জেতার্ত চলে গেলে ম্যালেন এবার ফাঁতিনের কাছে গিয়ে ধীরে ধীরে বলতে লাগল, তুমি যা বলেছ আমি সব শুনেছি। আমাকে এ সব কথা জানানো হয়নি। তবু আমি তোমার কথা বিশ্বাস করি। আমি জানতামই না তুমি কাজ ছেড়ে দিয়েছ। তুমি আমার কাছে গিয়ে আবেদন করনি কেন? যাই হোক, আমি তোমার ঋণ শোধ করে দেব এবং তোমার মেয়েকে আনার অথবা তার কাছে তোমার যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেব। তুমি এখানে থাকবে অথবা প্যারিসে ইচ্ছা করলে যেতে পারবে। তুমি না চাইলে তোমাকে কাজ করতে হবে না, তোমার যা টাকা লাগবে আমি দেব। তুমি আবার সত্তাবে জীবনযাপন করে সুখী হতে পারবে। তুমি যা বলেছ তা যদি সত্যি হয় এবং তাতে আমার কোনও সন্দেহ নেই, তা হলে তুমি ঈশ্বরের চোখে সৎ এবং খাঁটি।
ফাঁতিনে আর সহ্য করতে পারছিল না। সে কসেত্তেকে ফিরে পাবে। বর্তমানের এই ঘৃণ্য জীবন থেকে মুক্তি পাবে। সে স্বাধীনভাবে কসেত্তেকে নিয়ে সুখে জীবনযাপন করতে পারবে। তার দুঃখের অন্ধকারে এই স্বর্গসুখের সম্ভাবনা সহ্য করতে পারছিল না সে। সে শুধু অবাক হয়ে ম্যালেনের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার পা দুটো কাঁপছিল। সে কোনওরকমে নতজানু হয়ে ম্যালেনের একটা হাত টেনে নিয়ে তার ঠোঁটের উপর চেপে ধরল।
তার পর মূৰ্ছিত হয়ে প্যল ফাঁতিনে।
১.৬ কারখানার হাসপাতালে
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ
মঁসিয়ে ম্যাদলেন ফাঁতিনেকে কারখানার হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করে নার্সদের দেখাশোনা করতে বলল। তার গায়ে তখন দারুণ জ্বর এবং রাত্রিতে প্রলাপ বকতে লাগল জ্বরের ঘোরে। পরে সে ঘুমিয়ে পড়ল।
পরদিন দুপুরে তার ঘুম ভাঙলে সে বুঝতে পারল তার বিছানার পাশে কার নিশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে। মশারিটা একটু তুলে দেখল মঁসিয়ে ম্যাদলেন তার মাথার দিকের দেয়ালের উপর একটি ক্রুশবিদ্ধ যিশুর মূর্তির তলায় দাঁড়িয়ে বেদনার্ত দৃষ্টিতে সেই মূর্তির দিকে তাকিয়ে আছে।
এখন ফাঁতিনের চোখে মঁসিয়ে ম্যাদলেন একেবারে বদলে গেছে। তার মনে হচ্ছিল ম্যালেনের গোটা চেহারাটা এক স্বর্গীয় জ্যোতিতে জ্যোতির্ময় হয়ে উঠেছে। তার ঠোঁট দুটো কাঁপছিল। ফাঁতিনে কোনও বাধা সৃষ্টি না করে ম্যালেনের দিকে নীরবে তাকিয়ে রইল। অবশেষে সে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করল, আপনি কী করছেন?
ম্যাদলেন সেইখানে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়েছিল। ফাঁতিনের ঘুম ভাঙার জন্য অপেক্ষা করছিল সে। ফাঁতিনের ঘুম ভেঙেছে দেখে তার হাতটা ধরে নাড়ি টিপে বলল, এখন কেমন আছ?
ফাঁতিনে বলল, এখন ভালো বোধ করছি। আমার ঘুম ভালো হয়েছে। আমার মনে হয় আমি ভালো হয়ে গেছি। মারাত্মক কিছু হয়নি।
ম্যাদলেন এবার ফাঁতিনের প্রশ্নটার জবাব দিয়ে বলল, আমি তোমার জন্য প্রার্থনা করছিলাম।
গতকাল রাত থেকে আজকের সারা সকাল ফাঁতিনে সম্বন্ধে সব খবরাখবর সগ্রহ করেছে। তার সকরুণ জীবনকাহিনীর সব জেনেছে। সে বলল, তুমি বড় কষ্ট ভোগ করেছ মেয়ে। তবে আর কোনও কষ্ট তোমার থাকবে না। সব ক্ষতি পূরণ হয়ে যাবে। এইভাবে যে দুঃখভোগের মধ্য দিয়ে মানুষ সেন্ট হয় তার জন্য অপরকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। যে নরকযন্ত্রণা তুমি ভোগ করেছ সে নরকই স্বর্গের দ্বারপথ। সেই নরকের মধ্য দিয়ে তোমাকে স্বর্গে যেতে হবে।
ম্যাদলেন দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ফাঁতিনে তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
গতরাত্রিতেই জেতার্ত একটা চিঠি নিয়ে সকাল হতেই ডাকঘরে যায় চিঠিটা ফেলতে। চিঠিটা প্যারিসের পুলিশ বিভাগের সচিবের কাছে লেখা। পুলিশ ফাঁড়িতে গতকাল যে ঘটনা ঘটেছে তা শহরে জানাজানি হয়ে যায়। তাই সে ডাকঘরে চিঠি ফেলতে গেলে ডাকঘরের লোকরা ভাবল সে পদত্যাগপত্র পাঠাচ্ছে।
মঁসিয়ে ম্যাদলেন থেনার্দিয়েরকে একখানি চিঠি দিল। সে তিনশো ফ্ৰাঁ পাঠিয়েছে। চিঠিতে লিখে দিল একশো ফ্রাঁ ঋণের টাকা কেটে নিয়ে বাকি টাকায় সে ফাঁতিনের মেয়েকে দিয়ে যাবে মন্ত্রিউলে।
সে চিঠি পেয়ে থেনার্দিয়ের আশ্চর্য হয়ে গেল। সে বলল, হা ভগবান! মেয়েটাকে এখন পাঠানো চলবে না। এ যে দেখছি সোনার খনি। বুঝতে পেরেছি কী হয়েছে। মনে হয় কোনও ধনী লোক ওর মার প্রেমে পড়েছে।
থেনার্দিয়ের চিঠির জবাবে মোট পাঁচশো ফ্রাঁ দাবি জানাল। লিখল, ডাক্তার দেখাতে ও তার রোগ সারাতে অনেক খরচ হয়েছে। আসলে ওর মেয়েদের ডাক্তারখরচের সব বিলগুলোর কথা উল্লেখ করল। শেষে তিনশো ফ্রাঁ পেয়েছে সেটাও জানাল।
ম্যাদলেন আরও তিনশো ফ্ৰাঁ পাঠিয়ে কসেত্তেকে তাড়াতাড়ি পাঠাতে লিখে দিল।
থেনার্দিয়ের তা পেয়ে বলল, বয়ে গেছে আমাদের পাঠাতে।
এদিকে ফাঁতিনে তখনও হাসপাতালেই ছিল। তার রোগ সারেনি। হাসপাতালের নার্সরা প্রথমে ঘৃণার চোখে দেখত তিনেকে। এইসব অধঃপতিত মেয়েকে তারা ভালো চোখে দেখে না। কিন্তু ফাঁতিনের স্র স্বভাব এবং ভদ্র আচরণ দেখে নার্সরা সন্তুষ্ট হল। তাছাড়া তারা যখন দেখল ফাঁতিনে এক সন্তানের জননী তখন তাদের মমতা হল তার ওপর। জ্বরের ঘোরে প্রলাপ বকার সময় ফাঁতিনে একবার বলে, আমি পাপ করেছি ঠিক, কিন্তু আমার সন্তান আমার কাছে এলে বুঝব ঈশ্বর আমাকে ক্ষমা করেছে। আমি নোংরা
জীবনযাপন করার জন্যই তাকে কাছে রাখতে পারিনি। আমি তার জন্যই, তার ব্যয়ভার। বহনের জন্যই কুপথে নেমেছি। সে এখানে এলে বুঝব ঈশ্বরের আশীর্বাদ আমি পেয়েছি। তার নিষ্পাপ মুখ দেখে আমি জোর পাব মনে। আমার জীবনে কী ঘটেছে না ঘটেছে তার কিছুই জানে না সে। দেবদূতের মতো সরল নিষ্পাপ সে। তার বয়সে আমাদেরও দেবদূতের মতো পাখা ছিল।
