এইভাবে এক দুঃসহ বেদনার মধ্য দিয়ে মনে মনে সংগ্রাম করে যেতে লাগল সে, যেমন আর একজন মানুষ তার আগে আঠারোশো বছর ধরে সংগ্রাম করে গেছেন। সে এক রহস্যময় মানুষ যার মধ্যে মানবজগতের সমস্ত দুঃখ, সমস্ত সততা ও মহানুভবতা মূর্ত হয়ে উঠেছিল। নক্ষত্রখচিত আকাশের তলে তার চারদিকে যখন অলিভ গাছের পাতাগুলো কাঁপছিল এবং যখন বারবার ভয়ঙ্কর এক পেয়ালা করে অন্ধকার পান করতে দেওয়া হয় তাঁকে তখন তিনি অন্ধকারের সে পেয়ালা প্রত্যাখ্যান করেন।
