ফাঁতিনে একদিন তার এক প্রতিবেশিনীকে বলল, আমি যদি রাতে মাত্র পাঁচ ঘণ্টা করে ঘুমোই এবং বাকি সময়টা কাজ করি তা হলে তাতে আমার চলে যাবে। মনে খাওয়ার চিন্তা না থাকলে কম খেয়েও বেঁচে থাকা যাবে।
মেয়েটা এই সময় কাছে থাকলে দুঃখের মাঝেও মনে কিছুটা শান্তি পেত ফাঁতিনে। কিন্তু কতকগুলি অসুবিধা ছিল এ বিষয়ে। প্রথম কথা, সে তার এই ভয়ঙ্কর দারিদ্র্যের কথা তার মেয়েকে জানতে দিতে চাইছিল না। দ্বিতীয় কথা, থেনার্দিয়েরদের কাছে তার যে ঋণ ছিল তা শোধ করে না দিলে মেয়েকে তারা ছাড়বে না। তার ওপর যাওয়া-আসার পথখরচ আছে।
যে অবিবাহিতা বৃদ্ধা মহিলা ফাঁতিনেকে দারিদ্র্যের মধ্যে কিভাবে জীবনযাপন করতে হয় তা শেখায়, তার নাম হল মার্গারিতে। সে লেখাপড়া বেশি জানত না, কোনওরকমে নাম সই করতে পারত। তবে সে খুব ধার্মিক ছিল এবং তার দয়া-দাক্ষিণ্যও ছিল।
ঘটনাটা জানাজানি হয়ে যাওয়ার পর প্রথম প্রথম লজ্জায় অভিভূত হয়ে পড়ে ফাঁতিনে। সে ঘর হতে বার হতে পারত না। তার মনে হত সে রাস্তায় একবার বার হলেই সকলেই তার পানে তাকাবে। ছোট শহরে অধঃপতিত নারী সকলের ঘৃণা আর অবজ্ঞার বস্তু হয়। প্যারিসের মতো বড় কোনও শহরে কেউ কারও খবর রাখে না। কেউ কারও বিচার করে না। প্যারিসে যেতে পারলে তার ভালো হত। কিন্তু এখন তা আর সম্ভব নয়। তাছাড়া দুঃখ ও দারিদ্র্যের মধ্যে জীবন কাটাতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে সে। দু তিন মাসের মধ্যেই একে একে সব লজ্জা কেটে গেল তার। সে এবার রাস্তায় বার হল, মাথা উঁচু করে হাঁটল, যেন কিছুই হয়নি। একদিন মাদাম ভিকতারনিয়েন ফাঁতিনেকে পথে দেখে খুশি হল। বেশি খেটে এবং ভালো করে খেতে না পেয়ে শরীরটা রোগা হয়ে গিয়েছিল ফাঁতিনের। তার দেহসৌন্দর্যের অনেকখানি শুকিয়ে গিয়েছিল। তার শুকনো কাশিটা আবার বেড়ে উঠেছিল। তার এই শোচনীয় অবস্থা দেখে মাদাম ভিকতারনিয়েনের শয়তান আত্মাটা এক কৃষ্ণকুটিল সুখের আস্বাদ, এক বিষাক্ত তৃপ্তি অনুভব করল।
তবুও এত দুঃখের মাঝে সকালের দিকে ফাঁতিনে যখন তার মাথার রেশমের মতো চুলের লম্বা গোছাটা হাতে ধরে চুল আঁচড়াত তখন একটা গর্ব অনুভব না করে পারত না সে।
.
১০
ফাঁতিনের যখন কারখানার কাজটা চলে যায় তখন শীতের শেষ। সে গ্রীষ্মকালটা কোনওরকমে কাটাল। তার পর আবার শীত এল। ভয়ঙ্কর শীত, উষ্ণতা বলতে নেই, সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শুধু ধূসর কুয়াশা। বন্ধ জানালা দিয়ে বাইরের কোনও কিছু দেখা যায় না। সমস্ত আকাশ মেঘ আর কুয়াশায় ঢাকা থাকে। কখনও কখনও দরজায় একটুখানি ক্ষীণ সূর্যের আলো এসে দাঁড়ায়। ভয়ঙ্কর শীত শুধু আকাশ থেকে বৃষ্টি আনে আর হিমে মানুষের বুকগুলোর রক্ত জমিয়ে দেয়। ফাঁতিনের পাওনাদারেরা টাকার জন্য চাপ দিতে লাগল।
ফাঁতিনের রোজগার একেবারে কমে গেল আর ঋণের বোঝা বেড়ে যেতে লাগল। থেনার্দিয়েররা কড়া ভাষায় চিঠির পর চিঠি দিতে লাগল। সে চিঠি পড়লে ফঁতিনের বুক ফেটে যায়। একবার তারা লিখল কসেত্তে রাতে নগ্ন হয়ে থাকবে। তার পশমের পোশাকের জন্য দশ ফ্রাঁ লাগবে। চিঠিটা পড়ে সারাদিন ভাবতে লাগল ফাঁতিনে। সন্ধের সময় একটা নাপিতের দোকানে গেল সে। তার কোমর পর্যন্ত লম্বা চুলের গোছাটা দেখাল।
নাপিত বলল, কী সুন্দর চুল!
ফাঁতিনে বলল, এই চুলের জন্য তুমি কত দেবে?
নাপিত বলল, দশ ফ্রাঁ।
ফাঁতিনে বলল, ঠিক আছে, কেটে নাও।
তাই দিয়ে সে একটা পোশাক কিনে এনে থেনার্দিয়েরদের কাছে পাঠিয়ে দিল। তারা সেটা পেয়ে রেগে আগুন হয়ে গেল। কারণ তারা টাকা চেয়েছিল। তারা পোশাকটা তাদের মেয়ে এগোনিনেকে দিয়ে দিল। কসেতে শীতে কাঁপতে লাগল।
এদিকে চুলটা হারিয়ে ফাঁতিনের মনটা বড় খারাপ হয়ে গেল। সে আর চুল আঁচড়াতে বা বাঁধতে পারত না। সমস্ত মানুষের ওপর মনটা বিষিয়ে গেল তার। সকলের মতো আগে সে ম্যাদলেনকে শ্রদ্ধা করত। কিন্তু যখন দেখল ম্যাদলেন তাকে কারখানা থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে এবং তার জন্যই এত দুঃখ-কষ্ট তখন সে তাকে ঘৃণার চোখে দেখতে লাগল। একদিন কারখানার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় যখন দেখল কারখানায় ঢোকার জন্য মেয়েরা দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে তখন সে পাগলের মতো হাসতে আর গান করতে লাগল। একজন বুড়ি তা দেখে বুঝতে পারল, মেয়েটা অকালে মারা যাবে।
অন্তরে ক্ষোভ আর প্রচণ্ড রাগ নিয়ে সে একটা লোককে প্রেমিক হিসেবে ধরল। লোকটা কুঁড়ে এবং পথে পথে গান গেয়ে বেড়াত। ফাঁতিনেকে মারধর করত, অবশেষে তাকে ছেড়ে একদিন চলে গেল।
এত কিছু সত্ত্বেও তার মেয়েকে ভালোবাসত ফাঁতিনে। যতই সে দুঃখ-কষ্টের গভীরে নেমে যেতে লাগল, ততই সে একটা আশাকে আঁকড়ে ধরল। সে আপন মনে বলত, একদিন আমি ধনী হব আর কসেত্তেকে তখন আমি আমার কাছে রাখব। এই ভেবে নিজের মনে হাসল। তার কাশিটা তাকে কায়দা করতে পারত না। রাত্রিতে মাঝে মাঝে ঘাম দিত।
থেনার্দিয়েররা আবার একটা চিঠি দিল। তাতে লেখা ছিল, কসেত্তের অসুখ করেছে। এই রোগটা এ অঞ্চলে খুব হচ্ছে। রোগটার নাম মিলিটারি ফিভার। এক ধরনের দূষিত জ্বর সৈনিকদের থেকে ছড়িয়ে পড়ে। তার জন্য তাদের ওষুধ কেনার পয়সা নেই। ফাঁতিনে যদি চিঠি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চল্লিশ ফ্রাঁ না পাঠায়, এক সপ্তার মধ্যে তা হলে তার মেয়ে মারা যাবে।
