গোলমাল শুনে কাফের ভেতর থেকে অফিসাররা ছুটে এল। ধস্তাধস্তি করতে থাকা একজন নারী আর একজন পুরুষকে ঘিরে একদল জড়ো হয়ে হাসাহাসি করতে লাগল। লোকটা আত্মরক্ষার চেষ্টা করছিল আর ফাঁতিনে তাকে চড়-লাথি মারছিল আর চিৎকার করছিল উন্মাদের মতো।
সহসা ভিড়ের মধ্য থেকে একজন লম্বা লোক এগিয়ে এসে ফাঁতিনের একটা হাত ধরে ফেলল। ফাঁতিনের পোশাকের উপর কাদা লেগে ছিল। যে লোকটি ফাঁতিনের হাত ধরেছিল সে তাকে বলল, তুমি আমার সঙ্গে এস। লোকটিকে দেখে চুপ করে গেল ফাঁতিনে। প্রচণ্ড রাগে আগুন হয়ে থাকা মুখখানা সহসা ম্লান হয়ে গেল আর ভয়ে কাঁপতে লাগল। সে চিনতে পেরেছিল লোকটি জেভাৰ্ত, পুলিশের লোক।
সুযোগ বুঝে মঁসিয়ে বামাতাবয় এক ফাঁকে তাড়াতাড়ি পালিয়ে গেল।
.
১৩
কৌতূহলী দর্শকদের ভিড় সরিয়ে জেতার্ত ফাঁতিনেকে টানতে টানতে কাছাকাছি একটা পুলিশ ফাঁড়ির দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। ফাঁতিনে কোনও বাধা দিল না। কেউ কোনও বাধা দিল না। দর্শকরা আনন্দে চিৎকার করতে করতে তাদের অনুসরণ করতে লাগল। দর্শকদের কুৎসিত আনন্দ দেখে চরম অপমান আর লজ্জাবোধ করতে লাগল ফাঁতিনে।
পুলিশ ফাঁড়ি রাস্তার ধারে একটা ঘর। ঘরের দরজাটা ছিল রাস্তার দিকে। ঘরের ভেতর একটা স্টোভ জ্বলছিল। ঘরের ভেতর তিনেকে নিয়ে ঢুকেই দরজাটা বন্ধ করে দিল জেভার্ত। এতে দর্শকরা হতাশ হল। দর্শকরা ঘাড় উঁচু করেও কিছু দেখতে পেল না।
ঘরের এক কোণে ফাঁতিনে গিয়ে ভীতসন্ত্রস্ত এক জন্তুর মতো বসে রইল। অফিসে যে সার্জেন্ট কর্তব্যরত ছিল সে একটা বাতি জ্বালিয়ে টেবিলের উপর রাখল। জেভার্ত পকেট থেকে একটা সাদা কাগজ বার করে কী লিখতে লাগল।
দেশের প্রচলিত আইন অনুসারে এই ধরনের মেয়েরা সম্পূর্ণ পুলিশের দয়ার ওপর নির্ভর করে। পুলিশ তাদের যে কোনও শাস্তি দিতে পারে, তাদের ব্যক্তিস্বাধীনতা একেবারে কেড়ে নিতে পারে। জেভার্তের মনে চিন্তার আলোড়ন চলতে থাকলেও তার মুখে কোনও আবেগের চিহ্নমাত্র ছিল না। এসব ক্ষেত্রে সে পুরোপুরি তার বিবেকের নির্দেশে চলতে পারে, কোনও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে কোনও নির্দেশ চাইতে হবে না। এই অফিসের চেয়ারটাই হল বিচারপতির আসন। এই চেয়ারে বসেই সে আসামির বিচার করে রায় দেবে। সে অনেক চিন্তা-ভাবনা করে দেখল এটা একটা অপরাধ। মঁসিয়ে বামাতাবয় তার চোখে সমাজের এমনই এক গণ্যমান্য লোক যিনি এক তিনতলা বাড়ির মালিক এবং যার ভোটাধিকার আছে। এই ধরনের এক বিশিষ্ট নাগরিককে সমাজবহির্ভূতা এক বারবণিতা মারধর করেছে। জেভার্ত নিজে তা দেখেছে। সে আপন মনে লিখে যেতে লাগল।
তার লেখা শেষ হলে তাতে সই করে কাগজটা ভাজ করে সার্জেন্টের হাতে দিয়ে বলল, রক্ষীকে দিয়ে এই মেয়েটাকে জেলে পাঠিয়ে দাও।
এরপর সে ফাঁতিনের দিকে ঘুরে বলল, তোমাকে ছয় মাসের জন্য জেলে যেতে হবে। নিবিড় হতাশার সঙ্গে চিৎকার করে উঠল, ছয় মাস! ছয় মাস জেল! সারাদিনের। খাটুনির বিনিময়ে মাত্র সাত সু? কসেত্তের কী হবে? আমার মেয়ের কী হবে? মঁসিয়ে ইন্সপেক্টর, আপনি কি জানেন থেনার্দিয়েরের কাছে আমার একশো ফ্রাঁ ঋণ আছে?
জোড়হাত করে মেঝের উপর নতজানু হয়ে বসল ফাঁতিনে। তার পর বলতে লাগল, মঁসিয়ে জেভাৰ্ত, আমাকে দয়া করুন। এটা আমার দোষ নয়। আপনি যদি জানতেন ব্যাপারটার মূল কারণটা কী। আমি ঈশ্বরের নামে শপথ করে বলছি আমার কোনও দোষ নেই। একজন ভদ্রলোক যাকে আমি চিনি না, আমার ঘাড়ের উপর বরফ দেয়। আপনি দেখছেন আমার শরীর ভালো নেই। তার পর সে যত সব অবাঞ্ছিত অন্যায় কথা বলতে থাকে। সে বলে আমি দেখতে কুৎসিত এবং আমার দাঁত নেই, যেন আমি এসব জানি না। কিন্তু আমি কিছু বলিনি। আমি ভাবছিলাম ও আমাকে ঠাট্টা করছে। আমি নীরবে হাঁটছিলাম এমন সময় আমার ঘাড়ের উপর বরফ চাপিয়ে দেয়। মঁসিয়ে জেভাৰ্ত, যা ঘটেছিল তা বলার মতো কি কেউ নেই? আমার অবশ্য রেগে যাওয়াটা অন্যায় হয়েছিল, কিন্তু এই ধরনের ঘটনা যদি ঘটে, যদি কেউ অপ্রত্যাশিতভাবে আপনার ঘাড়ের উপর বরফ চাপিয়ে দেয় তা হলে আপনি নিশ্চয় আত্মবিস্মৃত হয়ে সব সংযম হারিয়ে ফেলতেন। ভদ্রলোকের টুপিটা নষ্ট করে দেওয়া আমার উচিত হয়নি। কিন্তু উনি কেন পালিয়ে গেলেন? উনি থাকলে আমি ক্ষমা চাইতাম, যদিও ক্ষমা চাওয়ার মন আমার নেই। মঁসিয়ে জেভাৰ্ত, এবারকার মতো আমাকে ছেড়ে দিন। আমার মনে হয় আপনি জানেন না জেলখানার খাটুনির জন্য প্রতিদিন মাত্র সাত স্যু করে দেওয়া হয়। আমার একশো ফ্ৰাঁ ধার আছে এবং তা না দিতে পারার জন্য আমার বাচ্চা মেয়েকে পথে বার করে দেওয়া হবে। অবশ্য সাত স করে দেওয়াটা সরকারের দোষ, তা বলছি না। তবে আমার এই অবস্থা। ঈশ্বর আমায় দয়া করুন। আমার মেয়েকে আমি এখন কাছে রাখতে পারি না। আমি যে ধরনের জীবনযাপন করি তাতে তাকে কাছে রাখা যায় না। আমার সন্তানের কী হবে? হোটেলমালিক থেনার্দিয়েররা ভালো লোক নয়, ওদের দয়ামায়া বা কোনও যুক্তিবোধ নেই, ওরা শুধু টাকা চায়। আমাকে জেলখানায় পাঠাবেন না। এই শীতে ওরা আমার সন্তানকে তাড়িয়ে দেবে। একটু ভেবে দেখবেন মঁসিয়ে জেতার্ত। ও যদি বড় হত তা হলে নিজের জীবিকা নিজেই অর্জন করতে পারত। কিন্তু ওর বয়স এত কম যে তা পারবে না। আমি সত্যি সত্যিই খারাপ নই। অবশ্য লোভ-লালসার জন্য আমার এ অবস্থা হয়নি। আমি অবশ্য মাদক বা নেশার পিল খাই, কিন্তু দুঃখের চাপে পড়েই তা খাই, কারণ তা আমার মনের দুশ্চিন্তাটা কাটিয়ে দেয়। আমি যেসব পোশাক পরতাম তা দেখলে আপনি বুঝতে পারতেন আমি হালকা প্রকৃতির মেয়ে ছিলাম না বা উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন করতাম না। আমি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন লিনেনের তৈরি ভদ্র পোশাক পরতাম। আমাকে দয়া করুন মঁসিয়ে জেভার্ত।
