চিঠিটা পড়ে পাগলের মতো হাসতে লাগল ফাঁতিনে। সে মার্গারিতেকে বলল, চমৎকার! চল্লিশ ফ্রাঁ কোথা থেকে পাব? ওরা কি পাগল?
জানালার ধারে দাঁড়িয়ে চিঠিটা আবার পড়ল ফাঁতিনে। তাদের সে ঘর থেকে রাস্তায় চলে গেল হাসতে হাসতে। একজন জিজ্ঞাসা করল, এত হাসির কারণ কী? ফাঁতিনে বলল, চল্লিশ ফ্র। এক গ্রামের এক গরিব চাষি চল্লিশ ফ্রাঁ চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে।
ফাঁতিনে দেখল রাস্তার উপর এক জায়গায় অনেক লোক ভিড় করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সে তখন এগিয়ে গিয়ে দেখল একটা লোক দাঁত বিক্রি করার জন্য বক্তৃতা দিচ্ছে আর তাকে ঘিরে একদল ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে। যাদের দাঁত নেই তাদের কাছে এক একটা দাঁতের সেট বিক্রি করার চেষ্টা করছে সে। তার মজার মজার কথা শুনে অনেকে হাসছিল। ফাঁতিনেও ভিড়ের মধ্যে ঢুকে হাসতে লাগল। এমন সময় সেই দাঁত বিক্রেতা
ফাঁতিনেকে বলল, তোমার দাঁতগুলো তো বেশ সুন্দর। তোমার উপরকার পাটির দুটো দাঁতের জন্য দুটো স্বর্ণমুদ্রা দেব।
ফাঁতিনে বলল, উপরকার পাটির দুটো দাঁত?
লোকটা বলল, হ্যাঁ, দুটো সোনার মুদ্রা অর্থাৎ দুটো নেপোলিয়ঁ যা ভাঙালে চল্লিশ ফ্রাঁ পাবে।
ফাঁতিনে বলল, কী ভয়ঙ্কর কথা!
একজন বুড়ি কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। সে বলল, দুটো নেপোলিয়ঁ। তোমার ভাগ্য ভালো।
ফাঁতিনে কানে আঙুল দিয়ে পালিয়ে গেল। চিৎকার করে বলতে লাগল, ভালো করে ভেবে দেখ মেয়ে। চল্লিশ ফ্রাঁ। যদি তোমার মনের পরিবর্তন হয় তা হলে আজ সন্ধ্যায় তিলাক দার্জেন্তে আমাকে পাবে।
ফাঁতিনে রাগে আগুন হয়ে একরকম ছুটতে ছুটতে তার বাসায় গিয়ে মার্গারিতেকে সব কথা বলল। সে বলল, এই ঘৃণ্য লোকটাকে কেন ঘুরে বেড়াতে দেয়? ও বলল, আমার উপরকার পাটির দুটো দাঁত তুলে নেবে। আমাকে তা হলে ভয়ঙ্করভাবে বিশ্রী দেখাবে। চুল আবার গজাবে, কিন্তু দাঁত আর বেরোবে না। মানুষ নয়, লোকটা একটা রাক্ষস। তার থেকে জানালা থেকে ঝাঁপ দিয়ে মরা ভালো। ও আবার বলল, তিলাক দার্জেন্তে ওর সঙ্গে সন্ধেবেলায় দেখা হবে।
মার্গারিতে বলল, দাম কত দেবে বলল?
ফাঁতিনে বলল, দুটো নেপোলিয়ঁ বা স্বর্ণমুদ্রা।
মার্গারিতে বলল, তার মানে, চল্লিশ ফ্রাঁ।
ফাঁতিনে বলল, হ্যাঁ, চল্লিশ।
চিন্তান্বিত অবস্থায় ফাঁতিনে সেলাইয়ের কাজ করতে লাগল। মিনিট পনেরো কাজ করার পর সে একবার উঠে গিয়ে থেনার্দিয়েরদের চিঠিটা পড়ল। তার পর আবার তার জায়গায় গিয়ে মার্গারিতেকে বলল, আচ্ছা মিলিটারি ফিভারটা কী? তুমি এ রোগের নাম শুনেছ?
মার্গারিতে বলল, হ্যাঁ, একটা রোগ।
এ রোগের জন্য কি অনেক ওষুধ লাগে?
হ্যাঁ, খুব জোরালো ওষুধ দরকার।
কিভাবে রোগটা হয়?
যেমন করে সব রোগ হয়।
মেয়েদের এ রোগ হয়?
এ রোগ ছেলেদেরই বেশি হয়।
এ রোগে মৃত্যু হয়?
প্রায়ই মৃত্যু হয়।
ফাঁতিনে ঘর থেকে বেরিয়ে আবার চিঠিটা পড়তে গেল। সেদিন সন্ধ্যায় সে বাসা থেকে বেরিয়ে র্যু দ্য প্যারিসের দিকে চলে গেল দ্রুত পায়ে।
পরদিন সকালে মার্গারিতে যখন ফাঁতিনের ঘরে ঢুকল তখন দেখল সে বিছানায় শুয়ে নেই। সে মেঝের উপর বসে রয়েছে এক জায়গায় হাঁটু দুটো জড়ো করে এবং বাতিটা জ্বলতে জ্বলতে একেবারে পুড়ে গেছে। মার্গারিতে ফাঁতিনের সঙ্গে সেলাইয়ের কাজ করত বলে রোজ সকালে এসে ফাঁতিনেকে ওঠাত। একই বাতিতে তারা কাজ করত। মার্গারিতে বুঝল, সারারাত ঘুমোয়নি ফাঁতিনে।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ভয়ে ভয়ে বলে উঠল, হা ভগবান! কী হল তোমার?
ফাঁতিনে বলল, আমার কিছুই হয়নি। আমি এখন সুখী, আমার মেয়ে আর ওষুধ অভাবে মরছে না।
এরপর টেবিলের উপর নামানো দুটো স্বর্ণমুদ্রার দিকে হাত বাড়িয়ে দেখাল ফাঁতিনে।
মার্গারিতে বলল, এ তো অনেক টাকা! কোথায় পেলে এত টাকা?
ফাঁতিনে বলল, আমি রোজগার করেছি।
বলতে বলতে হাসল ফাঁতিনে। মার্গারিতে দেখল তার হাসিটা রক্তমাখা। মুখে তখনো রক্ত লেগে ছিল ফাঁতিনের। তার উপরকার পাটিতে দুটো দাঁত ছিল না বলে ফাঁকা ফাঁকা দেখাচ্ছিল।
টাকাটা তফারমেলে পাঠিয়ে দিল ফাঁতিনে।
একথা বলা নিষ্প্রয়োজন যে থেনার্দিয়েররা মিথ্যা কথা বলেছিল। কসেত্তের কোনও অসুখ করেনি।
এদিকে চুল আর দাঁত হারিয়ে ফাঁতিনে রেগে আয়নাটা ফেলে দিয়েছিল। তিনতলার একটা ঘরে তাকে থাকতে হত। সেখানে শীত আরও বেশি। ফাঁতিনের কোনও খাট ছিল না। বিছানা বলতে মেঝের উপর একটা তোষক পাতা থাকত। আর একটা ছেঁড়া কম্বল। একটা আধভাঙা চেয়ার ছিল ঘরের এক কোণে। আর একটা জলের বালতি ছিল। তাতে জলটা জমে বরফ হয়ে গিয়েছিল শীতে। যারা ফাঁতিনের কাছে টাকা পেত সেইসব পাওনাদার রাস্তায় তাকে দেখতে পেলেই শান্তিতে পথ চলতে দিত না। অনেক সময় অনেক পাওনাদার বাসায় এসে তাগাদা করত। গোলমাল ও হৈ-চৈ করত টাকার জন্য। তার জামা ময়লা হয়ে গিয়েছিল। মোজা দুটো ছিঁড়ে গিয়েছিল। ছেঁড়া জামায় তালি বসিয়েছিল। সে প্রায় সারারাত চিন্তা করে আর চোখের জল ফেলে কাটাত। ঘুম হত না। পিঠে আর কাঁধের কাছে একটা ব্যথা অনুভব করত। খুব কাশি হত। সে পিয়ের ম্যাদলেনকে গভীরভাবে ঘৃণা করত বলে তার বিরুদ্ধে কিছুই বলত না কারও কাছে। সে প্রতিদিন সতেরো ঘণ্টা করে সেলাই করত, কিন্তু তাতে মাত্র নয় স্যু করে পেত। জেলখানার এক কন্ট্রাক্টার তাদের বেতন কমিয়ে দেয়। সতেরো ঘণ্টা কাজ করে মাত্র নয় স্যু পাওয়ায় তাতে কোনওরকমে খাওয়া ছাড়া আর কিছুই হত না। তার পাওনাদারেরা ক্রমশই অশান্ত হয়ে উঠতে লাগল। তারা আর কোনও কথা শুনতে চায় না। আর সে কী করবে? পাওনাদারদের অবিরাম তাগাদার জ্বালায় সে পশুর মতো হয়ে উঠল। এমন সময় একদিন থেনার্দিয়ের এক চিঠিতে জানাল, সে যদি একশো ফ্ৰাঁ না পাঠায় তা হলে তারা কসেত্তেকে তাদের বাড়ি থেকে বার করে দেবে। সম্প্রতি রোগ থেকে উঠে দুর্বল অবস্থায় পথে পথে ঘুরে বেড়াবে সে। তাতে সে অবশ্যই মরবে।
