ম্যাদলেন কোনও কথা বলল না।
জনতা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সহসা বসে যাওয়া চাকাগুলো ধীরে ধীরে উঠতে লাগল। ম্যাদলেন চাপা গলায় বলতে লাগল, আমাকে একটু সাহায্য কর।
হঠাৎ সবই ছুটে এসে গাড়িটা তোলার চেষ্টা করতে লাগল। একটা লোকের শক্তি আর সাহস দেখে অবাক হয়ে গেল সবাই। ফকেলেভেন্ত বেঁচে গেল।
গাড়িটা উঠে যেতেই ম্যাদলেন উঠে দাঁড়াল। তার মুখটা ঘামে ভিজে গিয়েছিল। তবু একটা তৃপ্তির অনুভূতি ছড়িয়ে ছিল তার মুখে। তার পোশাকটা ছিঁড়ে গিয়েছিল এবং তাতে কাদা লেগে গিয়েছিল। ফকেলেভেন্ত ম্যালেনের সামনে নতজানু হয়ে বসে তাকে জড়িয়ে ধরল। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিতে লাগল। ম্যালেনের চোখে-মুখে এক তৃপ্তি ও বিজয়গর্বের সঙ্গে এক কাতর ভাব ছিল। সে ভাবের সঙ্গে জেভার্তের ভয়টা তখনও ছিল। সে শান্তভাবে জেভার্তের মুখপানে তাকাল। দেখল জেভাৰ্ত তখনও তার মুখপানে তাকিয়ে তাকে লক্ষ করছে।
.
৭
সেদিনকার দুর্ঘটনায় গাড়িচাপা পড়ে ফকেলেভেন্তের হাঁটুর একটা চাকতি ভেঙে যায়। ম্যাদলেন তাকে সঙ্গে করে একটা হাসপাতালে ভর্তি করে তার দেখাশোনা করার জন্য দু জন নার্স নিযুক্ত করল। এ হাসপাতালটা তার শ্রমিকদের সুবিধার জন্য তার একটা কারখানার মধ্যেই করেছিল। পরের দিন সকালে ফকেলেভেন্তু তার ঘরে বিছানার পাশে একটা টেবিলের উপর এক হাজার ফ্রাঁ’র নোট পেল। তার সঙ্গে একটি কাগজে ম্যালেনের হাতে লেখা ছিল, আমি আপনার গাড়ি ও ঘোড়ার ব্যবস্থা করছি।
ফকেলেভেন্তের গাড়িটা ভেঙে যায় এবং ঘোড়াটা মারা যায়। ফকেলেভেন্ত সেরে উঠল কিছুদিনের মধ্যে। কিন্তু তার হাঁটুটা শক্ত আর খাড়া হয়ে রইল। হাঁটুটা আগের মতো মুড়তে পারল না। কয়েকজনের পরামর্শে মাদলেন প্যারিসের সেন্ট আঁতোনের অন্তর্গত এক কনভেন্টে এক মালীর কাজ জোগাড় করে দিল ফকেলেভেন্তকে।
এই ঘটনার কিছু পরেই মঁসিয়ে ম্যাদলেন দ্বিতীয়বারের জন্য মেয়র নির্বাচিত হল। শহরের সর্বময় কর্তা হয়ে উঠল সে। সে যখন মেয়রের পোশাক পরে বার হত তখন তাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে ঈর্ষার এক কাঁপন জাগত জেভার্তের বুকের মধ্যে, ভেড়ার চামড়া ঢাকা এক নেকড়ে দেখে এক শিকারি কুকুরের মধ্যে যেমন কাঁপন জাগে। তবে যতদূর সম্ভব মেয়রকে এড়িয়ে চলত জেভার্ত। সরকারি কোনও কর্তব্যের খাতিরে মেয়রের কাছে জেতার্তকে যেতে হলে সে প্রথম তো তাকে সম্মান জানাতে বাধ্য হত।
ম্যাদলেনের জন্য শহরের বহিরঙ্গটারই শুধু উন্নতি হয়নি, অদৃশ্য কয়েকটি দিকেও তার উন্নতি হয়। শহরের অধিবাসীদের অবস্থা আগে যখন খুব খারাপ ছিল তখন কর ঠিকমতো আদায় হত না। আবার সেই বাকি কর আদায় করার জন্য বেশি লোক লাগত এবং তার জন্য খরচ বেশি হত। কিন্তু বর্তমানে শহরবাসীদের আয়ের উন্নতি হওয়ায় কর সবাই সহজে দিয়ে দেয় এবং কর আদায়ের জন্য খরচও অনেক কম হয়। অর্থমন্ত্রী মন্ত্রিউল-সুর-মেরের কথা উল্লেখ করে অন্য শহরের মেয়রদের শিক্ষা দেন।
মন্ত্রিউল শহরের যখন এই রকম অবস্থা চলছিল তখন একদিন ফাঁতিনে ফিরে আসে সেখানে। কেউ তার কথা মনে রাখেনি। তবে তাকে কষ্ট পেতে হয়নি তার জন্য। কারণ ম্যালেনের কারখানার দরজা তখন খোলা ছিল। সে মেয়েদের কারখানায় একটা চাকরি পেয়ে যায়। কাজটা তার কাছে নতুন এবং সে কাজ সে ভালো জানতও না। বেতনও খুব একটা বেশি ছিল না। তবু এই চাকরিটা পাওয়াতে ফাঁতিনের খুবই উপকার হল। সে অন্তত তার জীবিকাটা অর্জন করতে পারল।
.
৮
ফাঁতিনে যখন দেখল সে দু বেলা পেট ভরে খেতে পাচ্ছে তখন তার খুশির অন্ত রইল না। সদ্ভাবে পরিশ্রম করে জীবিকার্জন করতে পারাটা ঈশ্বরের আশীর্বাদ ছাড়া আর কিছুই নয়। এর ফলে কাজের প্রতি তার আগ্রহ আর নিষ্ঠা বেড়ে গেল। সে তার থাকার জন্য ছোটখাটো একটা ঘর ভাড়া করল। সে একটা আয়না কিনল। সেই আয়না দিয়ে সে তার মুখ-চোখ, যৌবন, দেহসৌন্দর্য, সাদা দাঁত, সুন্দর চুল–সব কিছু দেখত এবং দেখে আনন্দ পেত। অতীতের অনেক অবাঞ্ছিত ঘটনার কথা ভুলে গেল সে। সে শুধু তার মেয়ে কসেত্তের কথা ভাবত। তার ভবিষ্যৎ কিভাবে গড়ে তুলবে সে তার জন্য অনেক পরিকল্পনা করত মনে মনে।
তার বিয়ে হয়েছে এ কথা কারও কাছে বলেনি ফাঁতিনে। সুতরাং তার যে মেয়ে আছে এ কথাও বলতে পারেনি কাউকে। প্রথম প্রথম সরকারি চিঠি লেখানোর লোকের কাছে গিয়ে তাকে দিয়ে থেনার্দিয়েরদের কাছে চিঠি ও টাকা পাঠাত। কিন্তু পরে কথাটা জানাজানি হয়ে যায়। অনেকে মন্তব্য করতে থাকে, মেয়েটা মিথ্যা কথা বলে।
যাদের সঙ্গে আমাদের কোনও স্বার্থের ব্যাপার নেই, যাদের সঙ্গে আমাদের কোনও সম্পর্ক নেই, আমাদের চালচলন ও কাজকর্মের দিকে তাদের নজরই বেশি। তা না হলে সন্ধের দিকে একটা লোককে ফাঁতিনের বাসার কাছে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যাবে কেন? আবার পেছনের দিকে রাস্তাটাতেই বা দু-একজনকে দেখা যাবে কেন?
কতকগুলি লোক আছে যারা অবসর সময়ে ভালো কাজ না করে শুধু এক তরল কৌতূহলের বশবর্তী হয়ে পরের খোঁজখবর নিয়ে বেড়াবে। তারা অপরের জীবনের কোনও অজানা রহস্যের সন্ধান করার জন্য দিনের পর দিন কষ্ট করবে, খরচ করবে আর সেই রহস্য অবশেষে উদ্ঘাটন করতে পারলে কৌতূহল নিবৃত্ত করতে পারার জন্য এক অকারণ আত্মতৃপ্তি লাভ করবে।
