অবশেষে সে বলল, ঠিক আছে, এ বিষয়ে এক স্থির সিদ্ধান্তে আসা যাক তা হলে। আমাকে আমার কর্তব্য করতে দাও, লোকটিকে উদ্ধার করতে দাও।
এবার তার হিসেবের খাতাপত্রগুলো দেখল সে। অর্থকষ্টে পড়া সেসব ব্যবসায়ীর কিছু বন্ধকি কাগজ ছিল তার কাছে সে সব কাগজগুলো আগুনে পুড়িয়ে দিল। ব্যাংকমালিক মঁসিয়ে লাফিত্তেকে একটা চিঠি লিখল সে। টেবিলের ড্রয়ার খুলে একটা কাগজে জড়ানো ব্যাংক থেকে তোলা একতাড়া নোট আর ভোটের সময় ব্যবহৃত তার পরিচয়পত্রটা তুলে নিল।
এই অবস্থায় কেউ যদি তাকে দেখত তা হলে সে কিন্তু তার মনের মধ্যে চিন্তার সকল বোঝাভারগুলোর কথা কিছুই বুঝতে পারত না। শুধু দেখতে পেত তার ঠোঁট দুটো মাঝে মাঝে নড়ছে আর মাঝে মাঝে সে ঘরের মধ্যে কোনও একটা জিনিসের দিকে তার অনুচ্চারিত প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে বোকার মতো।
মঁসিয়ে লাফিত্তেকে চিঠিটা লেখা হয়ে গেলে চিঠিটা আর কাগজ জড়ানো নোটের তাড়াটাকে কোটে ঢোকাল। তার পর আবার পায়চারি করতে লাগল ঘরের মধ্যে।
তার চিন্তার ধারাটা কিন্তু পাল্টাল না। যেদিকেই সে তাকাতে লাগল সেইদিকেই দেখল কর্তব্যের দাবি তার পানে তীক্ষ্ণভাবে তাকিয়ে জ্বলন্ত আগুনের অক্ষরে কয়েকটা কথা তার সামনে লিখে দিল, উঠে দাঁড়াও এবং তোমার আসল নাম বল।
ক্রমেই এই কথাগুলো এক স্পষ্ট রূপ লাভ করে দুটো পৃথক নীতিতে বিভক্ত হয়ে তার জীবনকে অনুশাসিত করার চেষ্টা করতে লাগল। একটা নীতি তাকে তার নামটা গোপন রাখতে বলল, আর একটা নীতি আত্মাকে বিশুদ্ধ করে তুলতে বলল। জীবনে প্রথম এই দুটো নীতির মধ্যে একটা পার্থক্য দেখতে পেল। সে দেখল, এদের মধ্যে একটা নীতি ভালো এবং একটা নীতি খারাপ। একটা নীতি যখন আত্মত্যাগে অনুপ্রাণিত করছে, অন্য নীতি তখন স্বার্থপর হতে শেখাচ্ছে। একটা নীতি বেরিয়ে এসেছে আলোর সুউচ্চ স্তম্ভ থেকে, আর একটা নীতি বেরিয়ে এসেছে অন্ধকারের অতল গহ্বর থেকে।
ক্রমে সে দেখল এই দুটো নীতি এক চরম দ্বন্দ্বে প্রবৃত্ত হয়ে উঠল তার মনে আর সেই দ্বন্দ্বের ছবিটা যতই স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগল তার সামনে ততই সেই পরস্পরবিরুদ্ধ দুটো নীতি বিরাট আকার ধারণ করতে লাগল। তার মনে হল সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে তার মধ্যে অন্তহীন আলো আর ছায়ার মধ্যে এক দেবী ও দানবী মত্ত হয়ে উঠেছে এক প্রাণপণ সংগ্রামে। সে ভয় পেয়ে গেল। কিন্তু তবু তার মনে হল, যা কিছু শুভ যা কিছু ভালো তারই জয় হয়েছে।
সে আরও বুঝল বিশপই প্রথমে তার ভাগ্য আর আধ্যাত্মিক জীবনের প্রথম মোড় ঘুরিয়ে দেয় আর তার পর আর একজন দ্বিতীয়বার মোড় ঘুরিয়ে দেয়, সে হল শ্যাম্পম্যাথিউ। এটাই হল তার জীবনের সবচেয়ে বড় সংকট, তার সহিষ্ণুতার শেষ বিচার।
তার উত্তপ্ত মানসিক অবস্থাটা কিছুক্ষণের জন্য শান্ত শীতল হলেও আবার সেটা বেড়ে যেতে লাগল। অজস্র চিন্তার ঘাত-প্রতিঘাতে আন্দোলিত হতে লাগল তার মনটা। কিন্তু তার সেই মূল সংকল্পটা এক রয়ে গেল।
একসময় সে তার মনকে বোঝাল হয়তো সে ব্যাপারটাকে অহেতুক বড় বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। শ্যাম্পম্যাথিউ নামে লোকটা এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ নয়, আসলে লোকটা একটা চোর। তখন তার মতোই উত্তর করল, লোকটা যদি শুধু কতকগুলি আপেল চুরি করে থাকে তা হলে তার বড়জোর এক মাসের জেল হত, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হত না কখনও। তাছাড়া সে যে সত্যি সত্যিই আপেল চুরি করেছে সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ আছে। কারণ জাঁ ভলজাঁ’র নামটাই যথেষ্ট, অন্য কোনও প্রমাণের প্রয়োজন ছিল না।
সরকার পক্ষের উকিল হয়তো একসময় বলেছিল, লোকটা যখন বলে সকলেই তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ বিশ্বাস করে নিচ্ছে। এবং আবার সে ভাবল, হয়তো সে আত্মসমর্পণ করলে অর্থাৎ তার আসল পরিচয় ঘোষণা করলে এই সাত বছরের মধ্যে যেসব মহৎ কাজ করেছে, যে সম্মানজনক জীবনযাপন করেছে তার কথা বিবেচনা করে তাকে মুক্তি দেওয়া হবে। কিন্তু তাড়াতাড়ি তার মন থেকে এ ভাবনাটা দূর করে দিল। সে ভাবল, পেতিত গার্ভের পয়সা চুরির কথাটা পর্যালোচনা করে তাকে দাগি অপরাধী হিসেবে গণ্য করা হবে এবং তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দান করা হবে।
সমস্ত মোহ আর মিথ্যা আশা মন থেকে সরিয়ে দিয়ে জাগতিক সকল বিষয় থেকে মনটা বিচ্ছিন্ন করে অপার্থিব এক উৎস হতে এক মানসিক শক্তি আর সান্ত্বনা খুঁজে পাবার চেষ্টা করতে লাগল সে। সে নিজেকে বোঝাল সে যদি যথাকর্তব্য পালন করে তা হলে যে শান্তির আস্বাদ সে লাভ করবে, সে কর্তব্য এড়িয়ে গিয়ে সে যদি মঁসিয়ে ম্যাদলেন হিসেবে বর্তমান জীবনের মর্যাদা, সম্মান, সম্পদ এবং জনপ্রিয়তা ভোগ করে যায় তা হলে এক গোপন অপরাধচেতনাজনিত লজ্জার গ্লানি তাকে সে শান্তির আস্বাদ লাভ করতে কিছুতেই দেবে না। অন্যদিকে সে যদি এইসব কিছু ত্যাগ করে তা হলে সে সত্যিকারের মুক্তি লাভ করবে–কারাদণ্ডের কঠোরতা, কষ্টভোগ, অন্তহীন আমরণ শ্রম আর অপমান সত্ত্বেও মনে মনে এক নিবিড় স্বর্গসুখের আস্বাদ অনুভব করবে।
অবশেষে সে মনে মনে বলল, এই কর্তব্য অপরিহার্য এবং এটাই তার নিয়তি, নিয়তির এ বিধান, বিধিনির্দিষ্ট এ কর্তব্য সে পরিবর্তন করতে পারে না, সে তা এড়িয়ে যেতে পারে না। একদিকে বাইরের আপাত শূন্যময় জীবন আর অন্তরের দিক থেকে এক গোপন অপমানের গ্লানি; একদিকে বাইরের আপাতত অধঃপতনের লজ্জা আর অন্তরের শুচিতা–এই দুটোর একটাকে তাকে বেছে নিতেই হবে।
