এইসব চিন্তার বিষাদময় প্রভাব তার মনের শক্তিকে হ্রাস করতে পারল না কিছুমাত্র, শুধু তার মস্তিষ্ককে অবসন্ন করে তুলল। সে এলোমেলোভাবে অনেক অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ের কথা ভাবতে লাগল। অশান্তভাবে সে পায়চারি করতে লাগল ঘরের ভেতরে। তার শিরায় শিরায় রক্তস্রোত দ্রুত আর উত্তাল হয়ে উঠল। চার্চ আর টাউন হলের ঘণ্টাধ্বনি রাত্রির দ্বিপ্রহর ঘোষণা করল। ঘণ্টার ধ্বনিগুলো সে মনে মনে গুনে চলল। দিনকতক আগে একটা পুরনো ঘড়ির দোকানে দেখা একটা বড় ঘড়ির কথা তার মনে পড়ল। তার শীত করছিল। ঘরের মধ্যে আগুন জ্বালল সে, অথচ জানালাটা বন্ধ করল না।
ক্রমেই এক ঔদাসীন্যের ভাব আচ্ছন্ন করে ফেলল তাকে। রাত্রি দুপুর হবার আগে সে যেসব কথা ভেবেছিল সেসব কথা একবার স্মরণ করল। অবশেষে সে নিজেকে বলল, হ্যাঁ, আমি স্থির করে ফেলেছি আমি আত্মসমর্পণ করবই।
হঠাৎ ফাঁতিনের কথাটা মনে পড়ে গেল। আপন মনে বলে উঠল, হায় হতভাগ্য নারী!
এই আকস্মিক স্মৃতি বিদ্যুৎচমকের মতো এক ঝলক নতুন আলো ফেলল তার অবস্থার ওপর। সে নিজের মনকে বলল, কিন্তু আমি শুধু নিজের কথা ভাবছি। হয় আমাকে চুপচাপ থেকে যেতে হবে অথবা নিজেকে আইনের হাতে সঁপে দিতে হবে, হয় আমাকে আগের মতো আত্মগোপন করে থাকতে হবে অথবা আত্মাকে বাঁচাতে হবে, হয় আমাকে সম্মানিত অথচ ঘৃণ্য মেয়র হিসেবে থেকে যেতে হবে অথবা জেলখানায় ক্রীতদাস হয়ে বেঁচে থাকতে হবে। এইসব কিছুই আত্মাভিমানের ব্যাপার। কিন্তু আর পাঁচজনের কথা তো ভাবছি না, কোথায় আমার খ্রিস্টীয় কর্তব্যবোধ?
এবার সে শহর থেকে চলে গেলে কী অবস্থার উদ্ভব হবে সেই কথা ভাবতে লাগল। তাতে শুধু এই শহর নয়, এই সমগ্র অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যে শিল্প সে গড়ে তুলেছে, সে শিল্প তার অবর্তমানে নষ্ট হয়ে যাবে এবং তার ফলে সে শিল্পের সঙ্গে জড়িত ও কর্মরত অসংখ্য নরনারী, বৃদ্ধ অসহায় যারা তার থেকে জীবিকা নির্বাহ করে চলেছে তারা সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়বে। সে চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এখানকার সমস্ত কর্মচঞ্চলতার স্রোতে ভাটা পড়বে। তার অভাবে সমগ্র অঞ্চলের জীবন বিপর্যস্ত হয়ে ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে। তাছাড়া যে ফাঁতিনের দুঃখভোগের জন্য সে কতকাংশে দায়ী তার প্রতি কি তার কোনও কর্তব্য নেই? সে তাকে কথা দিয়েছে যে তার সন্তানকে এনে দেবে। যদি সে তা না পারে তা হলে সে অবশ্যই মারা যাবে, তা হলে তার সন্তানের কী যে অবস্থা হবে, তা একমাত্র ঈশ্বরই জানেন; সে নিজেকে ধরা দিলে এইসব অশুভ ঘটনা ঘটবে। আর যদি সে ধরা না দেয় তা হলে কী হবে?
একটি লোক চুরি করার অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করবে। তাকে বাঁচাতে যাওয়ার কোনও প্রয়োজন নেই। তার চেয়ে আমি এখানেই থাকব যেমন আছি। ফাঁতিনে তার সন্তানকে মানুষ করবে। দশ বছরের মধ্যে আমি এক কোটি টাকা সঞ্চয় করব এবং তাতে সমগ্র অঞ্চলটা সমৃদ্ধশালী হয়ে উঠবে। এ টাকার আমার কাছে কোনও দাম নেই। তাতে এ অঞ্চলের অধিবাসীরাই উপকৃত হবে তাতে সমৃদ্ধি আরও বাড়বে, নতুন নতুন কলকারখানা গড়ে উঠবে, আরও অনেক লোক কাজ পাবে। এখন শহরের আশপাশে যেসব জায়গায় অনুন্নত খামার আর পতিত জমি পড়ে আছে সেসব জায়গায় কত গ্রাম ও জনবসতি গড়ে উঠবে। তাতে মানুষের অভাব চলে যাবে এবং সেইসঙ্গে অনেক অপরাধ ও পাপকাজের উচ্ছেদ হবে। গড়ে উঠবে এক সুখী ও সমৃদ্ধশালী দেশ। কিন্তু শুধু তার ব্যক্তিগত আত্মতৃপ্তির জন্য, শুধু তার আত্মিক সুখের জন্য, অতি নাটকীয় এক বীরত্বপূর্ণ কাজ ও মহানুভবতার জন্য এইসব কিছুকে বিসর্জন দিতে হবে। আর তার ফলে একটি নারী হাসপাতালে অসহায়ভাবে মারা যাবে আর তার সন্তান পথে পথে ঘুরে বেড়াবে। এক বিরাট অঞ্চলের অধিবাসীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, শুধু একটি লোককে শাস্তির হাত থেকে বাঁচাবার জন্য যে শাস্তির পরিমাণ বেশি না-ও হতে পারে। আর আমার বিব্রত বিবেককে শান্ত করার জন্য। কিন্তু এটা এক উন্মাদের কাজ ছাড়া আর কিছুই না। কোনও বোঝাভারে আমার বিবেক যদি বিপন্ন হয় সেটা আমার একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার। কিন্তু তার জন্য অপরের প্রতি, সমাজের প্রতি তার যে কর্তব্য আছে তাতে জলাঞ্জলি দিতে পারে না।
উঠে সে আবার ঘরের ভেতর পায়চারি করে বেড়াতে লাগল। তার মনে হল এতক্ষণে তার বিবেক শান্ত হয়েছে। মাটির অন্ধকার গর্তেই হীরক পাওয়া যায়, তেমনি মনের অন্ধকারেই পাওয়া যায় শুভ্রোজ্জ্বল সত্য। মনের সেই অন্ধকার গহ্বরে নেমে গিয়ে সেখানে অনেকক্ষণ ধরে হাতড়ে বেড়িয়ে সত্যের যে উজ্জ্বল হীরকখণ্ড খুঁজে পেয়েছে, সে হীরক এখানে জ্বলজ্বল করছে তার উপর।
সে ভাবল, এইটাই ঠিক পথ। ঠিক পথ দেখাবার জন্য সব মানুষেরই একটা নীতি থাকা দরকার। আমার এখন মনস্থির হয়ে গেছে। অবস্থা যেমন আছে থাক, ঘটনার স্রোত যেভাবে যে পথে বয়ে যায় যাক, আমি আর কোনও কিছু ভাবব না, আমার মধ্যে আর কোনও দ্বিধা বা দৌর্বল্যচিত্ততা থাকবে না। আমি যেমন মঁসিয়ে ম্যাদলেন আছি তেমনিই তা থেকে যাব। যে লোকটা ভলজাঁ নামে চলে যাচ্ছে, তাতে তার যা হয় হবে। আমি আর ভলজাঁ নই। আমি তাকে চিনি না, তার সঙ্গে আমার কোনও সম্পর্ক নেই। তার ওপর যদি অন্য লোকের নাম চাপিয়ে দেওয়া হয় তা হলে সেটা বুঝতে হবে দৈবক্রমে সেটা ঘটে গেছে এবং দৈবই তার জন্য দায়ী। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে একবার নিজের চেহারাটার পানে তাকাল। বলল, ওহ, স্থির সিদ্ধান্তে আসতে পারার কী একটা আরাম! আমার মনে হচ্ছে আমি যেন এক নতুন মানুষ।
