কিন্তু কয়েক মিনিট পরেই ফিরে এল সে। তার মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছিল মনটা তার তখনও এক দুর্বোধ্য চিন্তায় মগ্ন ছিল।
ম্যাদলেন বলল, মঁসিয়ে শফেয়ার, গাড়ি আর ঘোড়ার জন্য মোট কত দাম চান?
ফ্লেমিং বলল, আপনি কি সত্যিই এ দুটো কিনতে চাইছেন?
ম্যাদলেন বলল, না, তবে এগুলোর যদি কোনও ক্ষয়ক্ষতি হয় তার জন্য কিছু টাকা জমা রাখছি। আমি গাড়ি ও ঘোড়া ফিরিয়ে দিলে আপনি টাকাটা ফেরত দেবেন। কত টাকা জমা দেব?
পাঁচশো ফ্রাঁ।
এই নিন।
মঁসিয়ে ম্যাদলেন টেবিলের উপর একটা ব্যাংকনোট রেখে চলে গেল। এবার আর ফিরে এল না। ফ্লেমিং ভাবতে লাগল এক হাজার ফ্লা’র কথা বললে ভালো হত। কেন এক হাজারের কথা বলেনি তার জন্য অনুশোচনা করতে লাগল সে। আসলে কিন্তু ওই ঘোড়া আর গাড়ির দাম একশো ফ্রাঁ’র বেশি হবে না।
ফ্লেমিং তার স্ত্রীকে ডেকে সব কথা বলল। মেয়র কোন চুলোয় যাচ্ছে? এই নিয়ে আলোচনা করতে লাগল তারা। স্ত্রী বলল, উনি নিশ্চয় প্যারিস যাচ্ছেন।
স্বামী বলল, না।
ম্যাদলেন একটুকরো কাগজ ফেলে রেখে গিয়েছিল। ফ্লেমিং সেটা তুলে নিয়ে দেখল তাতে পরপর কয়েকটা জায়গার নাম আর তাদের দূরত্ব লেখা রয়েছে। অবশেষে রয়েছে অ্যারাসের নাম যার মোট দূরত্ব সাড়ে উনিশ মাইল। এটা দেখে বুঝল, মেয়র অ্যারাস যাচ্ছে।
পুরনো চার্চটার ভেতর না ঢুকে অন্য পথ দিয়ে ম্যাদলেন সোজা বাড়ি চলে গেল। সে তার শোবার ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। প্রায় দিনই সে রাত্রিবেলায় তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ে। তাই এটা তেমন অস্বাভাবিক ব্যাপার ছিল না। সেদিন তখন মাত্র সাড়ে আটটা বাজে। যে মেয়েটি একই সঙ্গে কারখানা আর ম্যাদলেনের বাড়িতে কাজ করত সেই মেয়েটি নিচের তলায় ক্যাশিয়ার আসতেই তাকে বলল, মেয়রের শরীর কি খারাপ? তার মুখখানা কেমন অদ্ভুত দেখাচ্ছে।
ক্যাশিয়ার নিচের তলায় একটা ঘরে শুত। সে মেয়েটির কথায় কান না দিতে শুতে চলে গেল। কিন্তু দুপুররাতে ঘুম ভেঙে গেল তার। দোতলায় যে ঘরে ম্যাদলেন থাকে সে ঘরে পায়চারির পদশব্দ শুনে সে বুঝতে পারল ম্যাদলেনই পায়চারি করছে। ব্যাপারটাতে আশ্চর্য হয়ে গেল ক্যাশিয়ার। কারণ ম্যাদলেন সাধারণত সকাল হওয়ার আগে ওঠে না এবং তার আগে কোনও শব্দ শোনা যায় না তার ঘরে।
ক্যাশিয়ার শুনতে পেল উপরে ম্যালেনের আলমারি খোলার ও আসবাবপত্র সরানোর শব্দ আসছে। সে জানালার কাছে গিয়ে জানালা খুলে দেখল উপরতলায় এই শীতেও ম্যালেনের ঘরের জানালা খোলা আছে। কারণ আলোর ছটা আসছিল ভোলা জানালাটা দিয়ে। তখনও উপরে পায়চারির শব্দ হচ্ছিল।
মঁসিয়ে ম্যালেনের ঘরে তখন আসলে কী হচ্ছিল তার কথা এবার বর্ণনা করব আমরা।
.
৩
পাঠকরা হয়তো বুঝতে পেরেছেন এই মঁসিয়ে ম্যাদলেনই হল জাঁ ভলজাঁ। আমরা এর আগেই তার বিবেকের গভীরে উঁকি মেরে দেখেছি একবার। আবার সেখানে উঁকি মেরে দেখতে গেলে ভয়ে কাঁপতে থাকব আমরা। এই ধরনের চিন্তার থেকে ভয়াবহ আর কিছু হতে পারে না। মানুষের আত্মার চোখে মানুষের মতো দুর্বোধ্যতায় অন্ধকার, আবার স্পষ্টতার উজ্জ্বল আর কিছু হতে পারে না; সব জীবের মধ্যে মানুষই হচ্ছে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর, সবচেয়ে জটিল, সবচেয়ে রহস্যময় এবং গভীরতায় অন্তহীন।
মানুষের বিবেকের ওপর যদি একটা কবিতা লিখতে হয় তা হলে তা এমনই এক মহাকাব্য হবে যা অন্য সব মহাকাব্যকে ছাড়িয়ে যাবে। তার গভীরতায় পৃথিবীর সকল মহাকাব্য তলিয়ে যাবে। মানুষের বিবেক হচ্ছে এক মায়াময় গোলকধাঁধা, অভিলাষ আর অনুসন্ধানের লীলাক্ষেত্র, স্বপ্নের জ্বলন্ত চুল্লি। যেসব চিন্তার কথা আমরা ভাবতেও লজ্জা পাই সেইসব গোপন লজ্জাজনক চিন্তার এক অন্ধকারাবৃত ভাণ্ডার। সেখানে প্রতিনিয়ত চলে আত্মাভিমানের তাণ্ডব আর অরাজকতা, বিচিত্র আবেগানুভূতির দ্বন্দ্ব। কোনও মানুষ যখন চিন্তা করে তখন যদি আমরা সেই মুহূর্তে তার নীরব নিস্তব্ধ বহিরঙ্গের অন্তরালে অন্তরের অন্তস্তলে কী আলোড়ন চলছে তা একবার উঁকি মেরে দেখি তা হলে দেখতে পাব হোমার বর্ণিত এক তুমুল মহাযুদ্ধের মতো যুদ্ধ চলছে সেখানে। কত সব ড্রাগন আর হায়েড্রা, মিল্টন ও দান্তে বর্ণিত কত সব অলৌকিক ও অতিলৌকিক চরিত্রের বিরাট লড়াই চলছে যেন সে অন্তরের মধ্যে। প্রতিটি মানুষের মধ্যেই আছে অনন্ত এক মহাশূন্যতা যেখানে থেকে সে তার আত্মার গতিবিধির সঙ্গে তার জীবনের কার্যাবলির বিচার করে হতাশ হয় এবং সেই শূন্যতার গভীরে ডুবে যায়।
দান্তে এলিঘিরি একদিন একটি ভাগ্যনির্দিষ্ট দরজার সামনে এসে ঢুকতে ইতস্তত করতে থাকেন। আমরাও এই ধরনের দ্বারপথের সামনে এসে ইতস্তত করি, কিন্তু তা। সত্ত্বেও ঢুকে পড়ি তার মধ্যে। পেতিত গার্ভে নামে সেই ছেলেটার সঙ্গে জাঁ ভলজাঁ’র জীবনে যা যা ঘটে তা বলার আর কোনও প্রয়োজন নেই, কারণ তা পাঠকরা জানেন। তার পর থেকে তার জীবনে এক বিরাট পরিবর্তন ঘটে। বিশপ যা চেয়েছিলেন, সে। তা-ই হয়েছিল। এটা শুধু এক পরিবর্তন নয়, এ এক আশ্চর্য রূপান্তর।
সে প্রথমে বিশপের রুপোর জিনিসপত্রগুলো বিক্রি করে শুধু রুপোর বাতিদান দুটো স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে রেখে পালিয়ে বেড়াবার চেষ্টা করে। ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে ঘুরে বেড়াতে থাকে সে। অবশেষে মন্ত্রিউল-সুর-মের শহরে এসে পড়ে। এখানে এসে কিভাবে সে প্রতিষ্ঠিত করে নিজেকে তা আমরা আগেই দেখেছি। এখানে সে নানারকম জনকল্যাণমূলক কাজে মত্ত হয়ে থাকলেও ব্যক্তিজীবনে সে ছিল একেবারে নিঃসঙ্গ আর দুরধিগম্য। তার অবাঞ্ছিত অতীত জীবনের এক দুর্মর স্মৃতি ছায়াচ্ছন্ন করে রেখেছিল তার বিবেকবুদ্ধিকে। তবু সে তার বর্তমান জীবনের উদার ও মহৎ কার্যাবলির দ্বারা অতীতের জীবনের সব কলঙ্করেখাকে মুছে দিচ্ছে একে একে। এই ধরনের এক সান্ত্বনা থেকে শান্তি পেত সে। তার মনে তখন মাত্র দুটো উদ্দেশ্য ছিল–তার নাম ও আসল পরিচয়কে গোপন রাখা আর মানুষের কাছ থেকে ক্রমে দূরে চলে গিয়ে ঈশ্বরের কাছে ফিরে যাওয়া।
