মাদাম থেনার্দিয়ের বলল, কথাটা ভেবে দেখতে হবে আমাদের।
ফাঁতিনে বলল, আমি ওর জন্য মাসে ছয় ফ্রাঁ করে দিতে পারি।
এমন সময় বাড়ির ভেতর থেকে এক পুরুষকণ্ঠ শোনা গেল, মাসিক সাত ফ্রাঁ’র কম হবে না, আর দু মাসের অগ্রিম দিতে হবে।
মাদাম থেনার্দিয়ের বলল, সাত ফ্ৰাঁ করে হলে ছয় মাসে বিয়াল্লিশ ঐ লাগবে।
ফাঁতিনে বলল, ঠিক আছে।
সেই পুরুষকণ্ঠ আবার বলল, আরও পনের ফ্রাঁ বাড়তি লাগবে।
মাদাম থেনার্দিয়ের বলল, তা হলে সবসুদ্ধ সাতান্ন ফ্রাঁ লাগছে।
কসেত্তের মা ফাঁতিনের বলল, ঠিক আছে তাই পাবে। আমার কাছে মোট আশি ফ্রাঁ আছে। তোমাদের সাতান্ন ফ্রাঁ দিয়ে দিলে যা থাকবে তাতে আমি পায়ে হেঁটে গাঁয়ে পৌঁছতে পারব। আমি চাকরি পেলে কিছু জমিয়েই ওকে দেখতে আসব।
পুরুষের সেই কণ্ঠস্বর ভেতর থেকে আবার বলল, ওরা পোশাক-আশাক আছে তো?
মাদাম থেনার্দিয়ের ফাঁতিনেকে বলল, ও হল আমার স্বামী।
ফাঁতিনে বলল, আমি তাই অনুমান করেছিলাম। ওর পোশাক যথেষ্ট আছে। এক সম্ভ্রান্ত মহিলার মতো ওর সিল্কের পোশাকও আছে।
পুরুষ কণ্ঠস্বর বলল, ওগুলো আমাদের দিয়ে যাবে।
ফাঁতিনে বলল, অবশ্যই দিয়ে যাব। আমি কি আমার মেয়েকে নগ্ন অবস্থায় রেখে যাব ভাবছ?
যে পুরুষ এতক্ষণ ঘরের ভেতর থেকে কথা বলছিল সে এবার দরজার কাছে এসে দেখা দিয়ে বলল, ঠিক আছে।
এইভাবে সব বোঝাপড়া বা দরাদরি শেষ হয়ে গেল। ফাঁতিনে রাতটা হোটেলেই কাটাল। তার পর সকাল হতেই সব টাকা মিটিয়ে দিয়ে হোটেল থেকে চলে গেল। তার মেয়ের পোশাকগুলো বার করে দিতে ব্যাগটা হালকা হয়ে গেল। ফাঁতিনে বলল, সে তাড়াতাড়ি চলে আসবে তার মেয়েকে দেখতে। তবু যাবার সময় ফাঁতিনের বুকে ছিল এক হতাশার বোঝ। ফাঁতিনে যখন সকালে হোটেল থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল তখন হোটেলের পাশের বাড়ির একজন লোক তাকে দেখে মাদাম থেনার্দিয়েরকে বলে, আমি এই মাত্র দেখলাম একটি মেয়ে কাঁদতে কাঁদতে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছিল তার অন্তরটা ফেটে যাচ্ছে।
থেনার্দিয়ের এরপর তার স্ত্রীকে বলল, তুমি মেয়েগুলোকে নিয়ে বেশ ফাঁদ পেতেছিলে। তবে আরও পঞ্চাশ ফ্রাঁ হলে ভালো হত।
মাদাম থেনার্দিয়ের বলল, কিন্তু তার মানেটা কী হল।
.
২
ব্যাগ যত ভালোই হোক, একটা ছোট্ট ইঁদুর সেটাকে কেটে ফেলতে পারে ধীরে ধীরে।
এই থেনার্দিয়েররা কে ছিল?
এখন আমরা তাদের কথা বলব সংক্ষেপে। ফলে তাদের চরিত্রের পুরো চিত্রটা পাওয়া যাবে।
থেনার্দিয়েররা সমাজের এমন একটা স্তরের মানুষ যে স্তরটি উচ্চ আর নীচ এই দুই পরস্পরবিরুদ্ধ শ্রেণির সংমিশ্রণে গড়ে উঠেছে। সমাজের উঁচুতলার যেসব লোক কোনও কারণে যারা নিচে নেমে গেছে অথবা যেসব নিচু তলার লোকেরা কোনওক্রমে কিছুটা উপরে উঠে এসেছে ওরা তাদের মাঝামাঝি এবং তাদের থেকে কিছু কিছু উপাদান নিয়ে গড়ে উঠেছিল ওদের শ্রেণিগত স্তরটা। ফলে তাদের ভালো গুণগুলো কিছুই পায়নি, পেয়েছিল শুধু তাদের দোষগুলো। ওরা যেমন শ্রমিক শ্রেণির উদারতা পায়নি, তেমনি বুর্জোয়া শ্রেণির সম্মানজনক সততারও কিছু পায়নি।
আসলে তারা অবস্থার দিক থেকে আপাতদৃষ্টিতে বামনের মতো মনে হলেও ঘটনার আনুকূল্য পেলে সহসা দৈত্যাকার হয়ে উঠতে পারে। মেয়েটার অন্তরে সুপ্ত ছিল নিষ্ঠুরতার এক বীজ আর লোকটার অন্তর ছিল শয়তানিতে ভরা। দু জনেই ছিল যত রকমের অন্যায় ও পাপকর্মে বিশেষভাবে পারদর্শী। সংসারে এক ধরনের মানুষ আছে যারা ক্রে মাছের মতো, যাদের গতি শুধু ছায়া আর অন্ধকারের দিকে, যারা কখনও সামনের দিকে এগিয়ে যায় না, যারা শুধু পেছনের দিকে যায়। তাদের জীবনের সব অভিজ্ঞতাই বিকৃত হয়ে ওঠে এবং তারা ক্রমশই গভীরতর অন্ধকারের দিকে চলে যায়। থেনার্দিয়েরদের জীবনেও তাই ঘটেছিল।
যারা মুখ দেখে মানুষের মনের কথা বুঝতে চায় তাদের কাছে থেনার্দিয়ের ছিল একটা সমস্যা। এমন কতকগুলি লোক আছে যাদের চারদিকে এমন একটা শূন্যতা ঘিরে থাকে যার জন্য তাদের ওপর আমরা নির্ভর করতে পারি না, আমরা তাদের বিশ্বাস করতে পারি না। এই ধরনের লোকেরা আমাদের সামনে বা পেছনে যেখানেই থাক না কেন, আমাদের পক্ষে তারা হয়ে ওঠে ক্ষতিকর আর ভয়াবহ। তাদের স্বরূপ কিছুতেই জানা যায় না, তাদের মধ্যে সব সময় অজ্ঞেয়তার একটা রহস্যময় উপাদান রয়ে যায়। তাই তারা কখন কী করে বসতে তা কেউ ঠিকমতো বলতে পারে না। অনেক সময় তাদের চোখের চাউনি দেখে তাদের মনে কুমতলবের কথা জানা যায় কিছুটা। তারা যদি কোনও কথা বলে অথবা কিছু করে তা হলে আমরা সে কথা বা কাজের মধ্যে তাদের অতীত কিংম্বা ভবিষ্যতের কোনও রহস্য খুঁজে পাবার চেষ্টা করে থাকি।
থেনার্দিয়ের আগে সৈনিকের কাজ করত। সে সার্জেন্ট ছিল। সে নিজে বলত ১৮১৫ সালের সামরিক অভিযানে যোগদান করে। এর ফলে কী ঘটেছিল আমরা পরে তা জানতে পারব। সে যে যুদ্ধ করতে জানে এবং সে যে একদিন সৈনিকের কাজ করত তা তার হোটেলটা দেখলেই বোঝা যায়। নিজের হাতে আঁকা কতকগুলি যুদ্ধের ছবি সে হোটেলটার এখানে-সেখানে টাঙিয়ে রেখে দিয়েছে। সে ছবি আঁকতে ভালো না জানলেও সব বিষয়ে মাতব্বরি করতে চায় এবং সব কিছুই খারাপ করে বসে।
সে যুগে কিছু ঐতিহাসিক উপন্যাস জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ম্যাদময়জেল দ্য স্কুদেরি থেকে শুরু করে মাদাম বাৰ্থেলেমি হেদত এই ধরনের উপন্যাস লিখে বেশ নাম করেন। এইসব উপন্যাসের বিষয়বস্তুর মধ্যে অনেক অশ্লীলতার উপকরণ ছিল এবং প্যারিসের পাঠকদের মনে রোমান্টিক ভাবধারা সঞ্চার করত। মাদাম থেনার্দিয়ের বেশি লেখাপড়া না জানলেও এই ধরনের উপন্যাস পড়ার মতো ক্ষমতা ছিল তার। মাদাম থেনার্দিয়ের ওইসব উপন্যাস গোগ্রাসে গিলত যেন এবং তার থেকে খারাপ জিনিসগুলো গ্রহণ করত। যেমন এইসব উপন্যাস পাঠের ফলেই তার স্বামীর প্রতি এক রোমান্টিক আনুগত্য সব সময় প্রদর্শন করত মাদাম থেনার্দিয়ের। কিন্তু তার স্বামী লেখাপড়া জানলেও আসলে এক দুর্বৃত্ত ছিল। তার বুদ্ধি এবং রুচি খুবই স্থল প্রকৃতির ছিল। তবে সে পিগল ব্রোনের ভাবপ্রবণতার সমর্থক ছিল। মেয়েদের আচার-আচরণ ও চালচলন সম্বন্ধে সে প্রথাগত রক্ষণশীলতায় বিশ্বাসী ছিল। একথা সে মুখে বলত। মাদাম ছিল তার স্বামীর থেকে পনেরো বছরের ছোট। যখন বিয়োগান্তক উপন্যাসের পরিবর্তে আনন্দোচ্ছল হালকা ধরনের উপন্যাসের প্রচলন দেখা গেল দেশে তখন মাদাম থেনার্দিয়েরও সেই সব বাজে বইয়ের ভক্ত হয়ে উঠল। এইসব কিছু পাঠের অবশ্যই একটা অশুভ প্রভাব আছে এবং এই প্রভাবের ফলেই মাদাস থেনার্দিয়ের তার বড় মেয়ের নাম রাখে এপোনিনে। আর তার ছোট মেয়ের নামটা গুলনেয়ারের পরিবর্তে আজেলমা রাখা হয়।
