পাড়ার লোকেরা তাকে বলত লা লুয়েত্তে অর্থাৎ লার্ক পাখি। গাঁয়ের লোকেরা এই প্রতীক নামটাই তার পক্ষে প্রযোজ্য ভেবেছিল, কারণ সে ছিল লার্ক পাখির মতোই সশঙ্কচিত্ত, কম্পমান এবং ক্ষীণকায় এবং লার্ক পাখির মতো প্রতিদিন সকাল হওয়ার আগেই উঠত। কিন্তু সে ছিল এমনই পাখি যে কখনও কোনও গান গাইত না।
১.৫ মঁতফারমেলের হোটেলে
পঞ্চম পরিচ্ছেদ
১
যে মা একদিন মঁতফারমেলের হোটেলে তার শিশুকন্যাকে নিশ্চিন্তে রেখে চলে গিয়েছিল সে মায়ের কী হল এখন আমরা তা দেখব।
পথনার্দিয়েরের কাছে তার মেয়েকে যেদিন রেখে ফাঁতিনে চলে যায় মন্ত্রিউল-সুর-মেরে সেটা হল ১৮১৮ সাল।
তখন থেকে দশ বছর আগে মন্ত্রিউল ছেড়ে চলে আসে ফাঁতিনে। এদিকে সে যখন ধীরে ধীরে দারিদ্রের গভীর থেকে গভীরতর প্রদেশে ডুবে যেতে থাকে তখন তাদের এই জেলা শহরটা সমৃদ্ধশালী হয়ে উঠতে থাকে ধীরে ধীরে। গত দুবছরের মধ্যে ওই অঞ্চল শিল্পের দিক থেকে এমনই উন্নত হয়ে ওঠে যে ওই অঞ্চলের অধিবাসীদের জীবনে এক বিরাট পরিবর্তন নিয়ে আসে।
মন্ত্রিউল শহরের পুরনো আঞ্চলিক শিল্প হল জার্মানির কালো কাঁচ আর ইংল্যান্ডের কালো পালিশ করা এক ধরনের ছোট ছোট বল, যা দিয়ে জপের মালা তৈরি হয়। কিন্তু কাঁচামালের দাম অত্যধিক বেড়ে যাওয়ায় এ শিল্পের কোনও উন্নতি হচ্ছিল না এবং শ্রমিকদের ঠিকমতো বেতন দেওয়া যাচ্ছিল না। কিন্তু সম্প্রতি এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। ১৮১৫ সালের শেষের দিকে শহরে কোথা থেকে একজন নবাগত আসে যে এই শিল্পের। ক্ষেত্রে কাঁচামালের রদবদল করে। সে আগে ব্যবহৃত গাছের রস থেকে তৈরি এক ধরনের আঠার পরিবর্তে গালা ব্যবহার করতে থাকে। তাতে উৎপাদন ব্যয় অনেক কমে যাওয়ায় শ্রমিকদের বেশি করে বেতন দিতে পারা যায়। ফলে এ অঞ্চলের অধিবাসীরা উপকৃত হয়। উৎপন্ন শিল্পদ্রব্যের দাম কমিয়ে দেওয়ায় বেশি পরিমাণে মাল বিক্রি হতে থাকায় লাভ বেশি হতে থাকে। ফলে মাত্র তিন বছরের মধ্যেই নবাগত এ অঞ্চলে এক বিরাট শিল্পবিপ্লব নিয়ে আসে। সে কম টাকায় উৎপাদকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে প্রচুর লাভ করে ধনী হয়ে ওঠে এবং সেই সঙ্গে তার চারপাশের গোটা অঞ্চলটাই সমৃদ্ধশালী হয়ে উঠতে থাকে তার পথ অনুসরণ করে।
এ জেলার কোনও লোক তাকে চেনে না। তার জন্মপরিচয়ের কিছুই জানা যায়নি। সে কিভাবে কোথায় জীবন শুরু করে তা-ও কেউ জানতে পারেনি। লোকে শুধু বলত মাত্র কয়েকশ ফ্র্য নিয়ে এ শহরে সে প্রথম আসে। এই অল্প টাকা মূলধন হিসেবে খাঁটিয়ে কৌশলে এবং বুদ্ধি খাঁটিয়ে শিল্পে উন্নতি করে ধনসম্পদের অধিকারী হয়ে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে এ অঞ্চলের লোকদেরও উন্নতি হয়।
সে যখন প্রথম এখানে আসে তখন তার চেহারা ও বেশভূষা একজন শ্রমিকের মতো। ছিল। তখন ছিল ডিসেম্বর মাস। সেই ডিসেম্বরের কোনও এক সন্ধ্যায় সে যখন সকলের একরকম অলক্ষ্যে শহরে এসে ঢোকে, সেই সময় শহরে ভয়াবহ এক অগ্নিকাণ্ড ঘটে। তখন এই নবাগত ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়ে নিজের জীবন বিপন্ন করে আগুনে ঝাঁপ দিয়ে দুটি বিপন্ন শিশুকে উদ্ধার করে আনে। তার অবশ্য বিশেষ কোনও ক্ষতি হয়নি। সেই শিশু দুটি ছিল পুলিশ বিভাগের এক ক্যাপ্টেনের। তাই কেউ তার পরিচয়পত্র দেখতে চায়নি এবং পুলিশের কর্তারা সন্তুষ্ট ছিল তার প্রতি। সবাই তাকে পিয়ের ম্যাদলেন বলে। ডাকত। প্রথম আসার দিনে তার পিঠে একটা ব্যাগ আর হাতে একটা ছড়ি ছিল।
.
২
তার বয়স হবে প্রায় পঞ্চাশ এবং আচরণ ও কথাবার্তা থেকে তাকে সৎ প্রকৃতির বলে মনে হত।
শিল্পের দ্রুত উন্নতি হওয়ায় মন্ত্রিউল শহর বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ এক বাণিজ্যকেন্দ্র হয়ে উঠল। স্পেন থেকে অনেক অর্ডার আসতে লাগল। সেখানে উৎপন্ন শিল্পদ্রব্যের চাহিদা বেড়ে যেতে লাগল দিনে দিনে। বিক্রির পরিমাণ এত বেড়ে গেল যে পিয়ের ম্যাদলেন আরও দুটো নতুন কারখানা তৈরি করল–একটা পুরুষদের আর একটা শুধু নারীদের জন্য। বেকার লোকরা দলে দলে কাজের জন্য আবেদন করতেই তারা কাজ পেয়ে গেল এবং জীবন ধারণের উপযোগী ভালো বেতন পেতে লাগল। ম্যাদলেন চাইল পুরুষ-নারী সব কর্মীরা সৎ হবে, তাদের নীতিবোধ উন্নত হবে। পুরুষ ও নারী কর্মীদের পৃথকভাবে কাজ করার ব্যবস্থা করায় নারীদের শালীনতা হানির কোনও অবকাশ রইল না। এ ব্যাপারে ম্যাদলেন ছিল অনমনীয় ও আপোসহীন। কারও কোনও ত্রুটি-বিচ্যুতি সহ্য করত না সে। মন্ত্রিউল শহরে এক সৈন্যনিবাস থাকায় নারীদের চরিত্রহানির অনেক সুযোগ ছিল বলে ম্যাদলেন বিশেষভাবে কড়াকড়ি করত। যে শহর একদিন কাজকর্মের সুযোগ হারিয়ে স্থিতিশীল এক আবর্তে পরিণত হয়ে উঠেছিল আজ তা এক উন্নত শিল্পের ছত্রছায়ায় কর্মচঞ্চল হয়ে ওঠে। ক্রমে সমস্ত অঞ্চল থেকে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব দূর হয়ে যায়। প্রত্যেকের হাতেই কিছু না কিছু পয়সা এল। প্রতিটি ঘরে কিছু সুখশান্তি এল।
কর্মব্যস্ততার মাঝে অর্থসঞ্চয়ের দিকেও মন দিল ম্যাদলেন। ব্যবসা ছাড়া নিজে আলাদা করে একটা মোটা অঙ্কের টাকা ব্যাংকে রেখে দিল। ১৮২০ সালে লোকে জানত লাফিত্তের ব্যাংকে তার নামে মোট ৬ লক্ষ ৩৫ হাজার ফ্ৰাঁ জমা ছিল। তবে টাকাটাই তার একমাত্র লক্ষ্য ছিল না। ব্যবসার উন্নতিই ছিল তার সবচেয়ে বড় লক্ষ্য। ব্যাংকে ওই জমা টাকা ছাড়াও সে শহরের গরিবদের অবস্থার উন্নতি সাধনের জন্য এক লক্ষ টাকা খরচ করে।
