একটু থেমে আবার বলতে লাগল জেতার্ত, মঁসিয়ে মেয়র, দিনকতক আগে আপনি আমার প্রতি অন্যায় আচরণ করেছিলেন। এবার ন্যায়সঙ্গত আচরণ করুন।
ম্যাদলেন বলল, কিন্তু কী বলছ তুমি আমি তো বুঝতেই পারছি না। তুমি কিভাবে আমাকে অপমান করেছ? কী অপরাধ করেছ তুমি? আমার কী ক্ষতি করেছ? তুমি বলছ তুমি চাকরি থেকে–
জেভার্ত বলল, হ্যাঁ বরখাস্ত।
ঠিক আছে বরখাস্ত, কিন্তু কেন?
আমি বুঝিয়ে বলছি।
জেভাৰ্ত একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে আবেগহীন কণ্ঠে বলতে লাগল, আমি সেই মেয়েটির ব্যাপারে আপনার ওপর এমন প্রচণ্ডভাবে রেগে গিয়েছিলাম যে ছয় সপ্তাহ আগে আমি আপনার নামে নিন্দাবাদ করেছি।
তুমি আমার নামে নিন্দা করেছ?
হ্যাঁ, প্যারিসে পুলিশ বিভাগের প্রধান সচিবের কাছে।
মঁসিয়ে ম্যাদলেন জেভার্তের মতো হাসত না। কিন্তু এবার সে জেভার্তের কথা শুনে হো হো শব্দে হেসে উঠল।
একজন মেয়র একজন পুলিশের কাজে হস্তক্ষেপ করেছে, এই নিন্দা করেছ?
না, আপনি একজন ভূতপূর্ব কয়েদি, এই বলে।
ম্যালেনের মুখের ভাবটা সহসা বদলে গেল। জেভার্ত তখন মাটির দিকে তাকিয়ে বলে চলল, আমি তাই বিশ্বাস করতাম। এ ধারণা আমার অনেক দিন ধরে ছিল। আপনার সঙ্গে মুখের কিছু মিল, ফেবারোলে আপনি যে খোঁজখবর নিয়েছিলেন তার ব্যাপারটা, ফকেলেভেন্তের গাড়ি ভোলার সময় আপনি যে দৈহিক শক্তির পরিচয় দিয়েছিলেন সেটা, আপনার অভ্রান্ত লক্ষ্যভেদ, কিছুটা খোঁড়ানোর ভাব… এগুলো এমন কিছু না। তবু আমি সন্দেহ করতাম আপনিই জাঁ ভলজাঁ।
কী নাম বললে?
জাঁ ভলজাঁ। আজ হতে কুড়ি বছর আগে আমি যখন তুলো’র জেলে এক প্রহরীর কাজ করতাম তখন সে সেই জেলের কয়েদি ছিল। জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর সে এক বিশপের বাড়িতে চুরি করে এবং রাস্তার উপর একটি ছোট ছেলের টাকা চুরি করে। তাকে আবার ধরার চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু সে পালিয়ে যায়। তার পর আট বছর তার কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। আমি বিশ্বাস করেছিলাম… যাই হোক, রাগের মাথায় আমি প্যারিসে কর্তৃপক্ষের কাছে আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ করি।
ম্যাদলেন টেবিলের উপর কাগজগুলো আবার দেখতে লাগল। তার পর বলল, তারা কী বলল?
জেভার্ত বলল, তারা বলল, আমি পাগল।
আর কী বলল?
বলল, তারা ঠিক।
তুমি এটা বুঝতে পেরেছ জেনে খুশি হলাম।
তারাই ঠিক কারণ আসল জাঁ ভলজাঁ ধরা পড়েছে।
ম্যালেনের হাত থেকে একটা কাগজ পড়ে গেল। সে জেভার্তের দিকে কড়াভাবে তাকিয়ে বলল, তা বটে।
জেভার্ত বলল, ব্যাপারটা হল এই। এইলি লে–হত-~~ ক্লোশে গাঁয়ে শ্যাম্পম্যাথিউ নামে একটা লোক ছিল। সে ছিল এক গরিব নিরাশয়। সে এত গরিব ছিল যে কিভাবে জীবন ধারণ করত সেটা ছিল সকলের বিস্ময়ের বস্তু। গত শরঙ্কালে সে একবার কিছু আপেল চুরি করার জন্য গ্রেপ্তার হয়। তার স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। সে পাঁচিলে উঠে গাছের কিছু ডাল ভাঙে। কিছু আপেলও তার হাতে পাওয়া যায়। তাকে জেল-হাজতে নিয়ে যাওয়া হয়। সামান্য একটা ঘটনা বলে সেটা এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। কিন্তু ঘটনাটা সহসা এক অপ্রত্যাশিত মোড় নেয়। সে যে জেলে হাজতবাস করছিল সেটা তখন মেরামত হওয়ার জন্য তাকে অ্যারোসের জেলে পাঠানো হয়। সেই জেলে একজন পুরনো কয়েদি ছিল। তার নাম ছিল ব্রিভেত। সে খুব বিশ্বাসী ছিল, কারণ তার আচরণ ভালো ছিল। সে শ্যাম্পম্যাথিউকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে, আমি ওকে চিনি। ও হচ্ছে এক পুরনো কয়েদি। তুল জেলে আমরা একসঙ্গে কুড়ি বছর ছিলাম। ওর নাম হচ্ছে জাঁ ভলজাঁ।
শ্যাম্পম্যাথিউ অবশ্য একথা অস্বীকার করে। সে বলে জাঁ ভলজাঁ’র নাম সে কখনও শোনেনি। কিন্তু এ ব্যাপারে তদন্ত করা হয়। তদন্ত করে দেখা যায় তিরিশ বছর আগে শ্যাম্পম্যাথিউ বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষ করে ফেবারোল গাঁয়ে গাছ কাটার কাজ করে বেড়াত। মাঝখানে ছিল অনেকদিনের ফাঁক। কিন্তু পরে এই অভার্নে ও প্যারিসে খোঁজখবর নেওয়া হয়। ম্যাথিউ বলে, ও চাকা মেরামত আর চাকা তৈরির কাজ করত। আর ওর একটা মেয়ে ছিল যে বেড়ার কাজ করত। পরে সে ঘুরতে ঘুরতে ফেবারোলে চলে আসে। কিন্তু চুরির দায়ে জেলে যাওয়ার আগে জাঁ ভলজাঁ কী করত? সে ফেবারোলে গাছ কাটার কাজ করত। কিন্তু এইটাই সব নয়। ভল’র খ্রিস্টীয় নাম ছিল আঁ আর তার মা’র কুমারীজীবনের নাম ছিল ম্যাথিউ। মনে হয় সে জেল থেকে বেরিয়ে এসে তার আসল নামটা গোপন করে তার নিজের ও মা’র নাম দুটো মিলিয়ে নিজেকে জাঁ ম্যাথিউ নামে চালাতে থাকে। আর এটাই স্বাভাবিক। অভার্নে অঞ্চলে জাকে শা বলে আর তাই থেকে লোকের মুখে মুখে শ্যাম্প হয়। এইভাবে তার নাম শ্যাম্পম্যাথিউ হয়ে দাঁড়ায়। আমার কথাটা আশা করি বুঝতে পেরেছেন? ফেবারোলে আরও তদন্ত করা হয়। কিন্তু সেখানে জাঁ ভলজাঁদের পরিবারের কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। এটা এমন কিছু অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। এই ধরনের পরিবারের লোকেরা এক জায়গায় কখনও থাকে না। তিরিশ বছর পরে ফেবারোল গাঁয়ের কোনও লোক জাঁ ভলজাঁদের কথা স্মরণ করতে পারল না। তার পর তুলতে তদন্ত করা হয়। সেখানে আরও দু জন কয়েদি পাওয়া যায় যারা তাকে চিনত। এই দু জন কয়েদির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। তারা হল কোশেপেত আর শেনিলদিউ। তাদের দুজনকেই অ্যারাস জেলে আনা হয় এবং তারা দু জনেই ব্রিভেতের কথাকে সমর্থন করে এবং বলে তথাকথিত শ্যাম্পম্যাথিউই হল জাঁ ভলজাঁ। দু জনেরই বয়স চুয়ান্ন, এক বয়স, এক চেহারা, দেহের গঠন এক, এককথায় সেই মানুষ। ঘটনাটা ঘটে সেদিন, যেদিন আমি আপনার বিরুদ্ধে চিঠিটা পাঠাই। তারা আমাকে চিঠির উত্তরে জানায় আসল জাঁ ভলজাঁ অ্যারাসে জেলে ভরা আছে। এইটাতেই আমি আরও আঘাত পাই। অ্যারাসে গিয়ে ব্যাপারটা নিজের চোখে দেখে আসার জন্য অনুমতি দেওয়া হয় আমাকে।
