আসলে ওই যুগটায় নামকরণের এক অরাজকতা চলছিল। এটাকে এক সামাজিক ব্যাধির উপসর্গ বলা যেতে পারে, আবার আবার তা রোমান্টিক উপন্যাস পাঠেরও ফল হতে পারে। যার ফলে গ্রামের চাষিদের ছেলেদের নাম রাখা হত আর্থার, আলফ্রেড, আলফনসে। অন্যদিকে কাউন্ট পরিবারের ছেলেদের নাম রাখা হত টমাস, পিয়ের অথবা জ্যাক। দুটি সামাজিক শ্রেণির মধ্যে নামকরণের এই বিপরীতমুখী ভাব দেশে সাম্যের বৈপ্লবিক ভাবধারা প্রসারের প্রত্যক্ষ ফল ছাড়া আর কিছুই নয়। এক নতুন যুগের হাওয়া বইছিল যেন সর্বত্র। জীবনের যে কোনও ক্ষেত্রে যে কোনও বৈপরীত্যের পেছনে খোঁজ করলেই ফরাসি বিপ্লবের এক গভীরতর তাৎপর্য অবশ্যই খুঁজে পাব আমরা।
.
৩
শুধু অকুণ্ঠ দুর্নীতিপরায়ণতা সমৃদ্ধি আনতে পারে না কখনও। থেনার্দিয়েরদের হোটেলের অবস্থা দিনে দিনে খারাপের দিকে যাচ্ছিল।
ফাঁতিনে তার মেয়ের জন্য যে সাতান্ন ফ্রী দিয়ে গিয়েছিল তাতে তাদের অনেকটা উপকার হয়। তাতে এক ঋণের মামলা থেকে বেঁচে যায়। কিন্তু এক মাস পর আবার অভাব দেখা দিল তাদের। সংসারে একবারে টাকা নেই, কোনও আয় নেই। মাদাম থেনার্দিয়ের কসেত্তের দামি পোশাকগুলো সব প্যারিসে নিয়ে গিয়ে বন্ধক দিয়ে ষাট ফ্রাঁ নিয়ে এল। ওই টাকাটাও ফুরিয়ে গেল থেনার্দিয়ের দম্পতি কসেত্তেকে অনাথ শিশু হিসেবে দেখতে লাগল। তাকে তাদের মেয়েদের ছেঁড়া ফেলে দেওয়া জামাগুলো পরতে দিত। তাকে কুকুর-বিড়ালের সঙ্গে টেবিলের তলায় খেতে দেওয়া হত একটা কাঠের পাত্রে।
ইতোমধ্যে মন্ত্রিউলে ফাঁতিনে একটা চাকরি পায়। সেখান থেকে প্রতি মাসেই সে তার মেয়ের খবর পাবার জন্য থেনার্দিয়েরদের চিঠি লিখত। প্রতিবারই তার চিঠির উত্তরে থেনার্দিয়েররা ফাঁতিনেকে জানাত তার মেয়ের স্বাস্থ্য খুব ভালো আছে।
ছয় মাস কেটে যাবার পর আগের প্রতিশ্রুতি অনুসারে ফাঁতিনে আর মেয়ের মাসিক খরচ হিসেবে ছয় ফ্রাঁ’র পরিবর্তে সাত ফ্ৰাঁ করে পাঠাতে থাকে। এইভাবে এক বছর কেটে গেলে থেনার্দিয়ের ফাঁতিনের কাছ থেকে মাসিক বারো ফ্রাঁ করে দাবি করে। ফাঁতিনেকে যখন জানানো হল তার মেয়ে বেশ সুখেই আছে তখন সে নির্বিবাদে তা দিয়ে যেতে লাগল।
এমন অনেক মানুষ আছে সংসারে যারা ভালোবাসার অভাব ঘৃণা দিয়ে পূরণ করে। মাদাম থেনার্দিয়ের যখন দেখল কসেত্তে তার মেয়েদের সব অধিকারে ভাগ বসাতে এসেছে তখন সে তাকে ঘৃণা করতে থাকে। মাতৃস্নেহের এটাই কুৎসিত স্বার্থপরতার দিক। কসেক্তের দাবি খুবই কম হলেও মাদাম থেনার্দিয়ের ভাবল সে দাবি পূরণ করা মানে তার মেয়েদের একটা প্রাপ্য অংশ থেকে বঞ্চিত করা। তার মনে হল কসেত্তে যেন তার মেয়েদের প্রয়োজনীয় প্রাণবায়ুর একটা অংশ কেড়ে নিতে এসেছে। সাধারণ নারীদের মতো বাদাম থেনার্দিয়েরের অন্তরটাও ছোট ছিল। সে অন্তরে বেশি দয়া বা স্নেহমমতার স্থান ছিল না।
মাদাম থেনার্দিয়ের কসেত্তেকে প্রায়ই তিরস্কার এবং মারধর করত। কসেত্তে তার প্রতিটি পদক্ষেপে শুধু ভৎর্সনা পেত আর তারই সামনে তার মেয়েদের আদর করত মাদাম থেনার্দিয়ের।
মা’র দেখাদেখি এপপানিনে আর আজেলমা নামে মেয়ে দুটিও দুর্ব্যবহার করত কসেত্তের সঙ্গে।
এইভাবে দুটি বছর কেটে গেল।
গায়ের সবাই বলাবলি করতে লাগল, থেনার্দিয়েররা খুব ভালো লোক। তারা ধনী নয়, তাদের অবস্থা ভালো নয়, কিন্তু তারা একটা অনাথা মেয়েকে মানুষ করছে। মেয়েটাকে বোঝা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া হয় তাদের ওপর।
গাঁয়ের লোকরা ভাবত কসেত্তের মা তাকে ত্যাগ করে চলে গেছে।
এদিকে থেনার্দিয়েররা কোনওক্রমে জানতে পারে কসেত্তে তার কুমারী মাতার এক অবৈধ সন্তান। এরপর কসেত্তে’র মাসিক খরচ বারো থেকে পনেরো ফ্রতে বাড়িয়ে দেয়।
থেনার্দিয়ের একদিন তার স্ত্রীকে বলে, মেয়েটি বড় হচ্ছে এবং তার খাওয়াও বেড়েছে। আমার আরও টাকা চাই তার জন্য। তা না হলে মেয়েটাকে তার মা’র কাছে দিয়ে আসব।
এইভাবে বছরের পর বছর কেটে যেতে লাগল। কসেত্তে’র বয়স যেমন বাড়তে লাগল তেমনি তার দুরবস্থাও বেড়ে যেতে লাগল। তার বয়স পাঁচ হতেই বাড়িতে তাকে। দিয়ে ঝি-এর কাজ করানো হতে লাগল। পাঁচ বছরের শিশু কাজ করতে না পারলেও তখনকার কালে অনাথা মেয়েদের এইভাবে খাটানো হত এবং এইভাবে তাদের জীবিকার্জন করতে হত। আমরা সম্প্রতি দামোনার্দ নামে এক যুবককের বিচারকাহিনী থেকে জানতে পারি সে মাত্র পাঁচ বছর বয়সে নিরাশ্রয় ও অনাথ হয়ে খেটে জীবিকার্জন করত এবং মাঝে মাঝে চুরি করত।
কসেত্তেকে অনেক ফাইফরমাশ খাটতে হত। ঘরের মেঝে মুছতে হত, উঠোন ঝট দিতে হত। থালা-ডিশ ধুতে হত। বোঝা বইতে হত। থেনার্দিয়ের দম্পতি তাকে দিয়ে বেশি করে এই কাজ করাত কারণ সম্প্রতি তার মা নিয়মিত প্রতি মাসে টাকা পাঠাত না। খরচের টাকা দু-এক মাসে বাকি পড়ে যায়।
ফাঁতিনের যদি তিন বছর পর মঁতফারমলে আসত তা হলে সে তার মেয়েকে দেখে চিনতেই পারত না। সুন্দর ও স্বাস্থ্যোজ্জ্বল অবস্থায় যে মেয়েকে সে হোটেলে রেখে যায় সে মেয়ে এখন রোগা আর ম্লানমুখ হয়ে গেছে। থেনার্দিয়েররা বলত, মেয়েটা বড় চতুর আর চঞ্চল।
ক্রমাগত দুর্ব্যবহার তাকে বিক্ষুব্ধ করে তোলে এবং ক্রমাগত দুঃখভোগ তাকে কুৎসিত করে তোলে। শুধু চোখ দুটোর সৌন্দর্য রয়ে গিয়েছিল। তাতে তার দুরবস্থাটা আরও বেশি করে প্রকটিত হয়ে উঠত। কারণ চোখ দুটো বড় বড় হওয়ার জন্য তাতে তার অন্তরে বেদনাটা বেশি পরিমাণে প্রকাশ পেত। প্রতিদিন শীতের সকালে সূর্য ওঠার আগেই যখন ছয় বছরের একটা মেয়ে ছেঁড়াখোঁড়া পোশাক পরে শীতে কাঁপতে কাঁপতে হোটেলের বাইরের দিকের বারান্দাটা একটা বড় ঝাঁটা দিয়ে ঝাঁট দিত তখন তাকে দেখে যে কোনও লোকের অন্তরটা বিদীর্ণ হয়ে যেত দুঃখে। আঁটাটা এত বড় ছিল যে সে তার। ছোট হাতে ভালো করে ধরতেই পারত না।
