অনেকে আবার শুধু পরচর্চা করতে ভালোবাসে আর সেই পরচর্চা করতে গিয়ে অকারণে ঈর্ষায় ফেটে পড়ে। প্রতিবেশীদের প্রতি অনুভূত ঈর্ষার আগুনে পরচর্চা ইন্ধন জোগায়।
ফাঁতিনের জীবনযাত্রার ওপর অনেকেই লক্ষ রাখত। কয়েকজন মেয়েশ্রমিক তার দেহসৌন্দর্যের জন্য, বিশেষ করে তার চুল আর দাঁতের জন্য ঈর্ষাবোধ করত। তার সঙ্গে কারখানায় যেসব মেয়ে কাজ করত তারা মাঝে মাঝে দেখত ফাঁতিনে মুখটা ঘুরিয়ে চোখের জল মোছে। তার মেয়ের কথা বা তার পুরনো প্রেম আর প্রেমিকের কথা মনে পড়ে গেলে বেদনায় বিহ্বল হয়ে ওঠে তার অন্তরটা।
পরে একটা কথা জানাজানি হয়ে গেল। অনেকে জানতে পারল, প্রতি মাসে দু বার বিশেষ এক জায়গায় চিঠি পাঠায় ফাঁতিনে আর যার কাছে চিঠি পাঠায় তার নাম থেনার্দিয়ের এবং জায়গাটার নাম মঁতফারমেল।
যে লোকটা চিঠি লিখে দিত ফাঁতিনের সে কোনও কথা গোপন রাখতে পারল না শেষ পর্যন্ত। তাকে একদিন কয়েকজন লোক একটা মদের দোকানে নিয়ে এক পেট মদ খাইয়ে দিতেই সে আসল কথাটা বলে ফেলল। বলল, ফাঁতিনের একটি সন্তান আছে। তখন অনেকে বলতে লাগল, ও বাবা, মেয়েটা তা হলে এই ধরনের নোংরা প্রকৃতির! শহরের এক কৌতূহলী মহিলা সোজা মঁতফারমেলে গিয়ে থেনার্দিয়েরদের সঙ্গে কথা। বলল। সে ফিরে এসে বলল, যাওয়া-আসায় আমার তিরিশ ফ্রাঁ খরচ হয়েছে, তবে এখন আমি সব জানতে পেরেছি। আমি তার মেয়েকে দেখেছি।
এই মহিলা হল মাদাম ভিকতারনিয়েন। সমাজের সাধারণ মানুষের নীতির অভিভাবিকা। তার বয়স ছাপ্পান্ন। বয়স হওয়ার জন্য তার মুখটা কুৎসিত দেখাত। তার গলার স্বরটা ছিল কাঁপা কাঁপা, তবে মনটা ছিল তেজি। ১৭৯১ সালে তার যখন যৌবন ছিল, সে এক যাজককে বিয়ে করে। এখন তার বয়স হলেও এবং চেহারাটা শুকিয়ে গেলেও সে তার স্বামীর স্মৃতিটা বুকে ধরে বেঁচে আছে। সে ঈর্ষাকাতর এবং মনটা তার হিংসায় ভরা। তার স্বামী যতদিন বেঁচে ছিল, তাকে কড়া শাসনের মধ্যে রেখেছিল। তার অল্প যা কিছু সম্পত্তি ছিল সে ধর্মের কাজে দান করে। তার পর সে আরাসের বিশপের দয়ার ওপর নির্ভর করে জীবন ধারণ করত। এই মাদাম ভিকতারনিয়েন মিতফারমেল গিয়ে ফিরে এসে বলে, আমি তার সন্তানকে দেখেছি।
মাদাম ভিকতারনিয়েন যে মাসে থেনার্দিয়েরদের সঙ্গে দেখা করতে যায় সেই মাসে তারা কসেক্তের খরচ বাবদ সাত থেকে বারো ফ্ৰাঁ দাবি করে এবং পরে পনেরো ফ্ৰাঁ চায়।
এদিকে ফাঁতিনের অবস্থা শোচনীয় হয়ে ওঠে। সে মন্ত্রিউল জেলা ছেড়ে কোথাও যেতে পারছিল না, কারণ বাড়িভাড়া আর আসবাবপত্র বাবদ দেড়শো ফ্ৰাঁ ধার ছিল। সে কারখানার সুপারভাইজারকে এই টাকার কথা বলে। সুপারভাইজার তাকে টাকা দিয়ে বরখাস্ত করে। তার চাকরির স্থায়িত্ব ছিল না, অস্থায়ী কর্মী হিসেবেই সে ঢুকেছিল। লজ্জা আর হতাশার চাপে অভিভূত হয়ে সে বাসার ভেতরেই থাকত সব সময়। কারখানার কাজ ছেড়ে সে বাসাতেই আশ্রয় নিয়েছিল। তার দোষের কথাটা জানাজানি হয়ে যায়। মেয়রের কাছে গিয়ে সব কথা বুঝিয়ে বলার মতো সাহস ছিল না। মেয়রের কাছে যাওয়ার জন্য অনেকেই তাকে পরামর্শ দিয়েছিল, কিন্তু সে লজ্জার ও ভয়ে যেতে পারেনি। সুপারভাইজারের মাধ্যমে দয়াবশত মেয়র ম্যাদলেন পঞ্চাশ ঐ ফাঁতিনেকে পাঠিয়ে দেয়। কিন্তু কাজ থেকে তাকে ছাড়িয়ে দেয়, কারণ সে ছিল ন্যায়পরায়ণতার দিক থেকে ভীষণ কড়া। ফাঁতিনে তার মালিকের রায় মেনে নেয়।
.
৯
এইভাবে মাদাম ভিকতারনিয়েনের কথার সত্যতা প্রমাণিত হয়।
এদিকে মঁসিয়ে ম্যাদলেন ফাঁতিনেকে কোনওদিন দেখেনি এবং তার সম্বন্ধে কিছুই জানত না। সুপারভাইজার মালিকের নামে যা কিছু করার নিজেই করেছে। মেয়েদের কারখানায় মোটেই যেত না ম্যাদলেন, তার কাজ দেখাশোনাও করত না। এর জন্য যে একজন অবিবাহিতা মেয়েকে সে কারখানা দেখাশোনা করার জন্য সুপারভাইজার নিযুক্ত করে তার ওপর সব ভার দেয়। সুপারভাইজার মেয়েটি ছিল সৎ এবং সরলমনা। তার অন্তরে দয়ামায়া ছিল। তবে যে পরিমাণ কঠোর নীতিজ্ঞান ছিল তার, সে পরিমাণ ক্ষমাগুণ ছিল না। তার কাজের ওপর সম্পূর্ণ আস্থা ছিল ম্যাদলেনের। সুপারভাইজারই ফাঁতিনের ব্যাপারটার সব কিছু বিচার করে। সে নিজেই রায় দেয়। ম্যাদলেনকে কিছুই জানায়নি এবং ফাঁতিনেকে ছাড়িয়ে দেওয়ার পর সে তাকে মেয়রের নাম করে যে পঞ্চাশ ফ্রাঁ দেয় তা গরিব-দুঃখীদের দান-খয়রাতের জন্য তার হাতে যে একটা ফান্ড ছিল তার থেকে দেয়। এই ফান্ডটা মেয়র তার কাছেই রেখেছিল।
ফাঁতিনে কারও ঘরে কাজ করার জন্য চেষ্টা করে। কিন্তু কেউ তাকে কাজ দিতে চায়নি। বাড়িভাড়া আর আসবাবের টাকা বাকি থাকায় সে শহর ছেড়ে কোথাও যেতে পারছিল না। শেষে যে পঞ্চাশ ফ্রাঁ সে পায় তা সে দু জন পাওনাদারকে ভাগ করে দেয়। সে মাত্র বিছানা ছাড়া আর সব আসবাব ছেড়ে দেয়। সব দেনা দেওয়ার পর তার কাছে মোট একশো ফ্রাঁ থাকে।
সে তখন সেনানিবাসের সৈন্যদের জামা সেলাই করে দিয়ে বারো স্যু করে পেত। তার থেকে তার মেয়ের খরচের জন্য দশ সু করে চলে যেত। এই সময় অভাবের জন্য প্রতি মাসে ঠিকমতো তার মেয়ের জন্য টাকা পাঠাতে পারত না।
দারিদ্র্য আর অভাবের মধ্য দিয়ে কিভাবে দিন কাটাতে হয়, তা ফাঁতিনে এক বৃদ্ধার কাছে আগেই শিখেছিল। শীতকালে কিভাবে আগুন ছাড়াই থাকতে হয়, কিভাবে পেটিকোট দিয়ে কম্বলের অভাব পূরণ করতে হয়, জানালা দিয়ে আসা রাস্তার আলোয় রাতের খাওয়া সেরে বাতির খরচ বাঁচাতে হয়–এ সব জানা ছিল তার।
