আবার সে পায়চারি করতে লাগল ঘরের ভেতরে। একবার থেমে ভাবল, সে যখন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে তখন তার সম্ভাব্য পরিণামের কথাকে ভয় করলে চলবে না। এই ঘরের মধ্যে এমন অনেক জিনিস এখনও আছে যা ভলজাঁ নামের সঙ্গে জড়িত এবং সেগুলো নষ্ট না করলে বা সরিয়ে না দিলে তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্যপ্রমাণ হিসেবে তা গণ্য হতে পারে। সে একটা চাবি বার করে দেয়ালের গায়ের একটা আলমারির তালা খুলে একটা পুরনো নীল রঙের জামা, একটা কম্বল, একজোড়া পায়জামা, একটা পিঠের উপর ঝোলানো ব্যাগ আর একটা লাঠি বার করল। ১৮১৫ সালের অক্টোবর মাসে দিগনের পথে-ঘাটে কেউ যদি জাঁ ভলজাঁকে ঘুরে বেড়াতে দেখে থাকে তা হলে সে এইসব জিনিস দেখে অবশ্যই চিনতে পারবে।
বিশপের দেওয়া দুটো রুপোর বাতিদানসহ এই জিনিসগুলো সে যত্ন করে রেখে দিয়েছে, কারণ যেদিন থেকে সে নতুন জীবন শুরু করে সেদিনকার অর্থাৎ জীবনের সেই সন্ধিক্ষণের এক স্মারকচিহ্ন হিসেবে কাজ করবে জিনিসগুলো। কিন্তু জেলখানার ব্যবহৃত পোশাক ও জিনিসগুলো সে লুকিয়ে রাখলেও বিশপের বাতিদান দুটো সে প্রকাশ্যে রেখে দিয়েছে।
সে একবার চকিতে দরজার দিকে তাকাল। খিল দেওয়া থাকলেও হঠাৎ দরজাটা খুলে যাবে বলে ভয় হচ্ছিল তার। তার পর সে তার অতীত জীবনের স্মৃতিচিহ্নস্বরূপ রেখে দেওয়া সব জিনিস আগুনের মধ্যে ফেলে দিল। তার সেই ব্যাগ লাঠি যত কিছু। আলমারিটা একেবারে খালি হলেও সেটায় আবার তালাবন্ধ করে দিল। একটা কাঠের জিনিস টেনে এনে আলমারির সামনে রেখে সেটাকে আড়াল করে রেখে দিল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সেসব পুরনো জিনিসের বান্ডিলটাতে আগুন ধরিয়ে দিল। আগুনের শিখাটা বেড়ে যাওয়ায় সমস্ত ঘরটা আলোকিত হয়ে উঠল। লাঠিটা পোড়ার সময় তার থেকে ফটফট করে আওয়াজ হচ্ছিল।
তার পিঠের ব্যাগটা যখন পুড়ছিল তখন তার ভেতরকার সব কিছু পুড়ে গেলেও একটা জিনিস পুড়ল না। সেটা চকচক করছিল। একটু কাছে গিয়ে খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যেত সেটা হল সেই পেতিত গার্ভের চল্লিশ স’র মুদ্রাটা। তার কিন্তু সেদিকে দৃষ্টি ছিল না। সে তখন সমানে পায়চারি করে যাচ্ছিল।
সেই আগুনের আভায় রুপোর যে বাতিদান দুটো চকচক করতে থাকে সেদিকে হঠাৎ দৃষ্টি পড়ল তার। সে ভাবল, জাঁ ভলজাঁর আর একটা স্মৃতিচিহ্ন আর এটা একটা অভ্রান্ত প্রমাণ। ওগুলোকেও সরিয়ে ফেলতে হবে।
এই ভেবে সেগুলোকে নামিয়ে আনল সে।
আগুনটা তখনও বেশ জোর ছিল। তাতে ও দুটো ফেলে দিলে সেগুলো গলে গিয়ে একতাল ধাতুতে পরিণত হবে। আগুনের ধারে বসে রইল সে কিছুক্ষণ। বেশ একটা আরাম বোধ হচ্ছিল। ভাবল তাপটা বেশ আরামদায়ক। একটা বাতিদান দিয়ে আগুনের কাঠগুলোকে ঘাটতে লাগল। আর এক মিনিট পরেই এ দুটোকে ফেলে দেবে আগুনে।
কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে তার ভেতরকার এক কণ্ঠস্বর ধ্বনিত হয়ে উঠল তার কানে, জাঁ ভলজাঁ, জাঁ ভলজাঁ!
তা শুনে ভয় পেয়ে গেল ভলজাঁ। তার মাথার চুল খাড়া হয়ে উঠল।
সেই কণ্ঠস্বর আবার বলে চলল, তাই হোক। যা আরম্ভ করেছ, তোমার সেই আরব্ধ কাজ শেষ করে ফেল। বাতিদান দুটো ধ্বংস করে ফেল। সব স্মৃতি মুছে ফেল, বিশপকে ভুলে যাও। সবকিছু ভুলে গিয়ে শুধু নিজের ভালোটার কথা ভাব। তোমার সিদ্ধান্ত পাকা হয়ে গেছে। একটা বুড়ো লোক, যে কী ঘটেছে না ঘটেছে তার কিছুই জানে না, যার ওপর তোমার নামটা চাপিয়ে দেওয়াই তার একমাত্র অপরাধ, তোমার জায়গায় সে জেলে যাবে, বাকি জীবনটা তার জেলেই দাসত্বের মধ্য দিয়ে কেটে যাবে। আর তুমি হবে এক বিশিষ্ট নাগরিক, সর্বজনশ্রদ্ধেয় সম্মানিত মঁসিয়ে লে মেয়র। তুমি এই নগরকে সমৃদ্ধশালী করে তুলবে, গরিব-দুঃখীদের মুখে অন্ন জোগাবে, অনাথ শিশুদের রক্ষা করবে, অসংখ্য মানুষের শ্রদ্ধার আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে এক সুখী জীবনযাপন করবে আর তখন অন্য একজন হতভাগ্য লোক তোমার নাম ধারণ করে হাতে হাতকড়া আর গায়ে নীল জামা পরে পতনের শেষ প্রান্তে চলে যাবে। ঘটনাগুলো কিভাবে তোমার ভাগ্যের অনুকূল হয়ে উঠেছে দেখ।
তার কপালে ভু যুগলের উপরে ঘাম দিতে শুরু করেছিল। সে আগুনের দিকে একবার তাকাল। কিন্তু তার অন্তর্নিহিত সেই অদৃশ্য বক্তার কণ্ঠস্বর তখনও একেবারে স্তব্ধ হয়ে যায়নি। তার কথা তখনও শেষ হয়নি।
সে কণ্ঠস্বর আবার বলতে লাগল, অনেকে তোমার প্রশংসা করবে, অনেকে তোমায় আশীর্বাদ করবে। কিন্তু একজন সেসব প্রশংসা বা আশীর্বাদের কথা কিছুই শুনবে না। সে শুধু তার চারপাশে ঘিরে থাকা অন্তহীন অন্ধকারের ভেতর থেকে সারাজীবন ধরে অভিশাপ দিয়ে যাবে তোমায়। এটা কিন্তু মনে রেখ, মানুষ যা কিছু আশীর্বাদ পায় জীবনে তা স্বর্গে ঈশ্বরের কাছে পৌঁছতে পারে না, শুধু অভিশাপগুলোই ঈশ্বরের কাছে পৌঁছায়।
কণ্ঠস্বরটা আত্মার গভীর থেকে আসছিল বলে প্রথমে ক্ষীণ ছিল, কিন্তু ক্রমশ সেটা জোরালো হয়ে তার কানে এমনভাবে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হতে লাগল যে তার মনে হল ঘরের ভেতর থেকে কথা বলছে। শেষের কথাটা এত জোর শোনাল যে সে ভয়ে চিৎকার করে উঠল, কেউ আছে এখানে?
তার পর নিজের প্রশ্নে নিজেই হাসতে হাসতে জবাব দিয়ে বলল, আমি একটা বোকা, এখানে কেউ নেই।
একজন অবশ্য ছিল, কিন্তু তাকে চোখে দেখা যায় না।
