কিন্তু কে?
যাকে সে এড়িয়ে যেতে চাইছে, ঘরে ঢুকতে দিতে চাইছে না, যার কণ্ঠ চিরতরে রোধ করে দিতে চাইছে, সে কিন্তু ঘরেই আছে। সে তার বিবেক।
তার বিবেক, তার মানেই ঈশ্বর। কিছুক্ষণের জন্য একটা নিরাপত্তা বোধ করল সে। ঘরের দরজা বন্ধ করে দেওয়ায় কেউ সে ঘরে ঢুকতে পারবে না, কেউ তার ইচ্ছার ওপর হাত দিতে পারবে না। ঘরের আলো নিভিয়ে দেওয়ায় কেউ তাকে দেখতে পাবে না। অন্ধকারে চেয়ারে বসে টেবিলের উপর কনুই রেখে তার উপর মাথা দিয়ে ভাবতে লাগল।
সে ভাবল, আমি কোথায় আছি? এটা কি একটা স্বপ্ন? আমি কি সত্যি সত্যিই জেভাৰ্তকে দেখেছি এবং সে আমাকে এইসব কথা বলেছে? শ্যাম্পম্যাথিউ নামে লোকটা কি সত্যিই আমার মতো দেখতে? এটা কি এক অকল্পনীয় ব্যাপার নয়? গতকাল সকালেও আমি কত নিরাপদ আর এক সংশয়াতীত সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত ছিলাম। আমি তখন কী করছিলাম? এইসব কিছুর মানে কী? এখন আমাকে কী করতে হবে?
এই সমস্ত প্রশ্নের দ্বারা আলোড়িত হচ্ছিল তার মনটা। যেসব চিন্তার দুর্বার তরঙ্গমালা একের পর এক করে তার মস্তিষ্কের ভেতরটাতে আঘাত হানছিল, সেসব চিন্তার গতিরোধ করতে না পেরে সে মাথাটাকে ধরল। সে এক তুমুল অন্তর্দ্বন্দ্ব, যা তার সমস্ত ইচ্ছাশক্তি আর যুক্তিবোধকে নিষ্পেষিত ও নিশ্চিহ্ন করে দেয়। সে দ্বন্দ্বের ভেতর থেকে উঠে আসে শুধু এক প্রবল অন্তর্বেদনা। কোনও কিছু ভালো করে বুঝতে না পারা বা কোনও স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হতে না পারার এক নিষ্ফল বেদনা।
তার মাথার ভেতরটা যেন জ্বলছিল। সে উঠে পড়ে জানালাটা খুলে দিল। আকাশে কোনও তারা ছিল না। সে আবার ফিরে এসে চেয়ারটাতে বসল।
রাত্রির প্রথম প্রহর কেটে গেল এইভাবে।
ক্রমে ক্রমে ঘোলাটে অস্পষ্ট চিন্তাগুলো স্বচ্ছ হয়ে উঠতে লাগল তার মনের মধ্যে। আসল অবস্থাটা সে পুরোপুরি না হলেও কিছু কিছু করে বুঝতে পারল। সে দেখল অবস্থাটা খুবই অস্বাভাবিক এবং সংকটজনক হলেও সে অবস্থাকে সে আয়ত্তে আনতে পেরেছে।
কিন্তু এতে অবস্থার জটিলতাটা গম্ভীর হয়ে উঠল আরও।
তার সব কাজের অন্তরালে এক অন্তর্নিহিত ধর্মীয় অভিলাষ থাকলেও সেদিন পর্যন্ত সে যা কিছু করেছে সেসব কাজের মধ্য দিয়ে সে শুধু তার আসল পরিচয়টাকে কবর দেবার জন্য একটা গর্ত খুঁড়ে এসেছে। স্মৃতিচারণার কোনও নীরব নির্জন মুহূর্তে অথবা জাগ্রত রাত্রিযাপনের দীর্ঘ অবকাশে যে ভয় সবচেয়ে বেশি করে এসেছে তা হল ওই নাম কারও মুখে উচ্চারিত হওয়ার ভয়। নিজেকে সে বারবার বলে এসেছে ওই নামটার পুনর্জন্ম মানেই তার সব কিছু শেষ হয়ে যাওয়া, যে নতুন জীবন সে কত চেষ্টায় কত কষ্টে গড়ে তুলেছে, সে জীবনের নিঃশেষিত বিলোপ। যে আত্মার সে জন্ম দিয়েছে সে আত্মার মৃত্যু। শুধু এই নামের পুনরুজ্জীবনের চিন্তা আর সম্ভাবনাটাই তার সর্বাঙ্গ শিহরিত করে তুলেছে। কেউ কি তাকে বলেছে যে এমন একদিন আসবে যেদিন তার নাম অর্থাৎ জাঁ ভলজাঁ’র ভয়ঙ্কর নামটা অকস্মাৎ তার কানে ধ্বনি-প্রতিধ্বনিত হবে বজ্রধ্বনির মতো। যে রহস্যের ছদ্মাবরণ দিয়ে সে নিজেকে ঢেকে রেখেছে এতদিন, সহসা অন্ধকারের গর্ত থেকে এক তীব্র আলোর ছটা এসে সে রহস্যের আবরণটাকে ছিন্নভিন্ন করে দেবে? একথা তাকে কেউ কি বলেছে যে সে আলোর ভয়ঙ্কর ছটা সে না চাইলে তার কোনও ক্ষতিই করতে পারবে না, বরং সে আলো তার ছদ্মাবরণটাকে আরও গভীর, আরও দুচ্ছেদ্য করে তুলবে এবং সেই জাঁ ভলজাঁ’র সঙ্গে মঁসিয়ে ম্যালেনের দ্বন্দ্ব বাধলে সে দ্বন্দ্ব থেকে মঁসিয়ে ম্যাদলেন বিজয়ী বীরের মতো বেরিয়ে এসে আরও বেশি সম্মানে ভূষিত হবে, তার মর্যাদার আসনে আরও বেশি করে প্রতিষ্ঠিত হবে সে। একথা কেউ কি তাকে বলেছে যে সে নাম কারও মুখে উচ্চারিত শুনে সে শুধু বিস্ময়ে বিহ্বল হয়ে তাকিয়ে থাকবে তার মুখপানে, তার কথাটাকে উন্মাদের প্রলাপ বলে উড়িয়ে দেবে? তবুও এটাই ঘটেছে, একদিন যা ছিল অসম্ভব সেইসব অসম্ভবই পুঞ্জীভূত হয়েছে দিনে দিনে, ঈশ্বরের বিধানে যা ছিল কল্পনা তা বাস্তবে পরিণত হয়েছে।
তার মনটা যতই পরিষ্কার হয়ে উঠল ততই সে তার অবস্থা সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠল। যেন সে ঘুম থেকে হঠাৎ জেগে উঠে দেখে একই সঙ্গে এক আশ্চর্য দৃঢ়তা আর কম্পিত বিহ্বলতার সঙ্গে অন্ধকারের অতল গহ্বরের মাঝে নেমে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। সেই গহ্বরের খাড়াই পাড়টাকে ধরে সেই পতনের প্রতিরোধ করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছে সে। সেই প্রতিরোধকালে ভাগ্যপ্রেরিত এক অপরিচিত ব্যক্তির মূর্তিকে সে দেখেছে যে ব্যক্তি জোর করে সেই গহ্বরটাতে নামাবার জন্য তাকে নির্মমভাবে টেনেছে। কিন্তু সে অথবা সেই অপরিচিত ব্যক্তি–দু জনের একজনকে সে গহ্বরে নামতেই হবে। তা না হলে সে গহ্বরের আগ্রাসী মুখটা বন্ধ হবে না কখনও।
দুর্বার ঘটনাপ্রবাহকে তার নিজস্ব গতিপথে বয়ে যেতে দেওয়া ছাড়া আর কোনও গত্যন্তর নেই তার।
ঘটনাটা হল এই : পেতিত গার্ভে নামে একটা ছেলের পয়সা চুরি করার জন্য যে কারাগারে সে একদিন ছিল সেই কারাগারে তার শূন্য স্থানটা আবার তাকে ফিরে পেতে চাইছে। সে সেখানে ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত সেই শূন্য স্থানটা তার প্রতীক্ষায় থাকবে, তাকে ফিরে পাওয়ার দাবিতে অটল অনমনীয় হয়ে থাকবে এবং এটাই হল ভাগ্যের অখণ্ডনীয় নির্মম বিধান। এখন তার মনে হল তার এক বিকল্পকে সে খুঁজে পেয়েছে, সে বিকল্প হল হতভাগ্য শ্যাম্পম্যাথিউ। সে যদি চায় তা হলে সে একই সঙ্গে নিজেকে দ্বিধাবিভক্ত করে দু জায়গায় অবস্থান করতে পারে কারাগারে শ্যাম্পম্যাথিউরূপে অবস্থান করতে পারে, আবার সেই সঙ্গে ম্যাদলেন নাম সভ্যসমাজের এক সম্মানিত সদস্যরূপে তার হাতে গড়া এই স্বরাজ্যে স্বরাট হয়ে প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারে। তা হলে অবশ্য তার কলঙ্কের বোঝাটাকে শ্যাম্পম্যাথিউর মাথায় চাপিয়ে দিতে হবে, সমাধিস্তম্ভের মতো যে কলঙ্কের পুঞ্জীভূত বোঝাটা একবার কারও ওপর চাপিয়ে দিলে আর নামানো যাবে না।
