দিনে দুবার করে ম্যাদলেন হাসপাতালে এসে দেখা করত ফাঁতিনের সঙ্গে। সে দেখতে এলেই ফাঁতিনে জিজ্ঞাসা করত, কসেত্তে কখন আসবে?
ম্যাদলেন বলত, সম্ভবত কাল। যে কোনও সময়েই সে এসে পড়তে পারে।
এ কথা শুনে ফাঁতিনের মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠত।
কিন্তু ফাঁতিনের অবস্থা মোটেই ভালোর দিকে যাচ্ছিল না। বরং দু এক সপ্তা যেতেই তার অবস্থা খারপের দিকে যেতে লাগল। তার ঘাড়ের উপর লাগানো একমুঠো বরফের হিম তার অস্থিমজ্জার ভেতরে ঢুকে দীর্ঘদিনের সঞ্চিত পুরনো সব রোগ ঠেলে এনেছে। অধ্যাপক লেনেক অনেক করে রোগ নির্ণয় করে চিকিৎসা করতে লাগলেন।
রোগ পরীক্ষা হলে ম্যালেন ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করল, কেমন দেখলেন?
ডাক্তার বলল, তার কি কোনও সন্তান আছে?
ম্যাদলেন বলল, তার একটি কন্যাসন্তান আছে।
তা হলে যত তাড়াতাড়ি পারেন তাকে এখানে আনার ব্যবস্থা করুন।
ম্যাদলেন ভয় পেয়ে গেল। কিন্তু ফাঁতিনে তাকে ডাক্তার কী বলল তা জিজ্ঞাসা করায় সে বলল, ডাক্তার জোর করে হেসে বলল, তোমার মেয়ে তোমার কাছে এলেই রোগ সেরে যাবে।
ফাঁতিনে বলল, ডাক্তার ঠিকই বলেছেন। থেনার্দিয়েররা কেন এখনও কসেত্তেকে রেখে দিয়েছ? কবে সে ঠিক এসে যাবে? তা হলে আমি খুব সুখী হব।
কিন্তু থেনার্দিয়েররা যত সব আজেবাজে কারণ দেখিয়ে আটকে রেখে দিয়েছিল কসেত্তেকে। তারা লিখল, এখনও ছোটখাটো অনেক দেনা আছে, তার হিসাব তারা তৈরি করছে। তাছাড়া অসুখের পর সে এখন পথ হাঁটতে পারবে না এই শীতকালে।
ম্যাদলেন আবার একটা চিঠি লিখল ফাঁতিনের কথামতো। তার পর চিঠিটার শেষে ফাঁতিনের সইটা করিয়ে নিল।
কিন্তু ইতোমধ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে গেল। আমরা আমাদের জীবনের রহস্যময় উপাদানগুলোকে নাড়াচাড়া করে জীবনকে যেভাবেই গড়ে তুলতে চাই না। কেন, ভাগ্যের কুটিল বিধান সব ওলটপালট করে দেয়।
.
২
সেদিন সকালে তার অফিসে বসে কতকগুলি জরুরি কাজ সেরে নিচ্ছিল ম্যাদলেন। যদি তাকে মঁতফারমেলে যেতে হয় তার জন্য কাজগুলো সেরে রাখছিল। এমন সময় তাকে জানানো হল ইন্সপেক্টর জেতার্ত তার সঙ্গে দেখা করতে চাইছে। জেভার্তের নামটা তার ভালো লাগল না। সেদিনের সেই ঘটনার পর থেকে জেভার্তের সঙ্গে দেখা হয়নি তার। জেভাৰ্তও তাকে এড়িয়ে চলে।
ম্যাদলেন বলল, তাকে নিয়ে এস এখানে।
বলার সঙ্গে সঙ্গে জেতার্ত ঢুকে পড়ল ঘরে।
ম্যাদলেন তার টেবিলে বসে রইল হাতে কলম নিয়ে। কতকগুলি আইনভঙ্গের রিপোর্ট পড়ছিল সে। সে নীরসভাবে বসতে বলল জেতার্তকে।
জেভাৰ্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে ম্যাদলেনকে নমস্কার জানিয়ে ম্যালেনের সামনে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।
জেভাৰ্তকে আগে যারা দেখেছে, যারা তার চরিত্রের কথা জানে তারা এখন তাকে দেখলে অবাক হয়ে যাবে অপার বিস্ময়ে। ম্যালেনের প্রতি তার সেই দীর্ঘসঞ্চিত গোপন বিতৃষ্ণা আর নেই। জেভার্তের কঠোর, নিষ্ঠুর, অনমনীয় স্বরূপের সঙ্গে পরিচিত যে কোনও লোক তাকে এখন দেখলে বুঝতে পারবে সে একটা বড় রকমের আত্মিক সংকটে ভুগছে। এখন যেন তার গোটা আত্মাটাই ফুটে উঠেছে তার চোখে-মুখে। সব আবেগপ্রবণ লোকের মতো জেভার্তেরও খুব তাড়াতাড়ি মনের ভাবের পরিবর্তন হয়। তখন তার আচরণটা সত্যিই রহস্যময় মনে হচ্ছিল। সে এমনভাবে ম্যাদলেনকে অভিবাদন জানাল যে ভাবের মধ্যে বিন্দুমাত্র ক্রোধ বা বিতৃষ্ণা ছিল না। সে ম্যালেনের সামনে থেকে কয়েক পা দূরে সামরিক কায়দায় ধৈর্য ধরে সমভরে দাঁড়িয়ে রইল। টুপিটা হাতে নিয়ে নম্র নীরব আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে সে দাঁড়িয়ে ছিল। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন একজন সৈনিক তার ঊর্ধ্বতন অফিসারের সামনে দাঁড়িয়ে আছে, আবার একই সঙ্গে মনে হচ্ছিল কোনও অপরাধী আসামি যেন দাঁড়িয়ে আছে তার বিচারকের সামনে। কখন দয়া করে মেয়র তার দিকে তাকাবে তার জন্য নীরবে অপেক্ষা করছে সে। তার পাথরের মতো কঠিন মুখখানায় একমাত্র এক ব্যাপ্ত বিষাদ ছাড়া অতীতের আর কোনও আবেগানুভূতির চিহ্নমাত্র নেই। তার সমস্ত চেহারাটার মধ্যে তখন ফুটে উঠেছিল এক উদ্ধত আনুগত্য আর পরাভূত বীরত্বের এক মিশ্রিত ভাব।
অবশেষে হাত থেকে কলমটা নামিয়ে ম্যাদলেন প্রশ্ন করল, কী বলবে জেভার্ত? জেভাৰ্ত একমুহূর্ত কী ভেবে নিয়ে বিষাদগম্ভীর কণ্ঠে বলল, এক দারুণ শৃঙ্খলাভঙ্গের ঘটনা ঘটে গেছে মঁসিয়ে।
কী ধরনের শৃঙখলভঙ্গ?
নিম্নপদস্থ এক সরকারি কর্মচারী একজন ম্যাজিস্ট্রেটের প্রতি দারুণ অশ্রদ্ধার ভাব দেখিয়েছে এবং তাকে অপমান করেছে। আমি কর্তব্যের খাতিরে আপনাকে জানাতে এসেছি।
ম্যাদলেন প্রশ্ন করল, দোষী কে?
জেভার্ত বলল, আমি নিজে।
তুমি?
হ্যাঁ।
সেই ম্যাজিস্ট্রেট কে যার প্রতি অসদাচরণ করা হয়েছে?
আপনিই সেই ম্যাজিস্ট্রেট, মঁসিয়ে মেয়র।
চমকে উঠল ম্যাদলেন। চোখ দুটো নামিয়ে বলে চলল জেভাৰ্ত, আমি আপনার কাছে অনুরোধ জানাতে এসেছি আপনি কর্তৃপক্ষের কাছে আমাকে বরখাস্ত করার জন্য সুপারিশ করুন।
ম্যাদলেন মুখ তুলে কী বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু জেভার্ত তাকে বলার সুযোগ না দিয়েই বলতে লাগল, আপনি হয়তো বলতে পারেন আমি তো পদত্যাগ করতে পারি। কিন্তু সেটা যথেষ্ট হবে না। পদত্যাগ করাটা সম্মানের ব্যাপার। কিন্তু অপরাধ করেছি এবং তার জন্য আমার শাস্তি পাওয়া উচিত। আমাকে বরখাস্ত করা উচিত।
