সে যখন সেন্ট ভিনসেন্ট-এর দলে যোগদান করে তখন তার দুটো বাতিক ছিল। সে বেশি মিষ্টি খেতে ভালোবাসত আর চিঠি পেতে চাইত। পরে এই দুর্বলতাকে অপসারিত করে তার জীবন থেকে। বড় বড় অক্ষরে লাতিন ভাষায় লেখা একখানি প্রার্থনাপুস্তকই ছিল তার একমাত্র প্রিয় গ্রন্থ। সে লাতিন ভাষা না জানলেও সেই বইটা পড়ে বুঝতে পারত। ফাঁতিনের মধ্যে কিছু অন্তর্নিহিত গুণ থাকা সত্ত্বেও কোনও স্নেহমমতা ছিল না তার প্রতি। ফাঁতিনের দেখাশোনার সব ভার নিজের ওপরেই চাপিয়ে নেয়।
মঁসিয়ে ম্যাদলেন সিস্টার সিমপ্লিসকে একটু আড়ালে ডেকে এমনভাবে তার ওপর ফাঁতিনের ভার দেয় যে সেকথা পরে সে কোনওদিন ভুলতে পারেনি। তার পর ম্যাদলেন ফাঁতিনেকে দেখতে যায়।
কোনও শীতার্ত ব্যক্তি যেমন উষ্ণতা আর আরাম চায় তেমনি ফাঁতিনে ম্যাদলেনের আসার জন্য পরম আগ্রহের সঙ্গে প্রতীক্ষায় থাকত। সে নার্সদের বলত, মেয়র যতক্ষণ আমার কাছে থাকেন ততক্ষণ যেন আমার দেহে প্রাণ থাকে।
সেদিন ফাঁতিনের জ্বর খুব বেড়েছিল। ম্যাদলেন তার কাছে যেতে সে সরাসরি জিজ্ঞাসা করল, কসেত্তের কী হল?
ম্যাদলেন বলল, খুব শীঘ্রই সে এসে পড়বে।
সেদিন ম্যাদলেন আধ ঘণ্টার পরিবর্তে এক ঘণ্টা রইল। অন্য দিনকার মতোই সে কথাবার্তা বলতে লাগল। সে নার্সদের বলে দিল, ফাঁতিনের সেবা-শুশ্রষার যেন কোনও ত্রুটি না হয়। ওষুধপত্র বা পথ্যের যেন অভাব না হয়। একসময় ম্যালেনের মুখটা গম্ভীর হয়ে যায়। ডাক্তার তাকে একসময় বলল, ফাঁতিনের অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছে। অনেকে ভাবল ডাক্তারের কথা শুনেই মুখটা ভার হয়ে পড়ে ম্যাদলেনের।
হাসপাতাল থেকে সোজা মেয়রের অফিসে চলে যায় সে। অফিসের কেরানি দেখল, ম্যাদলেন অফিসঘরে টাঙানো ফ্রান্সের বিভিন্ন রাস্তার একটা মানচিত্র খুঁটিয়ে দেখছে। তা দেখতে দেখতে একটা কাগজের উপর কী লিখল সে।
.
২
মেয়রের অফিস থেকে বেরিয়ে ম্যাদলেন শহরের একটা রাস্তা দিয়ে তার চার্চের কুরে শফেয়ারের কাছে চলে গেল। শফেয়ার ঘোড়া আর গাড়ি ভাড়া দিত।
ম্যাদলেন দেখল শফেয়ার ঘোড়ার গাড়ির কী একটা জিনিস মেরামত করছিল।
সে তাকে বলল, মাস্টার শফেয়ার, একটা ভালো ঘোড়া দিতে পারেন?
শফেয়ার ফ্ল্যান্ডার্সের অধিবাসী ছিল বলে তাকে ফ্লেমিংও বলা হত। ফ্লেমিং বলল, আমার সব ঘোড়াই ভালোমঁসিয়ে মেয়র। আপনি কী চাইছেন?
ম্যাদলেন বলল, আমি এমন একটা ঘোড়া চাই যে দিনে কুড়ি লিগ অর্থাৎ চল্লিশ মাইল পথ যাওয়া-আসা করতে পারে।
ফ্লেমিং বলল, কুড়ি লিগ!
হ্যাঁ।
সারাদিন হাঁটার পর কতক্ষণ বিশ্রাম করতে পাবে?
পরদিন আবার আমাকে ফিরে আসতে হবে।
সেই একই দূরত্ব?
হ্যাঁ।
তা হলে পুরো চল্লিশ মাইল?
ম্যাদলেন একটা কাগজ বার করে দেখিয়ে বলল, জায়গাটার দূরত্ব ঠিক সাড়ে উনিশ মাইল।
ফ্লেমিং বলল, ঠিক আছে মঁসিয়ে মেয়র, আপনি যা চাইছেন সেই রকম ঘোড়াই আমার আছে। ঘোড়াটা বাস বুলোনাই থেকে আনা। একটা অদ্ভুত জানোয়ার। আগে ঘোড়াটাকে কেউ বশ করতে পারত না। তার পিঠে কেউ চাপলেই সে তাকে ফেলে দিত। তারপর আমি তাকে কিনে এনে বশ করি। এখন সে মেঘের মতো আর বাতাসের মতো গতিশীল। আপনি যা চাইছেন এই ঘোড়াই তা পারবে। তবে এর পিঠে চাপতে পাবেন না। এ গাড়ি টানতে পারে, কিন্তু পিঠে কাউকে বহন করে না।
এটাই হল এর রীতি।
ম্যাদলেন বলল, পুরো পথটা যেতে পারবে তো?
ফ্লেমিং বলল, চল্লিশ মাইল তো? স্বচ্ছন্দে আট ঘণ্টার মধ্যে চলে যাবে। তবে একটা কথা আছে।
কী কথা?
কথাটা হল এই যে, অর্ধেক পথ যাওয়ার পর এক ঘন্টা বিশ্রাম দিতে হবে। আর কোনও পান্থশালায় ওকে খাওয়াবার সময় দেখতে হবে হোটেলের চাকররা যেন ওর খাবারের থেকে কিছু যথারীতি চুরি করে না নেয়।
আমি তা অবশ্যই দেখব।
আর একটা কথা। আমি শুধু এই গাড়ি আর ঘোড়া দিচ্ছি আপনার খাতিরে মঁসিয়ে মেয়র। আপনি গাড়ি চালাতে জানেন তো?
অবশ্যই জানি।
এর ভাড়া হচ্ছে দিনে তিরিশ ফ্রাঁ। ঘোড়ার খাওয়ার খরচ আপনার।
মঁসিয়ে ম্যাদলেন তিনটে স্বর্ণমুদ্রা বার করে টেবিলের উপর রেখে বলল, দু’দিনের অগ্রিম দেওয়া রইল।
ফ্লেমিং বলল, আর একটা কথা। বড় গাড়ি নিয়ে এত দূর পথ যাওয়া ঠিক হবে না। আপনি বরং আমার দু’চাকার হালকা গাড়িটা নিয়ে যান।
খুব ভালো কথা।
তবে দেখুন, গাড়িটা একেবারে ফাঁকা।
তাতে কিছু যায়-আসে না।
তবে একটা জিনিস দেখেছেন মঁসিয়ে মেয়র। এখন শীতকাল, দারুণ ঠাণ্ডা। তাছাড়া বৃষ্টি হতে পারে।
ম্যাদলেন বলল, আমি চাই ঘোড়া আর গাড়ি আমার বাড়ির সামনে রাত সাড়ে চারটের সময় হাজির করতে হবে।
ফ্লেমিং বলল, ঠিক আছে।
এরপর সে টেবিলের উপর তার নখ দিয়ে একটা আঁচড় কেটে বলল, এখনও কিন্তু আপনি কোথায় যাবেন তা জানতে পারলাম না।
এই কথাটা ফ্লেমিং প্রথম থেকেই ভাবছিল, কিন্তু মেয়রকে এতক্ষণ জিজ্ঞাসা করতে পারছিল না।
ম্যাদলেন সে কথার জবাব না দিয়ে বলল, ঘোড়াটার সামনের পা দুটো শক্ত তো?
হ্যাঁ, তবে ঢালুতে নামার সময় সাবধানে গাড়ি চালাবেন। আপনার পথে হয়তো অনেক ঢাল আছে।
ম্যাদলেন বলল, ঠিক রাত সাড়ে চারটের সময় যেন ঘোড়া আর গাড়িটা আমার বাড়ির সামনে নিয়ে আসা হয়।
এই কথা বলে বিস্ময়াভিভূত ফ্লেমিংকে ছেড়ে সেখান থেকে চলে গেল ম্যাদলেন।
