ভবঘুরে ধরনের সমাজবিরোধীদের সে ঘৃণা করত, কারণ সে নিজে একদিন তাদের শ্রেণীভুক্ত ছিল। সে তাই পুলিশেই যোগদান করে।
এদিক দিয়ে সে বেশই উন্নতি করে। চল্লিশ বছর বয়সেই সে পুলিশ ইনস্পেক্টর হয়। অথচ যৌবনে সে মিদিতে ছিল এক জেলপ্রহরী। যাই হোক, এবার আমরা জেভার্তের মুখটা খুঁটিয়ে দেখব।
তার নাকটা ছিল থ্যাবড়া; নাসারন্ধ্র দুটো ছিল বেশ বড় বড়। নাকের দু দিকে ছিল দুটো লম্বা-চওড়া গালপাট্টা। একনজরে দেখলেই তার গালপাট্টা দুটো কালো ঝোঁপের মতো দেখায়। জেভার্ত খুব হাসত। কিন্তু যখন সে হাসত তার সব দাঁত আর দাঁতের মাড়ি দেখা যেত। তার নাকের দু ধারে দুটো বড় বড় টোল খেত। জেভার্ত যখন হাসত না তখন তাকে বুলডগের মতো দেখাত আর যখন সে হাসত তখন তাকে বাঘের মতো দেখাত। তার ভ্র দুটো সংকীর্ণ ছিল, কিন্তু চোয়াল দুটো বড় ছিল। তার লম্বা চুলগুলো কপালটাকে ঢেকে থাকত। তার ভ্রু দুটো প্রায় সব সময় কুঞ্চিত থাকত বলে তার ক্রোধটা প্রকটিত হয়ে উঠত। তার চোখ আর মুখ দুটোই ভয়ঙ্কর দেখাত।
তার মনের ভাবধারার দুটো প্রধান উপাদান ছিল। সরকারি কর্তৃপক্ষের প্রতি তার একটা কুটিল শ্রদ্ধা ছিল এবং সেই কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে যারা বিদ্রোহ করে তাদের প্রতি তার একটা ভয়ঙ্কর ঘৃণা ছিল। চৌর্য, নরহত্যা প্রভৃতি যে কোনও অপরাধকে সরকারি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বলে ধরে নিত সে।
সামান্য পিয়ন থেকে মন্ত্রী পর্যন্ত যেসব লোক প্রশাসনিক কাজে নিযুক্ত থাকত, জেভার্ত তাদের শ্রদ্ধার চোখে দেখত এবং যে কোনও প্রশাসনিক কাজকে সে পবিত্র মনে করত। যারা আইন ভঙ্গ করত তাদের প্রতি এক প্রবল ঘৃণা, বিরক্তি আর বিতৃষ্ণা অনুভব করত। কোনও বিষয়ে তার কোনও বিচারকে সে অভ্রান্ত বলে মনে করত। তার কেবলই মনে হত তার সে বিচারের মধ্যে কোনও ত্রুটি বা ফাঁক নেই। সে একদিকে বলত, সরকারি কর্মচারীরা কোনও অন্যায় করতে পারে না। ম্যাজিস্ট্রেটরা সব সময় ঠিক বিচার করে থাকে। আবার অন্যদিকে অপরাধীদের সম্বন্ধে বলত, ওরা একেবারে অধঃপতিত, ওদের দ্বারা আর কিছু হবে না, ওরা জীবনে আর কোনও ভালো কাজ করতে পারবে না। যেসব উগ্র মনোভাবাপন্ন লোক আইনের শক্তিকে সর্বোচ্চ, সার্বভৌম আর অবিসংবাদিত বলে মনে করে জেতার্ত তাদের সঙ্গে একমত। সে ছিল স্টইক সন্ন্যাসীদের মতো আত্মনিগ্রহে কঠোর, আবার ভোগে আগ্রহী। কল্পনাপ্রবণ ভাববাদী লোকদের মতো সে ছিল একই সঙ্গে বিনম্র এবং অহঙ্কারী। তার চোখের দৃষ্টি ছিল একই সঙ্গে হিমশীতল আর মর্মভেদী। প্রহরীর মতো সব সময় সজাগ থাকাই তার জীবনের মূলমন্ত্র ছিল। তার বিবেকটাকে সে তার নীতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছিল। যেটাকে সে কর্তব্য বলে মনে করত সেই কর্তব্যকর্মই ছিল তার ধর্ম। গুপ্তচরের মতো সে সবার কাজকর্ম অলক্ষ্যে লক্ষ করে যেত। একমাত্র অভিশপ্ত এবং হতভাগ্য ব্যক্তিরাই তার। কু-নজরে পড়ত বা তার হাতে ধরা পড়ত। জেল থেকে পালানোর জন্য সে হয়তো তার বাবাকেও গ্রেপ্তার করতে পারত এবং আইন ভঙ্গ করার জন্য সে হয়তো তার মাকেও দণ্ডদান করতে পারত এবং এ কাজকে সে পবিত্র ধর্মীয় কাজ বলে মনে করত। সে যে কঠোর কর্তব্যপরায়ণতায় অবিচল, আত্মনিগ্রহ আর নিষ্ঠুর সততার জীবন যাপন করত, তার মধ্যে কোনও ফাঁক বা বিন্দুমাত্র বিচ্যুতি ছিল না। সে ছিল মনে-প্রাণে নিঃসঙ্গ। পুলিশের কাজে তার এক অদ্ভুত সততা আর নিষ্ঠা ছিল। ব্রুটাস আর দাগি অপরাধী থেকে পুলিশের বড়কর্তা হওয়া ডিদোকের সংমিশ্রণে গড়া সে যেন ছিল মর্মর প্রস্তরনির্মিত এক নির্মম গুপ্তচরের প্রতিমূর্তি।
জেভার্তের স্বভাব ছিল সব কিছু গোপনে লক্ষ করা। যারা ছিল জোশেফ দ্য মেস্তারের দলের লোক এবং রাজতন্ত্রের উপাসক, যারা সৃষ্টিতত্ত্বের ব্যাখ্যার মাধ্যমে রাজতন্ত্রের সমর্থনে পত্রপত্রিকায় প্রবন্ধ লিখত তারা জেভার্তকে এক আদর্শ রাজকর্মচারীর প্রতীক। হিসেবে ভাবতে পারত।
সাধারণত জেভার্তের কপালটা দেখা যেত না। টুপিটা কপালের উপর নামানো থাকত। চোখ দুটো দ্রুযুগলের নিচে কেমন যেন চাপা পড়ে থাকত, তার হাত দুটো জামার আস্তিনের নিচে ছড়িটাকে ধরে থাকত বলে সাধারণত তা দেখা যেত না। কিন্তু দরকার হলে তার কপাল, চোখ, মুখ, হাত, হাতের ছড়ি এই সবকিছু ঝোঁপের আড়ালে লুকোনো শত্রুর মতো অকস্মাৎ বেরিয়ে এসে এক ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করত।
অবসর সময়ে বই পড়ত জেভাৰ্ত, যদিও বই পড়া কাজটাকে অলসদের কাজ হিসেবে ঘৃণা করত সে। যাই হোক, সে পড়তে পারত এবং একেবারে অশিক্ষিত ছিল না। তার কথাবার্তা থেকেও এটা প্রায়ই বোঝা যেত। তার কোনও নেশা ছিল না, বা সে কোনও কুকর্ম করত না। তবে তার মন ভালো থাকলে সে একটু করে নস্যি নিত। এটাই ছিল তার একমাত্র নেশা।
বিচার বিভাগীয় মন্ত্রীর বাৎসরিক পরিসংখ্যান তালিকায় পদমর্যাদাহীন নিচের তলার যেসব মানুষের নাম ছিল তাদের কাছে জেভার্ত ছিল এক ত্রাসের বস্তু। তার নাম শুনলে তারা ছিটকে পালাবার চেষ্টা করত, দেখা হয়ে গেলে তারা ভয়ে স্তম্ভিত হয়ে যেত। জেভার্ত তাদের কাছে ছিল এমনই ভয়ঙ্কর।
মঁসিয়ে ম্যালেনের ওপর কড়া নজর রেখে এক অপার সংশয় আর বিস্ময়ের সঙ্গে তাকে লক্ষ করে যেত জেভার্ত। ম্যাদলেনও ক্রমে এটা জানতে পারে। কিন্তু সে এটাকে তেমন গুরুত্ব দেয়নি। এ নিয়ে সে কোনওদিন প্রশ্ন করেনি জেভার্তকে, তাকে ডেকে পাঠায়নি অথবা তাকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেনি। সে জেভার্তের এই গুপ্তচরগিরি সহ্য করে যায়। আর পাঁচজন লোকের সঙ্গে যেমন ব্যবহার করত তেমনি জেভার্তের সঙ্গেও ভালো ব্যবহার করে যেত।
