জেতার্ত তার কথাগুলো এমন এক উচ্চস্তরের নম্রতা আর উগ্র আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে বলল যে তার অন্তর্নিহিত সততা বাইরে প্রকটিত হয়ে এক অদ্ভুত মহত্ত্বে পরিণত হল।
ম্যাদলেন বলল, ঠিক আছে। ব্যাপারটা পরে ভেবে দেখতে হবে।
এই বলে সে করমর্দনের জন্য জেভার্তের দিকে হাতটা বাড়াতেই পিছিয়ে গেল জেভাৰ্ত। কড়াভাবে বলল, এ হতেই পারে না। একজন ম্যাজিস্ট্রেট কখনও একজন পুলিশের লোকের সঙ্গে করমর্দন করে না। আমি পুলিশ অফিসারের ক্ষমতা ও পদমর্যাদাকে কলুষিত করেছি। আমাকে আর অফিসার বলা উচিত নয়।
মাথাটা নত করে অভিবাদন জানিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় ঘুরে দাঁড়িয়ে জেভার্ত বলল, ঠিক আছে মঁসিয়ে মেয়র, আমার প্রার্থনা মঞ্জুর না হওয়া পর্যন্ত আমি কাজ করে যাব।
জেভার্ত চলে গেল। মঁসিয়ে ম্যাদলেন চিন্তান্বিতভাবে দাঁড়িয়ে বারান্দার উপর তার দৃঢ় পদক্ষেপের ক্রমবিলীয়মান শব্দগুলো শুনতে লাগল।
১.৭ মন্ত্রিউল-সুর মের শহরে
সপ্তম পরিচ্ছেদ
১
এরপর মন্ত্রিউল-সুর মের শহরে যা ঘটেছিল তা সব জানতে পারেনি শহরের লোক। তবে দু একটা যে সংক্ষিপ্ত খবর ছড়িয়ে পড়েছিল তাতে প্রচুর আলোড়ন সৃষ্টি হয় তা অবশ্যই যথাযথভাবে বর্ণনা করা উচিত। তার মধ্যে দু একটি ঘটনাকে পাঠকদের অসম্ভব বলেও মনে হতে পারে।
যেদিন সকালে জেভাতের সঙ্গে ম্যাদলেনের দেখা হয় সেদিন বিকালে যথারীতি হাসপাতালে ফাঁতিনেকে দেখতে যায় ম্যাদলেন। ফাঁতিনের কাছে যাওয়ার আগে যে দু জন নার্স তার হাসপাতালে কাজ করত, সিস্টার সিমপ্লিস নামে তাদের মধ্যে একজন নার্সকে ডেকে দেখা করল তার সঙ্গে। অপর একজন নার্সের নাম ছিল সিস্টার পার্পেচুয়া।
সিস্টার পার্পেচুয়া ছিল এক সরল সাদাসিধে গ্রাম্য মহিলা। সে অন্য কোনও কাজ না পেয়েই কুমারী অবস্থায় নার্সের কাজে যোগদান করে। এই ধরনের মেয়ে এমন কিছু বিরল নয়। ধর্মীয় প্রেরণাসিক্ত এক সেবার ব্রত তার চরিত্রের মূল ধাতুকে কোনওভাবে পরিবর্তিত করতে পারেনি। কোনও এক গ্রাম্য মেয়ের চার্চের কাজে যোগদান করা এবং সন্ন্যাসিনী হওয়াটা এমন কিছু কঠিন কাজ নয়। গ্রাম্য চাষি মেয়ে আর গ্রাম্য চার্চের সন্ন্যাসিনীর একটা সাধারণ ভিত্তিভূমি থাকে এবং সেটা হল অজ্ঞতা। সিস্টার পার্পেচুয়া খুব কড়া প্রকৃতির মেয়ে এবং খিটখিটে মেজাজের। সে যখন হাসপাতালে নার্সের কাজ করত তখন রোগীরা তাকে মোটেই দেখতে পারত না। সে রুগণ আর মুমূর্ষদের কারণে অকারণে যখন-তখন তিরস্কার করত, ঈশ্বরকে যেন তাদের মুখের উপর ছুঁড়ে মারত। মৃত্যুর পদধ্বনির সঙ্গে তার প্রার্থনার সুরকে মিশিয়ে দিত। তার বাড়ি ছিল পানতয়।
ভিনসেন্ট দ্য পল কল্পিত সিস্টার অফ মার্সিকে কয়েকটি কথায় মূর্ত করে তোলেন। সিস্টার সিমপ্লিস-এর সঙ্গে পার্পেচুয়ার অনেক তফাৎ। সিস্টার অফ মার্সি অর্থাৎ যিনি দয়ার প্রতিমূর্তি তার মধ্যে স্বাধীনতা আর সেবাপরায়ণতা একই সঙ্গে দুটোরই প্রধান্য ছিল। যারা সিস্টার অফ মার্সির মতে হতে চায় অথবা তার আদর্শ অনুসরণ করতে চায় তাদের সেবাই হবে জীবনের ধর্ম, আনুগত্যই তাদের জীবনের শৃঙখলা, রোগীদের ঘরই তাদের ধর্মস্থান, ঈশ্বরের ভয়ই তাদের একমাত্র আশ্রয় এবং শালীনতাই তাদের অবগুণ্ঠন। সিস্টার সিমপ্লিসের কাছে আদর্শই ছিল এক জীবন্ত বাস্তব। কেউ তার বয়স কত তা জানত না, তাকে দেখে মনে হয় তার জীবনে কখনও যৌবন ছিল না এবং মনে হয় সে কখনও বুড়ো হবে না। সে খুব শান্ত এবং কঠোর প্রকৃতির মহিলা। আমরা তাকে নারী বলতেই পারি না, নারীসুলভ কমনীয়তা তার মধ্যে ছিল না। সে কাছে থাকলেও মনে হয় যেন কত দূরে আছে। সে জীবনে কখনও মিথ্যে কথা বলেনি। সে এত শান্ত ছিল যে তাকে দুর্বল প্রকৃতির মনে হত। কিন্তু গাঁয়ে তার প্রচুর শক্তি ছিল। সে যখন তার সুন্দর সরু সরু ও বিশুদ্ধ আঙুলগুলো রোগীদের উপর রাখত তখন তারা যন্ত্রণার মাঝেও আরাম ও আনন্দ অনুভব করত। তার কথার মধ্যে যেন এক আশ্চর্য নীরবতা ছিল। সে একটাও অনাবশ্যক কথা বলত না। তার কণ্ঠস্বর শুনে যে কেউ আনন্দ পেত। মোটা সার্জের গাউনের সঙ্গে তার চোখমুখের সূক্ষ্ম ও কমনীয় ভাবটা একরকম খাপ খেয়ে গিয়েছিল। তার ওই গাউনটা যেন তাকে সব সময় ঈশ্বরের কথা মনে করিয়ে দিত। সে জীবনে কখনও মিথ্যা কথা বলত না, বিনা কারণে কোনও কথা বলত না, এমন কোনও কথা বলত না যা সত্য নয় –সেইটাই তার চরিত্রের সবচেয়ে বড় গুণ ছিল। তার অকম্পিত সত্যবাদিতা তাদের সম্প্রদায়ের মধ্যে তাকে বিখ্যাত করে তোলে এবং আব্বেসিকর্দ সে কথা একটি চিঠিতে মূকবধির ম্যাথিউকে জানান। আমরা যতই সৎ আর নীতিপরায়ণ হই না কেন, আমাদের সরলতা ও সত্যবাদিতার মধ্যেও কিছু না কিছু নির্দোষ মিথ্যা থেকে যায়। কিন্তু সিস্টার সিমপ্লিসের ক্ষেত্রে একথা খাটে না। তার কাছে মিথ্যা মিথ্যা, সাদা বা নির্দোষ মিথ্যা বলে কোনও কিছু নেই। যে মিথ্যা কথা বলে সে সম্পূর্ণ মিথ্যা কথাই বলে। মিথ্যা মানেই শয়তানের মুখ। যে শয়তান সেই অসত্য। সিস্টার সিমপ্লিস এটা বিশ্বাস করত এবং এই বিশ্বাসমতো কাজ করত। যে পবিত্রতার জ্যোতি তার দেহ থেকে বিচ্ছুরিত হত, তার চোখে-মুখে ঝরে পড়ত, সেই বিশ্বাসই ছিল তার শক্তির উৎস। তার হাসি আর চোখের দৃষ্টি দুটোই ছিল পবিত্র। তার বিবেকের স্বচ্ছ দর্পণে কোনও ধূলিকণার বিন্দুমাত্র স্লানিমা বা কোনও ছলনার কুটিল জাল ছিল না। সে নাকি সিমপ্লিস নামটা নিয়েছিল সেন্ট ভিনসেন্ট দ্য পল থেকে।
