ম্যাদলেন মানুষ হিসেবে ছিল সত্যিই বড় রহস্যময়। লোকে বলত, সে নাকি তার শোবার ঘরে কাউকে ঢুকতে দেয় না। সে ঘরটা নাকি সন্ন্যাসীদের গুহার মতো করে মড়ার মাথার খুলি আর হাড়-কঙ্কালে ভর্তি। এইসব কথা শুনে অনেক সাহসী যুবতী মেয়ে সোজা ম্যাদলেনের কাছে গিয়ে বলত, মঁসিয়ে, আপনার শোবার ঘরটা একবার দেখতে পারি? লোকে বলে, ওটা নাকি একটা গুহা।
ম্যাদলেন মৃদু হেসে তাকে সঙ্গে করে তার শোবার ঘরে নিয়ে যেত। কিন্তু সে ঘরে ঢুকে কেউ আশ্চর্যজনক কোনও বস্তু দেখতে না পেয়ে হতাশ হত। তারা দেখত ঘরটা মেহগনি কাঠের সাধারণ সাদাসিধে ধরনের আসবাবে ভর্তি। সে ঘরের মধ্যে দুটো রুপোর বাতিদান ছিল।
তবু সবাই বলত, পিয়ের ম্যালেনের নির্জন শোবার ঘরটায় ঢুকলেই সন্ন্যাসীর গুহা অথবা সমাধিগহ্বর বলে মনে হয়।
লোকে এই বলে গুজব রটাত যে লাফিত্তে ব্যাংকে ম্যাদলেনের লাখ লাখ ফ্রাঁ জমা আছে এবং ব্যাংকের সঙ্গে তার ব্যবস্থা আছে সে যে কোনও সময়ে ব্যাংকে সোজা চলে গিয়ে লাখ লাখ ফ্রাঁ তুলে নিয়ে আসতে পারে। মাঝে মাঝে ব্যাংকে গিয়ে ম্যাদলেনকে অবশ্য কিছু করে টাকা তুলে আনতে হত। কিন্তু লোকে যেখানে লাখ লাখের কথা বলত সেখানে লাখটা ছিল আসলে হাজার।
.
৪
১৮২২ সালে খবরের কাগজে দিগনের বিশপ মঁসিয়ে মিরিয়েলের মৃত্যুসংবাদ প্রকাশিত হল। তিনি বিরাশি বছর বয়সে পবিত্র ধর্মস্থানে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। সংবাদে আরও জানা যায়, মৃত্যুর কয়েক বছর আগে অন্ধ হয়ে যান বিশপ মিরিয়েল। তবে তাঁর বোন সব সময় তাঁর পাশে থেকে তাঁর সেবা করে যেত।
এখানে প্রসঙ্গক্রমে একটা কথা বলা যেতে পারে। এ জগতে কোনও জীবনই সম্পূর্ণরূপে সুখী নয়, কোনও মানুষই জীবনে পূর্ণতা লাভ করতে পারে না। তবু অন্ধ হয়েও অনেকে সুখী হতে পারে।
কোনও অন্ধ লোকের পাশে যদি তার স্ত্রী, কন্যা অথবা বোন সব সময় থেকে দরকারমতো সেবা করে যায়, যদি তার নিরন্তর উপস্থিতি থেকে তার অন্তরের মমতার একটা পরিমাণ বোঝা যায়, যদি তার পোশাকের খসখস শব্দ অথবা গানের গুনগুন শব্দ থেকে তার বাঞ্ছিত মধুর উপস্থিতির কথা জানা যায়, নক্ষত্রকেন্দ্রিক এক দেবদূতের মতো সেই মমতাময়ী সেবাকারিণী সেই অন্ধ লোকের সঙ্গ কখনও ত্যাগ না করে তা হলে সেই অন্ধ লোকের মতো সুখী আর কেউ হতে পারে না। জগতের সবচেয়ে বড় সুখ হল ভালোবাসার এক নিবিড় আশ্বাসে অভিষিক্ত হওয়া। সব দিক দিয়ে নিঃস্ব এবং ভালোবাসার অযোগ্য হয়েও শুধু ভালোবাসার খাতিরে ভালোবাসা পাওয়া সত্যিই কত সুখের! অন্ধ লোক এই ধরনের ভালোবাসা এবং সেবা পায়। এ ভালোবাসা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার মনে হয় কিছু না পেয়েও সব কিছু পেয়ে গেছে সে। ভালোবাসার আলোয় নিষিক্ত হয়ে তার মনে হয় সে আর আলো থেকে বঞ্চিত নয়। সে ভালোবাসা একেবারে বিশুদ্ধ এবং নিঃস্বার্থতায় পবিত্র, যে ভালোবাসা নিশ্চয়তার দৃঢ় ভিত্তিভূমির ওপর সুপ্রতিষ্ঠিত সে ভালোবাসা লাভ করার সঙ্গে সঙ্গে আর কোনও অন্ধত্ব থাকে না। যে মানুষ কোনও ভালোবাসা পায়নি সে অন্তত আলোর মাঝেও অন্ধকার দেখে আর এই অন্ধকারে তার প্রেমহীন আত্মা এক প্রেমময় আত্মাকে হাতড়ে বেড়ায় যখন দেখে এক জীবন্ত নারীমূর্তি তার প্রেমময় আত্মাকে তার দিকে প্রসারিত করে দিয়ে তার সেবার জন্য সতত প্রস্তুত হয়ে আছে, যে নারীর ওষ্ঠাধর তার ললাটকে স্পর্শ করছে, তার হাত তার সেবায় সতত নিয়ত হয়ে আছে, তার মেদুর নিশ্বাস তার দেহগাত্রের উপর নিঃশব্দে ঝরে পড়ছে, যখন দেখে তা মমতা আর শ্রদ্ধার এক নিবিড়তম অনুভূতি তার নিঃসঙ্গতার অসহায়তাকে নিঃশেষে দ্রবীভূত করে দিয়ে তাকে ঘিরে আছে সব সময়ের জন্য, তখন তার মনে হয় ঈশ্বরের অনন্ত করুণা নেমে এসেছে সেই নারীর হাতের মধ্যে। স্বয়ং ঈশ্বরই মূর্ত হয়ে উঠেছেন সে নারীর মধ্যে। এ সুখের থেকে বড় সুখ আর কী হতে পারে? তখন তার সমগ্র অন্তরাত্মা স্বর্গীয় সুষমাসিক্ত এক অদৃশ্য ফুলের মতো ফুটে ওঠে, যার রহস্যময় আলোর উজ্জ্বলতা তার দুচোখের সব অন্ধত্বকে দূর করে দেয়। সে তখন আর কোনও আলো চায় না। যে অন্ধকার ভালোবাসার ছোঁয়ায় আলোর ফুল ফুটে ওঠে জীবনে সে অন্ধকারের বিনিময়ে কোনও আলোই চায় না মানুষ। এক জ্যোতিষ্মন দেবদূতের মতো সে নারী অন্ধকে ঘিরে থাকে সব সময়, তাকে ফেলে কোথাও যায় না। মাঝে মাঝে মুহূর্তের জন্য স্বপ্নের মতো অদৃশ্য হয়ে গেলেও পরমুহূর্তেই সে আবার ফিরে আসে বাস্তবতার মাঝে। সে আসার সঙ্গে সঙ্গে তার দেহমন হতে বিচ্ছুরিত জ্যোতির উষ্ণতার এক পরম আস্বাদ পাই আমরা, তার প্রশান্ত ব্যক্তিত্বের প্রেমময় উপস্থিতি আনন্দের উচ্ছ্বসিত প্লাবন নিয়ে আসে আমাদের নীরস প্রাণে। অন্ধকারের মাঝেও তার জ্যোতিতে জ্যোতির্ময় হয়ে উঠি আমরা। আমাদের সেবা, আরাম ও স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য সে নারীর মমতামধুর ভালোবাসা বারবার ধ্বনিত হয়, তার সেবায়, বারবার সিক্ত ও অভিস্নাত হয়ে নবজীবন লাভ করি আমরা। ছায়াচ্ছন্ন এক ব্যাপ্ত বিষাদের মাঝে এক স্বর্গসুখের সন্ধান পাই আমরা।
এই স্বর্গসুখের জগৎ থেকেই পরলোকে চলে যান মঁসিয়ে বিয়েনভেনু।
মন্ত্রিউলের এক পত্রিকায় বিশপ বিয়েনভেনুর মৃত্যুসংবাদ প্রকাশিত হয়। আর তার পরদিনই মঁসিয়ে ম্যাদলেন কালো পোশাক পরে শোক পালন করতে থাকে। এ নিয়ে শহরের লোকের মুখে আলোচনা চলতে থাকে। এই ঘটনার মাঝে কেউ কেউ ম্যালেনের অতীত জীবনের রহস্যের সন্ধান করতে থাকে। শহরে অভিজাত লোকেরা তাদের বৈঠকখানায় বসে বলাবলি করতে থাকে, ম্যাদলেন দিগনের বিশপের জন্য শোক পালন করছে। বিশপ হয়তো ওর কোনও আত্মীয় ছিলেন। এতে অভিজাত সমাজে তার খাতির বেড়ে যায়। শহরের বয়স্ক মহিলারা ঘন ঘন দেখা করতে আসে ম্যালেনের সঙ্গে। যুবতী মেয়েরা তাকে হেসে অভিবাদন জানাতে থাকেন।
