এইভাবে ম্যালেনের জীবনে উন্নতির তৃতীয় স্তর শুরু হল। এ অঞ্চলে প্রথম এসে যে যখন ব্যবসা শুরু করে তখন সে ছিল পিয়ের ম্যাদলেন। তার পর তার ধনসম্পদ যখন বাড়তে থাকে, ব্যবসায় উন্নতি হতে থাকে তখন সে হয়ে ওঠে মঁসিয়ে ম্যাদলেন অর্থাৎ শহরের এক গণ্যমান্য ব্যক্তি। পরে সে হয়ে উঠল শহরের সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি মঁসিয়ে লে মেয়র।
.
৩
কিন্তু মেয়র হলেও বিশেষ কোনও পরিবর্তন দেখা দিল না ম্যাদলেনের জীবনযাত্রায়। এখানে প্রথম আসার দিন যেমন ছিল তেমনি সাদাসিধে রয়ে গেল সে। তার গায়ের রংটা ছিল শ্রমিকদের গায়ের রঙের মতো তামাটে। কিন্তু মুখের ওপর ছিল চিন্তাশীল দার্শনিকের ছাপ। সে সবসময় একটা চওড়া টুপি আর গলা পর্যন্ত বোম লাগানো লম্বা ঝুলওয়ালা কোট পরত। সে মেয়রের কাজ করে যেত, কিন্তু কথা কম বলত। সে যতদূর সম্ভব অপরের অভিবাদন বা সৌজন্যমূলক কথাবার্তা এড়িয়ে চলত। যথাসম্ভব নীরবে সে ভিক্ষা বা দানের জিনিস অভাবগ্রস্ত লোকদের বিতরণ করত। মেয়েরা তার সম্বন্ধে বলাবলি করত, লোকটা যেন এক দয়ালু ভাবুক। অবসর সময়ে গ্রামাঞ্চলে গিয়ে একা একা বেড়িয়ে সে সবচেয়ে আনন্দ পেত।
সে সবসময় একা খেত। তার পাশে একটা বই থাকত খাবার সময়। তার একটা বাছাই করা বইয়ের ছোটখাটো লাইব্রেরি ছিল। সে বই ভালোবাসত। বই-ই ছিল আর একমাত্র বন্ধু যারা তার কাছ থেকে কিছু চাইত না। হাতে টাকা আসার সঙ্গে সঙ্গে তার অবসর সময় বেড়ে যায় এবং সেই সময়টা সে বই পড়ে সময়ের সদ্ব্যবহার করে আত্মোন্নতির চেষ্টা করত। তার ভাষা আগের থেকে আরও মার্জিত, ভদ্র, স্পষ্ট এবং ন্যায়সংগত হয়ে উঠল।
সে যখন একা একা বেড়াতে বার হত তখন তার হাতে একটা ছোেট শিকারি বন্দুক থাকত। কিন্তু সেটা কদাচিৎ ব্যবহার করত। তবে কখনও দরকার হলে সেটা ব্যবহার করলে তা নির্ভুল লক্ষ্যের পরিচয় দিত। সে কখনও কোনও নিরীহ নির্দোষ প্রাণী বধ করত না অথবা ছোট ছোট পাখি মারত না।
তার বয়স যৌবন পার হয়ে গেলেও তার গায়ে শক্তি ছিল প্রচুর। কোনও লোক বিপদে পড়লে সে তার দু হাত বাড়িয়ে তাকে সাহায্য করত। কোনও ঘোড়া পড়ে গেলে সে ঘোড়াটাকে তুলে দাঁড় করিয়ে দিত। কোনও গাড়ির চাকা মাটিতে বসে গেলে সে কাঁধ না দিয়ে হাত দিয়ে ধরে সেটাকে টেনে তুলে দিত। কোনও বলদ পালিয়ে গেলে সে তার শিং ধরে আটকে দিত তাকে। কোনও গাঁয়ের ভেতর গেলে সে গায়ের ছেলেমেয়েরা তাকে দেখে খুশি হত, তার চারদিকে মাছির ঝাঁকের মতো ভিড় করত।
সে নিশ্চয় আগে গাঁয়ে বাস করত। কারণ সে চাষিদের চাষের কাজ সম্বন্ধে প্রায়ই যেসব উপদেশ দিত তাতে তার চাষ সম্বন্ধে যে জ্ঞান আছে তা বোঝা যেত। ফসলের উপর কিভাবে ওষুধ ছড়িয়ে পোকা নষ্ট করতে হয় তা সে চাষিদের বলে দিত। কিভাবে জমিতে নুন দিতে হয় তা-ও সে বলে দিত। ফসলভরা জমিতে যেসব আগাছা গজিয়ে উঠে ফসল নষ্ট করে তার উপায় বলে দিত ম্যাদলেন। ইঁদুরের উৎপাত বন্ধ করারও ব্যবস্থা বলে দিত।
একদিন মাঠের ধার থেকে ম্যাদলেন দেখল একদল চাষি মাঠে পাটশাকের মতো এক ধরনের শুকনো আগাছা তুলে ফেলে দিচ্ছে। তা দেখে ম্যাদলেন তাদের বলল, এই চারাগাছগুলো এখন শুকিয়ে গেছে। কিন্তু কাঁচা অবস্থায় এর শাকগুলো রান্না করে খাওয়া যায়। এর গাছগুলো থেকে শনের মতো একরকমের সুতো বার হয়। সেই সুতো থেকে কাপড় পর্যন্ত বোনা যায়। শাকগুলো গবাদিপশুরা কাঁচা খেতে পারে। এর বীজগুলো ভূমির ধারে ধারে বা ফাঁকা জায়গায় ছড়িয়ে দিলেই প্রচুর পরিমাণে এই গাছ জন্মায়। এর জন্য আলাদা করে চাষ করতে বা যত্ন করতে হয় না।
ছেলেমেয়েরা ম্যাদলেনকে বেশি ভালোবাসত। কারণ সে খড় আর নারকেলের ভোলা থেকে খেলনা তৈরি করতে পারত।
যে কোনও মৃত্যুই দুঃখ জাগাত তার মনে। যে কোনও সময়ে চার্চের দরজায় শোকসূচক কালো রঙ দেখলেই ভেতরে ঢুকে পড়ত সে। কোনও লোক মারা গেলে মৃতের আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে মিশে গিয়ে সে-ও শোক প্রকাশ করত। কারও শোক-দুঃখ দেখলেই তার অন্তর কাঁদত। তার সহজাত বিষাদ আর শোকের সঙ্গীত যেন এক সুরে বাঁধা ছিল। মৃত্যুর অন্তহীন শূন্য গহ্বরের এপারে দাঁড়িয়ে কয়েকজন জীবিত মানুষ যে অন্ত্যেষ্টিকালীন গান গাইত সে গানের সকরুণ সুরধারা ম্যাদলেনের মনটাকে যেন মৃত্যুর ওপারে অনন্ত অজানিত এক পরলোকের দিকে ভাসিয়ে নিয়ে যেত।
অনেক সময় অনেক দয়ার কাজ খুব সতর্কভাবে গোপন করত ম্যাদলেন, যেন সে কাজ এক ঘৃণ্য কুকর্ম। অনেক সময় সে কোনও গরিব লোকের বাড়িতে দরজা ঠেলে চুপি চুপি ঢুকে সকলের অলক্ষ্যে অগোচরে টেবিলের উপর একটা স্বর্ণমুদ্রা রেখে আসত। বাড়ির মালিক বাইরে থেকে এসেই ঘরের দরজা খোলা দেখে ভাবত বাড়িতে চোর ঢুকেছিল। কিন্তু পরে সে আশ্চর্য হয়ে দেখত টেবিলের উপর স্বর্ণমুদ্রা পড়ে রয়েছে। কোনও চোর যদি ঢুকে থাকে তো সে চোর বাড়ির কোনও জিনিসপত্র বা টাকাকড়িতে হাত দেয়নি, বরং তাকে এক স্বর্ণখণ্ড দান করে গেছে। বুঝত সে চোর হল পিয়ের ম্যাদলেন।
সকলের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন হলেও ম্যাদলেন ছিল বড় বিষণ্ণ। লোকে বলত, লোকটা ধনী হলেও অহঙ্কারী নয়। সৌভাগ্যবান হলেও সে সুখী নয়
