এই দুটো উদ্দেশ্য একে অন্যের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে গিয়ে এমন এক শক্তিশালী নীতিতে পরিণত হয়, যা তার জীবনের সব কর্ম ও চিন্তাকে নিয়ন্ত্রিত করতে থাকে। তার দৈনন্দিন জীবনের সমস্ত আচরণ এই নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চলতে থাকে। তার দুটি উদ্দেশ্য তাকে একটি পথে চালিত করে, তাকে মানুষের কাছ থেকে ক্রমশই দূরে নিয়ে যায় আর পরোপকারী ও সরল প্রকৃতির করে তোলে। তবে এই দুটি উদ্দেশ্যের মধ্যে যখন সংঘর্ষ বাধে তখন সে তার প্রথম উদ্দেশ্যকে দ্বিতীয় উদ্দেশ্যের কাছে বলি দেয়। তার নৈতিক জীবনের শুচিতা এবং পবিত্রতা রক্ষার জন্যই কি দ্বিতীয় উদ্দেশ্যের কাছে বলি দেয়? তার নৈতিক জীবনের শুচিতা এবং পবিত্রতা রক্ষার জন্য বেশি সচেষ্ট হয়ে ওঠে সে। তার যথেষ্ট পরিণামদর্শিতা থাকলেও বিশপের রুপোর বাতিদান দুটি রেখে দেয় সে, বিশপের মৃত্যুসংবাদ শুনে সে শোকসূচক পোশাক পরে শোক পালন করে। শহরের কোনও ভবঘুরে ছেলে এলেই সে খোঁজখবর নিত, অর্থাৎ পেতিত গার্ভেকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করত। ফেবারোলেও লোক পাঠিয়ে সে খোঁজ নেয়, জেভার্তের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সত্ত্বেও সে ফকেলেভেন্তকে গাড়ির তলা থেকে উদ্ধার করে। মোট কথা সাধু-সন্ন্যাসীদের মতো সে কেবল মনে করত তার নিজের প্রতি কোনও কর্তব্য নেই।
কিন্তু এখনকার মতো এমন সমস্যামূলক পরিস্থিতি আর কখনও উদ্ভব হয়নি আগে। যে দুটি উদ্দেশ্য মিলে মিশে এই হতভাগ্য মানুষের জীবনটাকে নিয়ন্ত্রিত করে চলত, তারা এমন দ্বন্দে মেতে ওঠেনি কখনও। সেদিন তার অফিসে জেতার্ত ঢুকেই যে কথাগুলো বলে সে কথা শুনেই এই দ্বন্দ্বের কথা বুঝতে পারে সে। প্রথমে অস্পষ্টভাবে, তার পর গভীরভাবে। যে নামটাকে মনের মধ্যে গোপনীয়তার অনেকগুলো স্তরের তলায় লুকিয়ে রেখেছিল, অকস্মাৎ অপ্রত্যাশিতভাবে জেভার্তের কণ্ঠে তা উচ্চারিত হতে দেখে। অভিভূত হয়ে পড়ে সে। নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে বিহ্বল ও বিমূঢ় হয়ে পড়ে সে। ঝড়ের আঘাতে অবনতমুখী ওকগাছের মতো নুয়ে পড়ে, শত্রুর আক্রমণে পরাভূত সৈনিকের মতো ভেঙে পড়ে সে। বুঝতে পারে, তার অন্তরের মধ্যে যে কম্পন, যে আলোড়ন শুরু হয়েছে তা এক প্রবল ঝড়েরই পূর্বাভাসমাত্র। সে বুঝতে পারে বজ্রগর্ভ মেঘমালার সঞ্চার হচ্ছে তার মাথার উপরে। জেভার্তের কথা শুনে যে চিন্তা মাথা তুলে ওঠে তার মনের মাঝে তা হল শ্যাম্পম্যাথিউ নামে লোকটাকে কারামুক্ত করে তার জায়গায় নিজেকে কারারুদ্ধ করা। এ চিন্তা ধারালো ছুরির ফলার মতোই মর্মভেদী ও বেদনাদায়ক। তবু সে নিজেকে বারবার বলতে লাগল, ধৈর্য ধরো, শক্ত হও। কিন্তু প্রথমে তার এই উদার আবেগকে অবদমিত করে রাখে।
জাঁ ভলজাঁ যদি বিশপের উপদেশ মেনে চলত শেষ পর্যন্ত, যেভাবে অনুশোচনা আর আত্মনিগ্রহের পথ ধরে তার আত্মার পুনর্বাসনের কাজে এগিয়ে চলেছিল সে, সেই ভাবটা যদি বজায় রেখে চলতে পারত শেষ পর্যন্ত, কোনও ভয়ঙ্কর উভয়সংকটের মধ্যে তার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত না হয়ে অন্তরের যে বিরাট শূন্যতার মাঝে আত্মার পরম মুক্তি নিহিত আছে সেই শূন্যতার পথেই অদম্য গতিতে এগিয়ে চলত তা হলে তার পক্ষে খুবই ভালো হত। ভালো হত, কিন্তু তা হয়নি। তার আত্মার মধ্যে কী ঘটছিল তার একটা বিবরণ দেব আমরা। প্রথমে তার আত্মরক্ষার প্রবৃত্তি জয়ী হয় তার মধ্যে। সে তার এলোমেলো চিন্তাগুলোকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে, তার আবেগগুলোকে সংযত করে, জেভাৰ্তের বিপজ্জনক নৈকট্য সম্বন্ধে সতর্ক হয়ে ওঠে। এক আশঙ্কার বশবর্তী হয়ে দৃঢ়তার সঙ্গে তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটাকে স্থগিত রাখে। কী করতে হবে সে বিষয়ে তার চিন্তাকে কেন্দ্রীভূত করে, ঢাল ফিরে পাওয়া যোদ্ধার মতো সে তার প্রশান্তিটাকে আবার ফিরে পায়।
বাকি দিনটা ভলজাঁ’র এক অদ্ভুত অবস্থার মধ্য দিয়ে কাটে। তার আপাত প্রশান্তির অন্তরালে এক তুমুল আলোড়ন চলতে থাকে তার অন্তরে। সে যেন এক নিরাপত্তামূলক সতর্কতা অবলম্বন করেছিল। তার মনের মধ্যে সব কিছু ওলটপালট হয়ে গিয়েছিল, সে কোনও কিছুই স্পষ্ট করে দেখতে বা ভাবতে পারছিল না। তবে একটা জিনিস বুঝতে পেরেছিল, সে এমন একটা জোর আঘাত পেয়েছে যা তাকে অভিভূত করে দেয় এবং যা তার অন্তরের এত সব আলোড়ন-আন্দোলনের মূল কারণ।
সে যথারীতি ফাঁতিনেকে দেখতে গেল এবং অনেক বেশি সময় সেখানে কাটাল। তার অনুপস্থিতিকালে যাতে ফাঁতিনের কোনও অসুবিধা না হয়, তার দেখাশোনা যাতে ঠিকমতো হয় তার জন্য নার্সকে বলে দিল। সে অস্পষ্টভাবে ভাবল তার একবার অ্যারাস যাওয়া উচিত। কিন্তু কী করবে না-করবে সে বিষয়ে কোনও সিদ্ধান্তে উপনীত হল না। সেখানে কেউ তাকে সন্দেহ করবে না। ব্যাপারটা কী তা শুধু দেখে আসবে সে। সেইজন্যই ঘোড়া আর গাড়ির ব্যবস্থা করল।
সে ভালোভাবেই সে রাতে খেল। খাওয়ার পর শোবার ঘরে এসে আবার ভাবতে শুরু করল।
ব্যাপারটা সে নতুন করে ভেবে দেখল এবং ব্যাপারটা অবিশ্বাস্য মনে হল তার। সে একসময় চেয়ার থেকে উঠে দরজার খিল দিয়ে এল। তার ভয় হতে লাগল বাইরে থেকে কেউ এসে পড়তে পারে।
বাড়ির আলোটায় বিরক্তবোধ করছিল সে। তাই সে নিবিয়ে দিল বাতিটা। কারণ কেউ দেখে ফেলতে পারে।
