ম্যাদলেন বলল, তার পর?
জেভার্ত তেমনি গম্ভীরভাবে বলল, সত্য সত্য মঁসিয়ে মেয়র। আমি স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছি সেই শ্যাম্পম্যাথিউ নামে লোকটাই আসল জাঁ ভলজাঁ। আমিও লোকটাকে চিনতে পারি।
ম্যাদলেন নিচু গলায় বলল, এ বিষয়ে তুমি নিশ্চিত?
জেভাৰ্ত তার কথার নিশ্চয়তা বোঝাবার জন্য এক নীরস হাসি হেসে বলল, হ্যাঁ, এ বিষয়ে নিশ্চিত আমি। জাঁ ভলকে দেখার পর আমিও এই কথা ভাবছি যে আমি কী করে এত বড় একটা ভুল ধারণাকে পোষণ করলাম এতদিন। আমি আপনার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি মঁসিয়ে মেয়র। আমাকে মার্জনা করুন।
মাত্র কয়েক সপ্তা আগে যে তাকে তার নিম্নতন কর্মচারীদের সামনে অপমান করেছে, তার কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করতে গিয়ে তার মধ্যে একই সঙ্গে সরলতা আর আত্মমর্যাদাবোধের মিশ্রণে এক ভাব ফুটে ওঠে তার চোখে-মুখে।
ম্যাদলেন হঠাৎ প্রশ্ন করে বসল, কিন্তু লোকটা কী বলে?
জেভার্ত বলল, দেখুন মঁসিয়ে মেয়র, অপরাধটা ওর পক্ষে সত্যিই গুরুতর যদি সত্যিই ভলজাঁ হয়। কারণ ও একজন জেল-ফেরত কয়েদি। পাঁচিল ডিঙিয়ে আপেল চুরি করা কোনও ছেলে বা প্রাপ্তবয়স্ক লোকের পক্ষে এমন কিছু গুরুতর অপরাধ নয়, কিন্তু কোনও এক জেল-ফেরত কয়েদির পক্ষে একটা গুরুতর অপরাধ। পাঁচিল ডিঙিয়ে চুরি করতে যাওয়ার অপরাধ, তাতে আবার জেল-ফেরত কয়েদি–এর বিচার ম্যাজিস্ট্রেট করবে না, করবে বিশেষ একদল বিচারক এবং এর শাস্তি কয়েকদিনের জেল নয়, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। তার ওপর আছে একটি ছেলের টাকা চুরির অভিযোগ, অবশ্য ছেলেটাকে যদি পাওয়া যায়। লোকটা যদি ভলজাঁ হয় তা হলে তার অবস্থা সত্যিই শোচনীয়। কিন্তু লোকটা এমন চতুর যে তাতে আমার আরও সন্দেহ হয়। ভলজাঁ’র নামটা শুনে সে এমনভাবে তাকাতে লাগল যেন সে কিছুই জানে না। সে বলল, আমার নাম শ্যাম্পম্যাথিউ, এ ছাড়া আমি আর কিছুই জানি না। লোকটা সত্যিই চালাক। কিন্তু চালাকি করে কিছু হবে না। জোর সাক্ষী আছে। চার-চারজন সাক্ষী তাকে চেনে। অ্যারাসে তার বিচার হবে এবং আমাকেও সাক্ষ্য দিতে হবে।
ম্যাদলেন টেবিলের উপর রাখা কাগজগুলো আবার দেখতে লাগল। দেখে মনে হচ্ছিল তার মনে অনেক চিন্তা আছে। সে ইন্সপেক্টারের দিকে তাকিয়ে বলল, ধন্যবাদ জেতার্ত। এত সব খুঁটিনাটি শোনার আমার কোনও আগ্রহ নেই। তাছাড়া আমাদের প্রত্যেকেরই আপন আপন কাজ আছে। বুলোপিয়েদ নামে একমহিলা গাড়িচালক পিয়ের শেষনেলভের বিরুদ্ধে নালিশ করেছে, তাকে আর তার মেয়েকে আর একটু হলে চাপা দিত। চালক হিসেবে লোকটা হঠকারী, তাকে একটা উচিত শিক্ষা দিতে হবে। আরও অনেক অভিযোগ আছে। সেগুলো তদন্ত করে দেখতে হবে। এগুলো সব পুলিশ আইন ভঙ্গ করার ব্যাপার। তোমাকে আমি অনেক কাজ দেব। তবে তুমি তো অ্যারাসে যাবে। বোধ হয় এক সপ্তা থাকবে, না।
জেভার্ত বলল, তার আগেই চলে আসব আমি। আমি আজ রাতের গাড়িতেই যাচ্ছি।
ম্যাদলেন বলল, সেখানে ক’দিন লাগবে?
একদিনের বেশি নয়। আগামী কালই সন্ধের মধ্যে রায় বার হবে। তবে আমাকে এতক্ষণ থাকতে হবে না। আমি সাক্ষ্য দিয়েই চলে আসব।
ম্যাদলেন বলল, ঠিক আছে।
এরপর ইশারায় তাকে যেতে বলল। কিন্তু তবু গেল না জেভার্ত। সে বলল, মাপ। করবেন, একটা জিনিস আমি আপনাকে মনে করিয়ে দিতে চাই মঁসিয়ে মেয়র।
কিসের কথা?
আমাকে বরখাস্ত করতে হবে।
ম্যাদলেন উঠে দাঁড়াল। সে বলল, জেভাৰ্ত, তুমি একজন সম্মানিত ব্যক্তি এবং আমি তোমাকে শ্রদ্ধা করি। তুমি তোমার অপরাধটাকে বাড়িয়ে বলছ। অপরাধের ব্যাপারটা আমার সঙ্গে জড়িত। তোমাকে উপরে উঠতে হবে জেতার্ত, নিচে নামতে হবে না। আমি চাই তুমি এই পদে যেমন আছ তেমনি বহাল থাক।
জেভার্ত স্থির স্বচ্ছ দৃষ্টিতে ম্যালেনের দিকে তাকাল। তার সেই দৃষ্টির স্বচ্ছতার। মধ্যে যে একটুখানি সংকীর্ণ বিবেক ফুটে উঠেছিল তা একই সঙ্গে ঋজু এবং কঠোর বলে মনে হচ্ছিল। সে শান্ত কণ্ঠে বলল, মঁসিয়ে মেয়র, আমি আপনার একথা মেনে নিতে পারলাম না।
ম্যাদলেন বলল, আমি আবার বলছি, তোমার এ অপরাধের ব্যাপারটা আমার সঙ্গে জড়িত।
কিন্তু জেভার্ত নিজস্ব চিন্তার ধারাটাকে আঁকড়ে ধরে থেকে বলে যেতে লাগল, আপনি যে বাড়িয়ে বলার কথা বললেন সেটা ঠিক নয়, আমি কিছুই বাড়িয়ে বলিনি। কিন্তু ব্যাপারটা একবার ভেবে দেখুন। আমি আপনাকে অন্যায়ভাবে সন্দেহ করেছি, এটা এমন কিছু অন্যায় নয়, যদিও আমাদের ঊর্ধ্বতন অফিসারদের বিরুদ্ধে এই ধরনের সন্দেহ পোষণ করার কথাটা ভেবে দেখা উচিত। কিন্তু আপনি একজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি, মেয়র, ম্যাজিস্ট্রেট। প্রচণ্ড ক্রোধ এবং প্রতিশোধবাসনার বশবর্তী হয়ে আমি আপনাকে জেলফেরত কয়েদি হিসেবে বিনা প্রমাণে অভিযুক্ত করেছি। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। অমি নিজে একজন কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধি হয়ে আপনার মতো একজন সরকারের পদস্থ প্রতিনিধিকে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করেছি। আমার অধীনস্থ কোনও কর্মচারী যদি আমার প্রতি এমন অন্যায় আচরণ করত তা হলে আমি বলতাম সে তার পদের অযোগ্য এবং তাকে আমি অবশ্যই বরখাস্ত করতাম। আর একটা কথা মঁসিয়ে মেয়র। আমি খুব রুক্ষ ও রূঢ় প্রকৃতির লোক ছিলাম। আমি অপরের প্রতি অত্যন্ত রূঢ় ও নিষ্ঠুর ব্যবহার করেছি। তখন হয়তো তার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এখন যখন আমি নিজে অন্যায় করেছি, এখন আমার নিজের ওপর আমার অবশ্যই কঠোর ও রূঢ় হওয়া উচিত। তা না হলে আমার অতীতের সব কাজ, সব আচরণ ঘোরতর অন্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে। আমি যেমন এর আগে আর পাঁচজন অন্যায়কারীকে শাস্তি হতে অব্যাহতি দিইনি তেমনি আজ আমাকে নিজেকেও শাস্তি হতে অব্যাহতি দেওয়া কখনই উচিত নয়। তা হলে সেটা এক জঘন্য অপরাধ হবে এবং যারা আমাকে শুয়োর বলে গালাগালি করে তাদের আচরণ ন্যায়সঙ্গত হিসেবে গণ্য হবে। আপনি অনেককে মার্জনা করেছেন এবং তা দেখে আমার খুব রাগ হয়েছে। কিন্তু আপনার মার্জনা আমি চাইনি। আমার মতে যে নারী শহরের একজন বিশিষ্ট শ্রদ্ধাভাজন নাগরিককে অপমানিত করেছিল সবার সামনে তাকে মার্জনা করা যেমন অন্যায়, তেমনি যে পুলিশ অফিসার মেয়রকে লোকচক্ষে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করেছিল তাকে মার্জনা করাটাও অন্যায়। এই ধরনের মার্জনা সমাজের নৈতিক মানকে অবনত করে। দয়ালু হওয়া সহজ, কিন্তু ন্যায়পরায়ণ হওয়া কঠিন। আমি যা সন্দেহ করেছিলাম আপনি যদি তা-ই হতেন তা হলে আমি আপনার প্রতি কোনও দয়া দেখাতাম না মঁসিয়ে মেয়র। অপরের প্রতি আমি যে ব্যবহার করি, নিজের প্রতিও আমার সেই ব্যবহার করা উচিত। যেহেতু আমি অন্যায় করেছি, অপরাধ করেছি, আমাকে বরখাস্ত ও কর্মচ্যুত করা উচিত। আমার হাত-পা আছে, আমি মাঠে চাষের কাজ পারি এবং সেটা আমার পক্ষে খুব একটা কষ্টকর হবে না। সরকারি কর্মের ক্ষেত্রে আমি এক আদর্শ সৃষ্টি করতে চাই মঁসিয়ে মেয়র। আমার অনুরোধ, আপনি ইন্সপেক্টর জেতার্তকে বরখাস্ত করার ব্যবস্থা করুন।
