আর কাঁদছিল না ফাঁতিনে। তার চোখে জল ছিল না। তার কণ্ঠটা শান্ত ও নরম ছিল। সে জেভার্তের রুক্ষ হাতটা টেনে নিয়ে তার গলার উপর রাখল। তার পর আলুথালু পোশাকটা ঠিক করে নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। পুলিশদের বলল, ইন্সপেক্টার আমাকে যেতে বলেছেন।
দরজার খিলটা খুলতেই একটা শব্দ হল।
জেভার্ত এতক্ষণ পাথরের মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে মেঝের উপর দৃষ্টি রেখে দাঁড়িয়েছিল অন্য মনে। তার কোনও বিছু খেয়াল ছিল না। খিল খোলার শব্দে তার চমক ভাঙল। হিংস্র জন্তুর মতো সে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে চোখ তুলে তাকাল ফাঁতিনের দিকে।
জেভার্ত পুলিশদের বাল, সার্জেন্ট, দেখছ না মেয়েটা পালাচ্ছে? কে তাকে যেতে বলেছে?
ম্যাদলেন বলল, আমি বলেছি।
জেভার্তের কথা শুনে ফাঁতিনে দরজার খিল ছেড়ে পেছন ফিরে দাঁড়াল। যেন চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে গেছে।
ম্যাদলেনের কথা শুনে সে এবার তার পানে তাকাল। তার বিস্মিত ব্যথাহত চোখের দৃষ্টি পালাক্রমে জেভার্ত আর মাদলেনের মধ্যে ঘোরাফেরা করতে লাগল।
জেভার্ত যখন সার্জেন্টকে কড়া গলায় হুকুম দিয়েছিল তখন সে কি মেয়রের উপস্থিতির কথা জানত না? অথবা সে কি মনে ভেবেছিল এ ধরনের কথা মেয়রের মতো একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি বলতে পারেন না এবং যেন ভুল করে এ কথা বলে ফেলেছেন? সে কি ভেবেছিল এই মুহূর্তে সমস্ত নীতি, ন্যায়বিচার, সরকার, আইন, সমাজ সব মূর্ত হয়ে উঠেছে শুধু তারই মধে?
সে যাই হোক, মঁসিয়ে ম্যালেনের কথা শুনে জেভার্ত এবার তার দিকে ধীরে পায়ে এগিয়ে গেল। তার মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল। ঠোঁটটা নীল হয়ে উঠেছিল। এক মৃদু কম্পনে শরীরটা কাঁপছিল তার। চোখ দুটো নামিয়ে অথচ দৃঢ় কণ্ঠে সে বলল, মঁসিয়ে মেয়র, তা তো হতে পারে না।
মঁসিয়ে ম্যাদলেন বলল, কেন হতে পারে না?
জেভার্ত বলল, কারণ এ নারী একজন বিশিষ্ট নাগরিককে অপমান করেছে।
ম্যাদলেন শান্ত কণ্ঠে বলল, শুনুন ইন্সপেক্টার জেতার্ত, আমি জানি আপনি একজন সম্মানিত ব্যক্তি, ব্যাপারটা আমি আপনাকে বুঝিয়ে বলছি। আসল ঘটনাটা হল এই। আপনি যখন একে ধরে আনছিলেন আমি তখন রাস্তা পার হচ্ছিলাম। তখন সেখানে কিছু লোক দাঁড়িয়েছিল। আমি তাদের জিজ্ঞাসা করি, কী হয়েছে। আমি সব কথা শুনেছি। যে নাগরিককে এ অপমান করেছে, দোষটা তার। আইন অনুসারে তাকেই গ্রেপ্তার করা উচিত।
জেভার্ত জোর দিয়ে বলল, কিন্তু এই শহরের মেয়র আপনাকেও অপমান করেছে।
মাদলেন বলল, সেটা আমার অপমান, আমার এক ধরনের সম্পত্তি। আমি তা নিয়ে যা খুশি করতে পারি।
জেভার্ত বলল, মাপ করবেন মঁসিয়ে মেয়র। অপমান শুধু আপনাকে নয়, ন্যায়বিচারকেই ও অপমানিত করেছে।
বিবেকই সবচেয়ে বড় বিচারক মঁসিয়ে জেভার্ত। আমি মেয়েটির সব কথা শুনেছি এবং আমি কী করেছি আমি তা জানি।
আমি নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছি না মঁসিয়ে মেয়র।
তা হলে আমার কথামতো কাজ করুন।
আমাকে আমার কর্তব্য করতে হবে। আমার কর্তব্য হল ওকে ছয় মাসের জন্য জেলে পাঠানো।
ম্যাদলেন তবু শান্ত কণ্ঠে বলল, আপনাকে এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে হবে। ও একদিনের জন্যও জেলে যাবে না।
ম্যালেনের কথাগুলোতে জেভার্ত আরও সাহস পেয়ে গেল। সে শ্রদ্ধার সঙ্গে ম্যালেনের পানে তাকিয়ে বলতে লাগল, মেয়রের সঙ্গে এ ব্যাপারে তর্ক করতে আমার বড় খারাপ লাগছে। এ ধরনের ঘটনা এর আগে কখনও ঘটেনি। কিন্তু আমি মঁসিয়ে মেয়রকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, আমি আমার ক্ষমতা অনুসারেই কাজ করছি। নাগরিকদের স্বার্থ দেখাই আমাদের কাজ। আমি সেখানে ছিলাম। মেয়েটি মঁসিয়ে বামাতাবয়কে মারধর করেছে। মঁসিয়ে বামাতাবয় একজন নাগরিক, নির্বাচকমণ্ডলীর তালিকায় তাঁর নাম আছে, এক তিনতলা বাড়ির মালিক। এ ব্যাপারটা পুলিশ আইনের আওতায় পড়ে। আমি তাই ফাঁতিনেকে ধরেছি।
এ কথায় মঁসিয়ে ম্যাদলেন হাত দুটো জড়ো করে এমন গলায় কথা বলতে লাগল, যা এর আগে কেউ কখনও শোনেনি। সে বলল, আপনি যে আইনের কথা বললেন সেটা মিউনিসিপ্যাল পুলিশের আইন এবং সেটা হল অপরাধবিধির নয়, এগারো, পনেরো আর ছেষট্টি ধারা এবং তার ওপর আমার পূর্ণ কর্তৃত্ব আছে। আমি সেই ধারা বলে মেয়েটিকে ছেড়ে দিতে বলছি।
জেভার্ত একবার শেষ চেষ্টা করে দেখল। বলল, কিন্তু মঁসিয়ে মেয়র
ম্যাদলেন বলল, আমি আপনাকে ১৭৯৯ সালের ১৩ ডিসেম্বর পাস করা আইনের একাশি ধারার কথাও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি যাতে কাউকে আটক রাখা যায়।
আমার কথা শুনুন মঁসিয়ে মেয়র।
খুব হয়েছে। এটাই যথেষ্ট বলে মনে করি।
কিন্তু–
আপনি দয়া করে এখান থেকে চলে যান।
জেতার্ত একজন কর্তব্যরত রুশ সৈনিকের মতো শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার পর মাথাটা একবার নুইয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ফাঁতিনে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল আর শুনছিল। সে আশ্চর্য হয়ে জেভার্তের যাওয়ার পথ করে দিল।
তার অন্তরেও তখন জোর আলোড়ন চলছিল। সে দেখেছে তাকে নিয়ে দু জন পদস্থ লোকের কত তর্ক-বিতর্ক হয়েছে। এই দু জন লোকের ওপর তার স্বাধীনতা, তার মেয়ের জীবন নির্ভর করছিল। একজন তাকে গভীরতর অন্ধকারে টেনে নিয়ে যেতে চাইছিল আর একজন তাকে আলোর দিকে নিয়ে যেতে চাইছিল। সে ভয়ে ভয়ে লক্ষ করছিল এই দু জন শক্তিশালী পুরুষ দৈত্যের মতো বাকযুদ্ধ করছিল–একজন দৈত্যের মতো কথা বলছিল আর একজন দেবদূতের মতো কথা বলছিল। অবশেষে দেবদূতই জয়লাভ করে। সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা এই যে, যে দেবদূত তাকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করে সে হল তার চোখে সেই ঘৃণ্য মেয়র যাকে সে তার সকল দুঃখকষ্টের মূল কারণ হিসাবে ভেবে এসেছে। সে অপমান করা সত্ত্বেও সেই মেয়রই তাকে উদ্ধার করল। তবে সে কি অন্যায় করেছে? তবে কি তার অন্তরের পরিবর্তন করতে হবে? সে দাঁড়িয়ে কাঁপতে লাগল আর ম্যাদলেনের পানে বিহ্বল দৃষ্টিতে তাকাতে লাগল। ক্ৰমে ম্যালেনের প্রতি তার ঘৃণার পাথরটা গলে যেতে লাগল। তার পরিবর্তে এক শ্রদ্ধা আর বিশ্বাসের অনুভূতি জাগতে লাগল।
