একশো ফ্ৰাঁ কী করে জোগাড় করবে সে? দিনে নয় স্যু’র জায়গায় একশো স্যু করে রোজগার করতে হবে তাকে। তবে একটামাত্র পথ আছে। সে ভাবল, ঠিক আছে, আমি তাই করব, আমি একবার আমার দেহ বিক্রি করব।
ফাঁতিনে বারবণিতা হয়ে গেল।
.
১১
ফাঁতিনের কাহিনী হল সমাজ একটি মানুষকে কিভাবে চিনে নেয় তার কাহিনী। দারিদ্র্য, ক্ষুধা, নিঃসঙ্গতা, শীতার্ত অসহায়তা, নিরাপত্তার অভাব, নিরাশ্রয়তা প্রভৃতির হাত থেকে বাঁচার জন্য মানুষ কিভাবে নিজেকে বিলিয়ে দেয়, আত্মবিক্রীত হয় তার এক সকরুণ কাহিনী। দারিদ্র্য তাদের বিলিয়ে দেয় আর সমাজ তাদের হাত বাড়িয়ে নিয়ে নেয়।
আমাদের সমাজ যিশু খ্রিস্টের উপদেশাবলির দ্বারা অনুশাসিত হয়। কিন্তু সেটা নামে মাত্র। সে উপদেশ তারা আসলে মেনে চলে না। আমরা বলি ক্রীতদাসপ্রথা ইউরোপীয় সভ্যতা থেকে চলে গেছে, কিন্তু ক্রীতদাসপ্রথা এখনও আছে এবং সেটা শুধু মেয়েদের ক্ষেত্রেই চলে এবং তার নাম হল বেশ্যাগিরি।
এ প্রথা নারীদের ওপর পীড়ন চালায়। তাদের যৌবন, সৌন্দর্য, মাতৃত্ব সব কেড়ে নেয়। অথচ তাতে পুরুষরা কোনও লজ্জা পায় না।
যে অবস্থার মধ্যে ফাঁতিনে এখন পড়েছে তাতে আগেকার সেই ফাঁতিনে নামে সুন্দরী মেয়েটির কিছুই অবশিষ্ট নেই। তার বাইরের সৌন্দর্য আর অন্তরের সত্তা সব অদৃশ্য হয়ে গেছে। এখন সে একেবারে যেন পাথর হয়ে গেছে ভেতরে-বাইরে। এখন তাকে স্পর্শ করা মানে হিমশীতল এক পাথরের মূর্তিকে স্পর্শ করা। কোনও লোক এলে তাকে গ্রহণ করে, নিজেকে বিলিয়ে দেয় তার কাছে, কিন্তু মনে মনে তাকে উপেক্ষা করে, ঘৃণার চোখে দেখে। তার ব্যক্তিজীবন এবং সমাজজীবন শেষ কথা বলে দিয়েছে তাকে। খারাপ যা কিছু ঘটার সব ঘটে গেছে। সে সব দুঃখ জেনে গেছে, সব দুঃখ সহ্য করে সে দেখেছে, শেষ অশ্রুবিন্দুটুকু সে পাত করেছে। নিদ্রা যেমন প্রসারিত হয়ে চিরনিদ্রা বা মৃত্যুতে পরিণত হয়, তেমনি ভাগ্যের কাছে তার নীরব আত্মসমর্পণ ধীরে ধীরে এক হিমশীতল ঔদাসীন্যে পরিণত হয়। আর সে কোনও দুঃখকষ্টকে ভয় করে না, আর সে কোনও দুঃখকষ্ট থেকে পরিত্রাণ বা মুক্তি পাওয়ার ইচ্ছা বা চেষ্টা করে না। এখন যদি সমস্ত আকাশটা তার মাথায় ভেঙে পড়ে, সমুদ্রতরঙ্গ যদি ছুটে এসে তাকে গ্রাস করে তা হলেও তাতে তার কিছু যায়-আসে না।
এখন ফাঁতিনের মনে হয় ভাগ্যের বিধানে পাওয়া দুঃখ আমরা ভোগ করি, কখনও করতে পারি না একথা মনে করা ভুল। ভাগ্য যত দুঃখই দিক না কেন, আমরা তা ভোগ করতে পারি, অপরিসীম আমাদের সহনশক্তি। ভাগ্যের নিষ্ঠুরতার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সহনশক্তিও অবশ্যই বেড়ে যায়।
কিন্তু এই ভাগ্য কী? কোথায় আমাদের নিয়ে যায় সে ভাগ্য? এই ভাগ্য কারও ওপর সুপ্রসন্ন আর কারও ওপর অপ্রসন্ন হয় কেন? এ প্রশ্নের উত্তর একমাত্র ঈশ্বরই দিতে পারেন।
.
১২
মন্ত্রিউল-সুর-মেরের মতো ছোট শহরে একশ্রেণির যুবক আছে যারা তাদের বছরে পনেরো হাজার ফ্ৰাঁ বাজে খরচ করে উড়িয়ে দেয়। প্যারিসে পিয়ার বা জমিদাররা বছরে আড়াই হাজার ফ্ৰাঁ বাজে খরচ করে। এই ধরনের লোকরা সাধারণত বড় অপদার্থ এবং অলস প্রকৃতির হয়। তারা কোনওরকমে একবার কিছু টাকা রোজগার করলেই হোটেলে ঘুরে বেড়ায় আর বড় বড় কথা বলে। তারা কখনও শিকার করে, কখনও বিলিয়ার্ড খেলে আর যখন-তখন মদ খায়। আসলে সারা জীবনের মধ্যে ভালো-মন্দ কাজই করে না, শুধু বাজে কাজে ঘুরে বেড়িয়ে জীবনটাকে নষ্ট করে।
মঁসিয়ে ফেলিক্স থোলোমায়েস যদি প্যারিসে না এসে গাঁয়েই থাকত তা হলে ওই ধরনের এক অলস ভবঘুরে হয়ে উঠত। তবে এই ধরনের লোক গরিব হলে তাকে ভবঘুরে বলত আর ধনী হলে বলত অমিতব্যয়ী ভদ্রলোক। এই ধরনের লোকরা মোচ রাখত। গাঁয়ের ভবঘুরেরা বেশি বড় বড় মোচ রাখত। তারা হাতে একটা করে ছড়ি রাখত এবং নাটকীয় ঢঙে কথা বলত।
সে যুগে স্পেনের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আমেরিকায় প্রজাতন্ত্রের যুদ্ধ চলছিল। মোরিলোর সঙ্গে লড়াই চলছিল বলিভার। যারা ছোট কানাওয়ালা টুপি পরত আর রাজতন্ত্রের সমর্থনে কথা বলত তাদের বলা হত মোরিলো। আর যারা উদারনীতিভাবাপন্ন ছিল আর চওড়া কানাওয়ালা টুপি পরত তাদের বলা হত বলিভার।
যে ঘটনার কথা বলা হয়েছে তার আট-দশ মাস পরে ১৮২৪ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথমে কোনও এক তুষারাচ্ছন্ন সন্ধ্যায় এক অলস ভবঘুরে ধনী অফিসারদের এক কাফেতে ভালো পোশাক আর মমারিলোদের মতো টুপি পরে একটি মেয়ের সঙ্গে বসে কথা বলছিল। মেয়েটি একটি লো-কাট গাউন পরেছিল আর তার মাথায় ফুল গোঁজা ছিল।
ভদ্রলোক ধূমপান করছিল। তখনকার দিনে ধূমপান খুব শৌখিনতার পরিচায়ক ছিল। লোকটি মেয়েটার মুখে বারবার ধোয়া ছাড়ছিল আর ঠাট্টা করে কী সব বলছিল। মেয়েটির মুখখানা বিষণ্ণ ছিল। সে তখন ক্লান্ত ও অবসন্ন থাকায় সে গ্রাহ্য করছিল না লোকটাকে।
ওরা কাফের বাইরে তুষারপাতের মধ্যেই বেড়াচ্ছিল। লোকটি যখন দেখল মেয়েটি তাকে তেমন গ্রাহ্য করছে না তখন পথ থেকে একমুঠো বরফ কুড়িয়ে মেয়েটির অনাবৃত ঘাড়ের উপর দিয়ে দিল। লোকটির নাম ছিল মঁসিয়ে বামাতাবয়। মেয়েটি একবার জোরে চিৎকার করে উঠে তার হাতের নখ দিয়ে লোকটার মুখটা ছিঁড়ে-খুঁড়ে দিতে লাগল। সে বাঘিনীর মতো উগ্র রূপ ধারণ করল। তার ফোকলা মুখ থেকে যত সব নোংরা গালাগালি বার হতে লাগল। মেয়েটি হল ফাঁতিনে।
