আগে শহরের হাসপাতালটা অর্থাভাবে ভুগছিল। ম্যাদলেন টাকা দিয়ে দশটা বেড় বাড়িয়ে দিল। মন্ত্রিউলের যে অঞ্চলে ম্যাদলেন থাকত সেখানে মাত্র একটা স্কুল ছিল। ম্যাদলেন সেখানে আরও দুটো স্কুল গড়ে তুলল–একটা ছেলেদের আর একটা মেয়েদের জন্য। সে তার টাকা থেকে স্কুলমাস্টারদের বেতন বাড়িয়ে দ্বিগুণ করে দিল। তাছাড়া অকর্মণ্য, অনাথ ও নিরাশ্রয় বৃদ্ধদের জন্য এক আবাস স্থাপন করল যেখানে তারা বিনা পয়সায় থাকা-খাওয়ার সুযোগ পেত। নতুন কারখানা স্থাপনের সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিকদের থাকার জন্য কোয়ার্টার করে দিল। তখনকার দিনে ফ্রান্সে অসহায় দুস্থ বৃদ্ধদের এ ধরনের কোনও আবাস ছিল না।
ম্যাদলেন যখন প্রথম কাজ শুরু করে তখন শহরের সবাই বলত, লোকটা টাকা উপায় করতে এসেছে। সে ধনী হতে চায়। কিন্তু যখন তারা দেখল যে নিজে সব টাকা সঞ্চয় না করে এখানকার জনসাধারণের সর্বাঙ্গীণ উন্নতি সাধন করতে চায় তখন তারা বলাবলি করতে লাগল ও কোনও রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ পূরণ করতে চায়। অনেকে ভাবল এ কথার কিছুটা যুক্তি আছে, কারণ ম্যাদলেনের ধর্মের দিকে মতিগতি ছিল। সে প্রতি রবিবার সকালে চার্চে গিয়ে সমবেত প্রার্থনাসভায় যোগদান করত। স্থানীয় ডেপুটি সব বিষয়ে ম্যালেনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করত। ম্যাদলেন হাসপাতালে দশটা বেড রোগীদের জন্য দান করায় সে-ও দুটো বেড দান করে। ম্যাদলেন নিয়মিত চার্চে যাওয়ায় সে-ও সকাল-সন্ধে প্রার্থনায় যোগ দিত। অথচ আগে সে ঈশ্বরে বিশ্বাসই করত না।
১৮১৯ সালে গুজব শোনা গেল পুলিশের বড় কর্তাদের পরামর্শে এবং জনসেবার কাজ দেখে রাজা মঁসিয়ে ম্যাদলেনকে মন্ত্রিউলের মেয়র মনোনীত করেছেন। যারা আগে বলত ম্যাদলেনের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ আছে তাদের ধারণা সত্যি হয়েছে জেনে তারা খুশি হল। সমস্ত শহর উত্তেজনায় ফেটে পড়ল। গুজবটা ক্রমে সত্যে পরিণত হল। কয়েকদিন পরে লে মন্ত্রিউল পত্রিকায় রাজার মনোনয়নের খবরটা প্রকাশিত হল। কিন্তু পরের দিন মঁসিয়ে ম্যাদলেন এই মেয়রের পদ প্রত্যাখ্যান করল।
১৮১৯ সালে ম্যালেনের সব শিল্পকর্ম এক শিল্প প্রদর্শনীতে দেখানো হল। যেসব নতুন পদ্ধতি সে উদ্ভাবন করে সেইসব পদ্ধতি বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়। জুরিদের পরামর্শক্রমে রাজা আবার ম্যাদলেনকে লিজিয়ন দ্য অনার বা গ্র্যান্ড ক্রস উপাধি দান করার কথা ঘোষণা করেন। অনেকে তখন বলতে থাকে ম্যাদলেন মেয়রের পদ প্রত্যাখ্যান করলেও এই সম্মান ঠিক গ্রহণ করবে। ও হয়তো এই ধরনের সম্মানই চাইছিল। কিন্তু ম্যাদলেন গ্র্যান্ড ক্রসও প্রত্যাখ্যান করে।
আসলে ম্যাদলেন সকলের কাছে একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়াল। যারা তার আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বরাবর জল্পনা কল্পনা করত এবং নানারকম ভবিষ্যদ্বাণী করত, তাদের সব ধারণা একে একে ব্যর্থ প্রতিপন্ন হওয়ায় তারা এই বলে কোনওরকমে মুখরক্ষা করে বলত, যাই হোক, ও যা হোক কিছু একটা চায়, মতলব কিছু একটা আছে।
সারা জেলা ম্যালেনের কাছে ঋণী এবং সারা জেলার গরিবরাও তার কাছে ঋণী। ম্যালেনের অবদান অমূল্য এবং তার জন্য তাকে সম্মান দেওয়া উচিত। তার কারখানার কর্মীরা তাকে শ্রদ্ধা করত। ম্যাদলেন যখন ব্যবসায়ে লাভ করতে করতে প্রচুর ধনী হয়ে ওঠে তখন শহরের লোকেরা তাকে সম্মান করে ‘সিয়ে ম্যাদলেন’ বলত। কিন্তু ম্যালেনের কারখানার সব কর্মী ও তাদের ছেলেমেয়েরা আগের মতোই তাকে পিয়ের ম্যাদলেন বলত। এই নাম শুনেই সবচেয়ে খুশি হত সে। তার মুখে হাসি ফুটে উঠত। সে ক্রমে বড় হয়ে উঠতেই বিভিন্ন জায়গায় যাবার জন্য তার কাছে নিমন্ত্রণ আসতে লাগল। সমাজের উঁচু তলার লোকরা তার খোঁজ করতে লাগল। মন্ত্রিউলের কিছু অভিজাত বাড়ির বৈঠকখানার যে দরজা সাধারণ ব্যবসায়ীদের সামনে উন্মুক্ত হত না কখনও সে দরজা লক্ষপতি মঁসিয়ে ম্যালেনের জন্য উন্মুক্ত ছিল সব সময়। অনেকে অনেক জায়গায় তাকে নিয়ে যাবার জন্য তার কাছে আসত। কিন্তু সবার সব নিমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করত সে।
এ নিয়ে তখন আবার এক লোকনিন্দার সৃষ্টি হয়। নিন্দুকরা বলতে থাকে, লোকটা আসলে অজ্ঞ আর অশিক্ষিত। কেউ জানে না সে কোথা থেকে এসেছে। উচ্চ ভদ্র সমাজে গিয়ে কিভাবে ব্যবহার করতে হয়, তা জানে না। সে লিখতে-পড়তে পারে কি না, তাতেও সন্দেহ আছে।
নিন্দুকরা সব সময়ই তাদের নিন্দার ভিত্তি হিসেবে একটা করে যুক্তি খুঁজে বার করত। প্রথমে যখন সে ব্যবসা করে টাকা করতে থাকে তখন তারা বলত, লোকটা পাকা ব্যবসাদার। যখন সে জনকল্যাণকর কাজে অনেক টাকা দান করতে থাকে তখন তারা বলত, লোকটা রাজনীতিতে নেমে নেতা হতে চায়। যখন সম্মান প্রত্যাখ্যান করে তখন তারা বলত লোকটা আরও বেশি সম্মান চায়। আবার সে যখন দ্র সমাজের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করে তখন তারা বলত লোকটা নিরক্ষর চাষি।
১৮২০ সালে অর্থাৎ মন্ত্রিউলে তার আসার পাঁচ বছর পর সে অঞ্চলের শিল্পোন্নয়নে তার অবদান এমনই আশ্চর্যজনক হয়ে ওঠে এবং তার জনহিতকর কাজের জন্য জনগণ তার এমনই প্রশংসা করতে থাকে যে রাজা তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে তাকে আবার মন্ত্রিউলের মেয়র মনোনীত করেন। কিন্তু এবারও সে মেয়রের পদ প্রত্যাখ্যান করে। তবে এবার তার প্রত্যাখ্যান পুলিশের বড় কর্তারা স্বীকার করল না। তাছাড়া শহরের বিশিষ্ট লোকেরা এবং সাধারণ জনগণ তার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকায় শেষ পর্যন্ত সে মেয়রের পদ গ্রহণে রাজি না হয়ে পারল না। একদিন রাস্তার ধারের একটি বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে এক বুড়ি ম্যাদলেনকে বলতে থাকে, মেয়রের কাজ হল জনগণের উপকার করা। সুতরাং জনগণের উপকার করার এই সুযোগ ছেড়ে দিতে চাইছ কেন তুমি?
