এই ধরনের বিস্ময়কর বিক্ষোভ মানুষ সারাজীবনের মধ্যে মাত্র দু তিনবার অনুভব করে অন্তরে। এ বিক্ষোভ আত্মার বিরুদ্ধে আত্মার বিক্ষোভ। এই আত্মা যেন দ্বিধাবিভক্ত হয়ে একে অন্যের সঙ্গে মেতে ওঠে এক আমরণ দ্বন্দ্বে। অংশীভূত একটি আত্মার অপরের শোচনীয় পতন দেখে বিজয়গর্বে এক শ্লেষাত্মক বিদ্রুপে ফেটে পড়ে।
হঠাৎ বাতিটা আবার জ্বালল সে।
সে ভাবল, আমি কিসের ভয় করেছি? কেন আমি এখানে বসে এত সব ভাবছি? এখন তো আমি নিরাপদ। যে একটিমাত্র দরজার মধ্য দিয়ে তার অবাঞ্ছিত অতীত প্রবেশ করে তার বর্তমান জীবনে এক বিরাট বিপর্যয় ঘটাতে পারত, সে দরজা তো রুদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে, সে দরজার সামনে এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর গেঁথে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কেসে যে আসল সত্যটাকে অনুমান করেছিল, প্রায় ধরতে পেরেছিল?–সে হল জেভাৰ্ত। রক্তপিপাসু যে শিকারি কুকুরটা একদিন তার গন্ধ শুঁকে শুঁকে তার পিছু পিছু ঘুরে বেড়াচ্ছিল, সে কুকুরটা এখন সেই গন্ধসূত্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে একেবারে। সে। তার জাঁ ভলজাঁকে খুঁজে পেয়েছে। সুতরাং আর তাকে বিরক্ত করবে না। খুব সম্ভবত সে শহর ছেড়ে অন্য কোথাও পালাবে। আমার আর কিছু করার নেই, আমার এতে কোনও ভূমিকা নেই। সুতরাং অন্যায়টা আমার? আমার দোষটা কোথায়? কিন্তু এখন কেউ যদি আমায় দেখে তা হলে ভাববে বড় রকমের এক বিপর্যয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছি আমি। কিন্তু কেউ যদি বিপদে পড়ে তা হলে সেটা আমার দোষ না। ঈশ্বরের বিধানেই সে এই বিপদের মধ্যে পড়েছে। ঐশ্বরিক বিধানসৃষ্ট সে বিপদের মুখে আমি মাছির মতো উড়ে গিয়ে ধরা দিতে পারি না। আর আমি কী চাইতে পারি? এই ক’টি বছর ধরে ঈশ্বরের কাছে যে আশীর্বাদ আমি চেয়ে এসেছি, অসংখ্য রাতের স্বপ্নে বা জাগরণে ঈশ্বরের কাছে যে প্রার্থনা আমি করে এসেছি তা সার্থক হয়েছে এতদিনে অর্থাৎ আমি লাভ করেছি পরিপূর্ণ নিরাপত্তা। ঈশ্বরের যে ইচ্ছায় এটা ঘটেছে সে ইচ্ছার বিরোধিতা করা আমার কাজ নয়। কিন্তু ঈশ্বর এটা চেয়েছেন? চেয়েছেন যাতে এইভাবে সকলের কাছে এক আদর্শ সৃষ্টি করতে পারি, যাতে আমি দেখাতে পারি ধর্ম ও অনুতাপের পথ সুখশান্তি থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। আমি এখন বুঝতে পারছি না কেন আমি চার্চে গিয়ে কুবর কাছে স্বীকারোক্তি করে তার পরামর্শ চাইলাম না। চাইলে তো তিনি আমাকে এই কথাই বলতেন, যা কিছু হওয়ার তা হয়ে গেছে, যা ঘটে ঘটতে দাও, ঈশ্বরের ইচ্ছামতো যা কিছু ঘটার তা ঘটুক।
আপন বিবেকের গভীরে নেমে গিয়ে এইসব কথা ভাবতে লাগল সে। আপন ব্যক্তি-সত্তার শূন্যতার গভীরে আপনিই আটকে গেছে যে সে। সে চেয়ার থেকে উঠে আবার পায়চারি করতে লাগল। সে আপন মনে বলে উঠল, এ বিষয়ে আর কিছু চিন্তা করার নেই, আমি মনস্থির করে ফেলেছি।
তবু কিন্তু শান্তি পেল না মনে। কূলের দিকে নিয়ত ধাবমান তরঙ্গমালাকে আমরা যেমন প্রতিহত করতে পারি না কোনওক্রমে, তেমনি কোনও অবাধ্য চিন্তা যদি বারবার ফিরে আসে মনের মধ্যে তা হলে তারও প্রতিরোধ করতে পারি না! নাবিক এই তরঙ্গমালাকে জোয়ার বলে, বিপন্ন বিব্রত বিবেকের কাছে এ চিন্তা হল অনুতাপ বা অনুশোচনা। ঈশ্বর যেমন সমুদ্রে তরঙ্গমালাকে উত্তাল ও উদ্বেল করে তোলেন তেমনি চিন্তার তরঙ্গাঘাতে আত্মাকে করে তোলেন বিচলিত।
কিছুক্ষণ পরে নিজের মধ্যে আবার সেই সংলাপ শুরু করল। সে সংলাপের সে নিজেই একাধারে বক্তা এবং শ্রোতা। বক্তা হিসেবে সে এমন সব কথা বলতে লাগল যা সে বলতে চায়নি, আবার শ্রোতা হিসেবে এমন সব কথা শুনতে লাগল যা সে শুনতে চায়নি। সেই সংলাপের বক্তা এবং শ্রোতা এমন এক রহস্যময় শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করল যে তাদের শুধু বলল, চিন্তা করো, ভাব। যেমন দু হাজার বছর আগে সেই শক্তি আর এক দণ্ডিত মানুষকে বলেছিল, কুশটা তুলে নাও।
অথবা অনেক সময় নিজের সঙ্গে কথা বলি আমরা। সব চিন্তাশীল লোকেরাই তা করে থাকে। কোনও কথা যখন মানুষের মনে এক আশ্চর্য গতিশীলতায় চিন্তা থেকে বিবেক আর বিবেক থেকে চিন্তায় যাওয়া-আসা করে তখন তা এক চমৎকার রহস্যে পরিণত হয়। আমরা তখন নীরবতা ভঙ্গ না করে নিজের সঙ্গে কথা বলি, আর তখন আমাদের মুখ ছাড়া প্রতিটি অনুচ্চারিত চিন্তা-ভাবনাই মুখর হয়ে কথা বলতে থাকে। আত্মা অদৃশ্য এবং অদৃশ্য হলেও তার একটা বাস্তবতা আছে।
সে নিজেকে নিজে প্রশ্ন করল, কোথায় সে দাঁড়িয়ে আছে, কোন সিদ্ধান্তে সে উপনীত হয়েছে। সে নিজের কাছে নিজেই স্বীকার করল, সে সংকল্প করেছে ঘটনার গতি যেদিকে চলে তাকে চলতে দেবে, ঘটনার গতির ওপরে ঈশ্বরের বিধানের ওপর সে হস্তক্ষেপ করবে না কোনওভাবে। কিন্তু এ সংকল্পটাকে অন্যায় বলে মনে হল তার। ভাগ্য আর মানুষ যে ভুল করেছে সেই ভুল সে এক নীরব অপ্রতিবাদে মেনে নেবে, তাতে প্রতিরোধের কোনও চেষ্টা করবে না–এটা ঠিক নয়। এক্ষেত্রে কিছু না করাটাই সব কিছু করা, এক অপরাধমূলক ভণ্ডামি আর কাপুরুষতার গভীরে নেমে যাওয়া।
গত আট বছরের মধ্যে সে প্রথম এক অশুভ চিন্তা আর অশুভ কর্মের তিক্ত আস্বাদ বোধ করল।
বিতৃষ্ণায় নিজের মুখের উপর থুতু ফেলতে ইচ্ছা করল।
সে যখন মনে মনে বলল, আমার উদ্দেশ্য সাধিত হয়েছে তখন সে আবার নিজেকে প্রশ্ন করে যেতে লাগল। তার জীবনের নিশ্চয় একটা উদ্দেশ্য আছে। কিন্তু সে উদ্দেশ্যের অর্থ কি নিজেকে গোপন রাখা, পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে ঘুরে বেড়ানো? সে যা কিছু করে এসেছে এতদিন তার পেছনে অন্য কোনও বড় যুক্তি বা বড় উদ্দেশ্য নেই? নিজের জীবন নয়, আত্মাকে রক্ষা করার এক বৃহত্তর উদ্দেশ্য ছিল না? বিশপের কথামতো সৎ, সম্মানিত ও এক দৃঢ়চেতা লোক হওয়ার সংকল্প ছিল না কি তার? এইটাই কি তার হৃদয়ের গোপন গভীর অভিলাষ ছিল না? আজ যদি সে অতীতের দরজাটা চিরতরে বন্ধ করে দেয় তা হলে কি এক জঘন্যতম কাজের দরজা খোলা হবে না? সে কাজ চুরির থেকেও অনেক বেশি ঘৃণ্য কাজ। সে কাজ হল একটি লোককে তার জীবন, সুখশান্তি, পৃথিবীর আলো থেকে বঞ্চিত করা। জেলখানার কয়েদি হিসেবে একটি লোককে জীবন্ত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া মানে তাকে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করা। কিন্তু সে যদি তার ভুল সংশোধন করে লোকটিকে উদ্ধার করে, যদি নিজেকে জাঁ ভলজাঁ হিসেবে ঘোষণা করে তা হলে তাতে হবে তার প্রকৃত পুনরভ্যুত্থান, আসল পুনরুজ্জীবন, তা হলে যে নরকের দরজা থেকে পালিয়ে যেতে চাইছে সে দরজা চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে। সশরীরে সেই নরকে ফিরে যাওয়া মানেই বাস্তবে তার থেকে মুক্তি পাওয়া। আজ তাকে এটাই করতে হবে। এ কাজ না করলে এতদিন সে যা কিছু করেছে তা সব পণ্ড হয়ে যাবে। তার গোটা জীবনটাই মাটি হয়ে যাবে। অর্থহীন হয়ে উঠবে তার সব অনুশোচনা। আমি কোনও কিছুর পরোয়া করি না। তখন এ কথা বলা ছাড়া আর কোনও উপায় থাকবে না। বিশপের উপস্থিতিকে সে আজ জীবনে অনুভব করল, তার মনে হল বিশপ তার পানে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে। আজ সে বুঝল মেয়র মঁসিয়ে ম্যাদলেন তার সকল সৎকর্ম সত্ত্বেও বিশপের চোখে ঘৃণ্য দেখাচ্ছে। অথচ ঘৃণ্য জাঁ ভলজাঁ পবিত্র ও প্রশংসনীয় হয়ে উঠবে। অন্যান্য লোক যেখানে শুধু মুখোশটা দেখবে, বিশপ সেখানে দেখবে আসল মুখটা। অন্যান্যরা যেখানে জীবনটাকে দেখবে, বিশপ সেখানে আত্মাকে দেখবে। সুতরাং এখন অ্যারাসে গিয়ে নকল জাঁ ভলজাঁকে মুক্ত করে আসর জাঁ ভলজাঁকে ঘোষণা করা ছাড়া আর কোনও উপায় নেই। সেটা হবে সবচেয়ে মর্মন্তুদ, সবচেয়ে মর্মস্পর্শী জয়, এক চূড়ান্ত ও অপ্রত্যাবর্তনীয় পদক্ষেপ। কিন্তু তবু তাকে করতেই হবে সে কাজ। এটা তার জীবনের সবচেয়ে দুঃখজনক পরিণতি যে, মানুষের চোখে অধঃপতনের শেষ প্রান্তে নেমে গিয়েই ঈশ্বরের চোখে সে শুচিতার সর্বোচ্চ স্তরে উন্নীত হতে পারবে।
