আধখোলা বুকের উপর হাত দুটো জড়ো করে নতজানু হয়ে কথা বলছিল ফাঁতিনে আর মাঝে মাঝে কাশছিল। তার চোখ জলে ভরে গিয়েছিল। চরম দুঃখ থেকে এমন এক জ্যোতি নির্গত হয়, যা যে কোনও মানুষের অসহায় ও শোচনীয় অবস্থাকেও কিছুটা রূপান্তরিত করে তোলে। ফাঁতিনে যখন সামনের দিকে ঝুঁকে জেভার্তের কোটের প্রান্তভাগটাকে তার ঠোঁটের উপর ঠেকিয়ে কথা বলছিল তখন তাকে সত্যিই সুন্দর দেখাচ্ছিল। তার মর্মবিদারক কথা শুনে যে কোনও পাথরের অন্তর গলে যেত, কিন্তু কাঠের অন্তর কখনও গলে না।
জেতার্ত বলল, আমি তোমার সব কথা শুনেছি। আর কিছু তোমার বলা আছে? এবার তুমি যেতে পার। তোমাকে ছয় মাসের কারাদণ্ড ভোগ করতেই হবে। স্বয়ং পরম পিতা ঈশ্বরও এ দণ্ড মকুব করতে পারবেন না।
পরম পিতার নাম শুনে ফাঁতিনে বুঝল জেভার্তের দেওয়া দণ্ড চূড়ান্ত। সে মেঝের উপর পড়ে গেল। তার মুখ থেকে শুধু একটা কথা বেরিয়ে এল, দয়া, দয়া কর।
জেভার্ত তার দিকে পেছন ফিরল এবং দু জন পুলিশ ফাঁতিনেকে নিয়ে যাওয়ার জন্য ধরল।
কয়েক মিনিট আগে একজন লোক সকলের অলক্ষে ঘরে ঢুকে নীরবে দাঁড়িয়ে তিনের দুঃখের কথা শুনছিল। ফাঁতিনের কাতর আবেদনের সব কথা শুনেছিল সে। পুলিশরা যখন ফাঁতিনেকে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল তখন সে এগিয়ে এল। সে জেভার্তকে লক্ষ করে বলল, একমুহূর্ত একটু অপেক্ষা করবেন?
জেতার্ত মুখ ফিরিয়ে দেখল, মঁসিয়ে ম্যাদলেন কথা বলছে। সে টুপিটা খুলে একটু নত হয়ে বলল, মাপ করবেন মঁসিয়ে মেয়র।
ম্যাদলেনের কথা শুনে সঙ্গে সঙ্গে উঠে পড়ল ফাঁতিনে। সে উঠে দাঁড়িয়ে ম্যালেনের সামনে এসে বলল, তুমিই মেয়র?
পাগলের মতো হাসতে হাসতে ম্যালেনের মুখের উপর থুতু ফেলল।
ম্যাদলেন তার মুখ থেকে থুতুটা মুছে বলল, ইন্সপেক্টর জেভাৰ্ত, এই মেয়েটিকে ছেড়ে দিতে হবে। কথাটা শুনে জেভার্তের মনে হল সে পাগল হয়ে যাবে। এমন সব ভয়ঙ্কর আবেগের আঘাতে তার অন্তর আন্দোলিত হতে লাগল, যা এর আগে কখনও সে অনুভব করেনি। শহরের একটা সামান্য মেয়ে মুখের উপর থুতু ফেলবে, এটা তার কল্পনাতীত। এটা সে ভাবতেই পারে না। সঙ্গে সঙ্গে তার মনে একটা অস্পষ্ট ধারণা হল হয়তো এই মেয়েটির সঙ্গে মেয়রের একটা অবৈধ সম্পর্ক ছিল এবং মেয়র নিজেই প্রকটিত করে তুললেন সেই গোপন সম্পর্কটা। কিন্তু যখন সে দেখল মেয়র শান্তভাবে মুখ থেকে থুতু মুছে মেয়েটাকে ছেড়ে দিতে বলল তখন বিস্ময়ে স্তম্ভিত হয়ে গেল সে।
ফাঁতিনেও কম আশ্চর্য হয়নি। সে গলার স্বরটাকে নিচু করে বলতে লাগল, আমাকে ছেড়ে দেওয়া হবে? ছয় মান জেলভোগ করতে হবে না? কিন্তু কথাটা কে বলল? একথা কেউ বলতে পারে না। আমি নিশ্চয় ভুল শুনেছি। এ কথা নিশ্চয় ওই দানব মেয়র বলেনি। হে সদাশয় মঁসিয়ে জেভাৰ্ত, আপনিই কি বললেন আমাকে ছেড়ে দেওয়া হবে? আমি সব কথা বলব, তা হলে আপনি আমাকে ছেড়ে দেবেন। এই সবকিছু ওই শয়তান মেয়রটার জন্যই হয়েছে। কয়েকজন মেয়ের কথা শুনে ও আমায় চাকরি থেকে ছাড়িয়ে দেয়। এক সৎ মেয়ে-শ্রমিককে অকারণে বরখাস্ত করাটা কি এক ঘৃণ্য কাজ নয়? চাকরি না থাকার জন্য আমি কিছু রোজগার করতে পারতাম না এবং তার থেকেই যত বিপত্তির উৎপত্তি হয়। তবে পুলিশেরও কিছু করার আছে। জেলখানার কন্ট্রাক্টাররা কম টাকায় বাইরের গরিব মেয়েদের বেশি খাঁটিয়ে অবিচার করে তাদের প্রতি। এটা পুলিশ বন্ধ করতে পারে। আগে আমরা জামা সেলাই করে দিনে বারো স্যু করে পেতাম। পরে ওরা তা কমিয়ে নয় স্যু করে। আমার মেয়ে কসেত্তের কথা আমায় ভাবতে হত, তাই আমাকে কুপথে নামতে হয়। তা হলে এবার দেখতে পাচ্ছেন মেয়রই এই সবকিছুর মূলে? ঘটনাক্রমে আমি ওই কাফের বাইরে ভদ্রলোকের টুপিটা ঘুষি মেরে খারাপ করে দিই, কারণ আমার ঘাড়ে বরফ চাপিয়ে দিয়েছিল। আমি কিন্তু সত্যি সত্যিই কারও ক্ষতি করতে চাইনি। আমার থেকে কত খারাপ মেয়ে ভালো অবস্থার মধ্যে আছে। আপনি সবাইকে আমার কথা জিজ্ঞাসা করতে পারেন। আমার বাড়িওয়ালাকে জিজ্ঞাসা করে দেখবেন আমি নিয়মিত ভাড়া দিয়ে যাই। আমি সৎ।
মঁসিয়ে ম্যাদলেন এতক্ষণ ফাঁতিনের সব কথা মন দিয়ে শুনছিল। ফাঁতিনে যখন কথা বলছিল তখন সে তার পকেট থেকে টাকার ব্যাগটা বার করে। কিন্তু দেখে ব্যাগটা খালি। পকেটের মধ্যে ব্যাগটা রেখে সে ফাঁতিনেকে বলল, কত টাকা তোমার দেনা আছে বললে?
ফাঁতিনে এতক্ষণ জেভার্তকে লক্ষ করে কথা বলছিল। সে এবার মুখ ফিরিয়ে ম্যাদলেনকে বলল, আমি তোমার সঙ্গে কথা বলছি।
ফাঁতিনে এবার জেভাৰ্তকে বলল, আপনি দেখলেন আমি ওর মুখের উপর থুতু ফেলেছি।
এবার ম্যালেনের দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি অসভ্য, তুমি আমাকে ভয় দেখাতে চেয়েছ। কিন্তু তোমার ভয়ে আমি ভীত নই। আমি শুধু মঁসিয়ে জেতার্তকে ভয় করি।
ফাঁতিনে এবার জেভার্তকে লক্ষ্য করে বলতে লাগল, মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করাই উচিত। আমি জানি, আপনি ভালো লোক। আসলে ব্যাপারটা এমন কিছু নয়। একটা লোক একটি মেয়ের ঘাড়ে বরফ দেয় আর তা নিয়ে অফিসাররা হাসাহাসি করে। মেয়েদের এসব সহ্য করতে হয়। তার পর আপনি এলেন, শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখাই আপনাদের কর্তব্য। আমি গোলমাল করায় আপনি আমাকে ধরে নিয়ে এলেন। তার পর আমার কাতর আবেদন শুনে আমার মেয়ের কথা ভেবে আমার ওপর দয়া করে আমাকে ছেড়ে দিলেন। আপনি আমাকে বলতে পারেন, এ কাজ আর কখনও করো না। আমি বলছি, এ কাজ আর কখনও আমি করব না। শুধু এবারকার মতো আমাকে ক্ষমা করুন। আচমকা বরফটা দেওয়ায় আমার মেজাজটা গরম হয়ে ওঠে। আমার শরীরটা ভালো নেই। আমার কাশি হচ্ছে। ভেতরটা যেন জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে। আমার গাঁয়ে হাত দিয়ে দেখতে পারেন।
