একদিন সন্ধ্যার সময় এক বিধবা মহিলা এসে তাকে প্রশ্ন করে, আচ্ছা মঁসিয়ে মেয়র, দিগনের বিশপ কি আপনার জ্ঞাতিভাই ছিলেন?
ম্যাদলেন বলল, না মাদাম।
বিধবা বললেন, কিন্তু আপনি তো শোক পালন করছেন।
ম্যাদলেন বলল, কারণ যৌবনে আমি তাদের বাড়িতে ভৃত্য ছিলাম।
শহরে যখন কোনও ভবঘুরে ছেলে চিমনি পরিষ্কার বা ঝট দেওয়ার কাজ করতে আসত তখন ম্যাদলেন তাকে ডেকে পাঠাত। তার নাম জিজ্ঞাসা করত, তাকে টাকা দিত। কথাটা প্রচারিত হতে অনেক ভবঘুরে ছেলে প্রায়ই এ শহরে আসত।
.
৫
ক্রমে মঁসিয়ে ম্যালেনের বিরুদ্ধে সব প্রতিকূলতা, যত নিন্দাবাদ স্তব্ধ হয়ে গেল। মানুষ বড় হলেই তাকে অনেক নিন্দা সহ্য করতে হয়। ম্যাদলেনকেও তাই করতে হয়েছিল। কিন্তু ক্রমে তা অতীতের ঈর্ষাত্মক ঘটনার কাহিনী হিসেবে চাপা পড়ে গেল লোকের মনের মধ্যে। ১৮২১ সাল পর্যন্ত ম্যালেনের প্রতি স্থানীয় জনগণের শ্রদ্ধাভক্তি বেড়ে যেতে থাকে ক্রমশ। তার খ্যাতি দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ায় প্রায় কুড়ি মাইল দূর থেকে বহু লোক মেয়র মঁসিয়ে ম্যালেনের নানা বিষয়ে আলোচনা করতে লাগল। ম্যাদলেন অনেক ঝগড়া-বিবাদ ও মামলা-মোকদ্দমা মিটিয়ে দিত। অনেকের অনেক শক্রতার অবসান ঘটিয়ে তাদের মধ্যে মিল করিয়ে দিত। সকলেরই তার বিচার-বিবেচনায় আস্থা ছিল। তার কথাই ছিল যেন আইন। এইভাবে মাত্র ছয়-সাত বছরে মধ্যে সারা দেশে তার যশ মহামারি রোগের মতো ছড়িয়ে পড়ল।
একটা মাত্র লোক এই ছোঁয়াচে রোগের সংক্রমণ থেকে মুক্ত ছিল। মাদলেন যত ভালো কাজই করুক না কেন, লোকটা তা কখনও স্বীকার করত না ভালো বলে। তার প্রতি সব সময় একটা সংশয় আর অবিশ্বাসকে পোষণ করে চলত। কতকগুলি লোকের মধ্যে পাপপ্রবৃত্তি খুব প্রবল থাকে যে প্রবৃত্তি নিখাদ ধাতুর মতো খাঁটি এবং যে প্রবৃত্তির দ্বারা মানুষের প্রতি অনুরাগ-বিরাগ নিয়ন্ত্রিত হয়। এই পাপপ্রবৃত্তির জন্য সেইসব মানুষ আত্মম্ভরিতার বশবর্তী হয়ে কোনও বুদ্ধি বা যুক্তির পরামর্শ মানতে চায় না। তারা সককেই শুধু ঘৃণা করে যায়। তাদের মনের সংশয় আর অবিশ্বাস কোনও অপরিচিত লোক দেখলেই বিড়ালের পেছনে কুকুর আর খেকশিয়ালের পেছনে সিংহের মতো ছুটে যায় তার পেছনে।
ম্যাদলেন যখন রাস্তা দিয়ে দু ধারের নাগরিকদের অভ্যর্থনা পেতে পেতে হাসিমুখে কোথাও যেত, লম্বা চেহারার ঝুল কোটপরা একটা লোক ছড়িহাতে দাঁড়িয়ে তাকে লক্ষ করত। ম্যাদলেন যতক্ষণ পর্যন্ত তার চোখের আড়াল হয় ততক্ষণ তাকে লক্ষ করতে যেত লোকটা। লক্ষ করত সে তার নিচের ঠোঁটটা উপরের ঠোঁটের উপর চাপিয়ে মাথাটা আপন মনে নাড়ত। যেন আপন মনে বলত, লোকটা কে? আমি আগে নিশ্চয় কোথাও দেখেছি, এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।
লোকটা দেখতে এমনই যে তাকে একবার দেখলেই মনে রেখাপাত করে। মনের মধ্যে কেমন এক অজানা ভয় জাগে। লোকটার নাম হল জেতার্ত এবং সে পুলিশের লোক।
মন্ত্রিউল-সুর-মের-এর পুলিশ ইন্সপেক্টর সে তার যথাকর্তব্য পালন করে গেলেও মাঝে মাঝে তার কাছের লোক তাকে ঘৃণা করত। ম্যাদলেন যখন প্রথম মন্ত্রিউলে আসে জেভার্ত তখনও আসেনি। ম্যাদলেন কিভাবে তার কাজ-কারবার শুরু করে তা সে দেখেনি। সে যখন মন্ত্রিউলের পুলিশ ইনস্পেক্টর হিসেবে তার কার্যভার গ্রহণ করে তখন ম্যাদলেন নাম আর টাকা দুটোই করেছে। সে তখন পিয়ের ম্যাদলেন থেকে মঁসিয়ে ম্যাদলেন হয়ে উঠেছে।
সাধারণত পুলিশ অফিসারদের মধ্যে কিছু ভালো প্রবৃত্তির সঙ্গে একটা প্রভুত্বের ভাব থাকে। কিন্তু জেভার্তের মধ্যে ছিল শুধু অবিমিশ্র প্রভুত্বের ভাব, তার মধ্যে ভালো কোনও প্রবৃত্তি ছিল না।
মানুষের আত্মা যদি মানুষে দেখতে পেত তা হলে সে বুঝতে পারত প্রাণিজগতের বিভিন্ন পশু-পাখিগুলো মানুষের আত্মারই এক একটা প্রতিরূপ। সামান্য ঝিনুক থেকে ঈগলপাখি, শুয়োর থেকে বাঘ–সব আছে মানুষের মধ্যে। কোনও কোনও মানুষের মধ্যে আছে আবার দু’ তিন রকমের জন্তুর স্বভাব।
আসলে প্রাণিজগতের সব জন্তুই মানুষের ভালো-মন্দ স্বভাবের এক একটা বস্তুর প্রতিরূপ। তাদের আত্মারই এক একটা বাস্তব প্রতিফলন। ঈশ্বর আমাদের চোখের সামনে পশুদের হাজির করিয়ে আমাদের শিক্ষা দিতে চান। তবে মানুষের আত্মার মধ্যে বুদ্ধি বলে একটা জিনিস আছে এবং শিক্ষালাভের একটা শক্তি আছে। সুপরিচালিত সামাজিক শিক্ষার দ্বারা মানুষ তার আত্মার অন্তর্নিহিত শক্তিকে বার করে এনে কাজে লাগাতে পারে। আমরা এই সামাজিক শিক্ষার দ্বারা কোনও মানুষকে বা পশুকে দেখে তাদের ভেতরকার স্বভাবের কথা জানতেও পারি। কোনও মানুষের চেহারা বা দেহাবয়ব দেখে তার অন্তরের স্বরূপটা বুঝতে না পারার কোনও কারণ থাকতে পারে না।
জেভার্তের জন্ম হয় কারাগারে। তার মা জ্যোতিষের কাজ করত। তার বাবা কাজ করত নৌবহরে। বড় হয়ে জেভার্ত বুঝতে পারল সমাজে প্রবেশ করার কোনও অধিকার নেই তার। সমাজের কাছে সে এক ঘৃণ্য জীব। কিন্তু সে সমাজের দুটো শ্রেণির লোককে ভয় করে এবং তাদের কাছ থেকে দূরে থাকতে চায়। এই দুটো শ্রেণির একটা সমাজের ক্ষতিসাধন করতে চায়, সমাজের মধ্যে বিশৃঙ্খলা আনতে চায় অর্থাৎ তারা সমাজবিরোধী, আর এক শ্রেণি হল সমাজের রক্ষাকর্তা। জেতার্ত দেখল এই দুটো শ্রেণির একটাকে তার বেছে নিতেই হবে।
