মঁসিয়ে ফেলিক্স থোলোমায়েসের কথা বলে আর লাভ নেই। তার সম্বন্ধে শুধু এইটুকু বললেই যথেষ্ট হবে যে বাইশ বছর পরে রাজা লুই ফিলিপের অধীনে একজন ধনী প্রভাবশালী অ্যাটর্নি হিসেবে সে নাম করে। কড়া ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবেও কাজ করে সে। কিন্তু যে কোনও অবস্থাতেই হাসিখুশিতে মেতে থাকত।
কয়েক স্যু খরচ করে ফাঁতিনে একটা গাড়িতে করে প্যারিস থেকে মঁতফারমেলে এসে হাজির হয়। তার পর হাঁটতে হাঁটতে রুয়েন দু বুলেঙ্গারে এই হোটেলটায় চলে আসে। হোটেলটার পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছিল সে। হঠাৎ দুটি শিশুকন্যাকে তাদের মা’র কাছে খেলা করতে দেখার সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যটা ভালো লেগে যায় তার। একটি সুখী পরিবারের পুরো ছবিটা ভেসে উঠল তার সামনে। সেই ছবি আর এই সুন্দর দৃশ্য থেকে উদ্ভূত একটি অনির্বচনীয় সুখের আবেশ আচ্ছন্ন করে ফেলল ফাঁতিনের মনটাকে। তাই শিশু দুটির মা যখন গান গাইতে গাইতে একবার থামল তখনি সে এগিয়ে এসে মাকে বলল, আপনার শিশু দুটি খুবই সুন্দরী মাদাম!
কোনও হিংস্র জন্তুও কেউ তার বাচ্চাকে ভালো বললে তার প্রতি অনেকখানি নমনীয় ও সহনীয় হয়ে ওঠে।
কথাটা শুনে শিশু দুটির মা ফাঁতিনেকে ধন্যবাদ দিয়ে তাকে পাশের একটা বেঞ্চিতে বসতে বলল। সে নিজেও তার সামনে এক জায়গায় বসে বলল, আমার নাম থেনার্দিয়ের। আমি আর আমার স্বামী এই হোটেলটা চালাই।
মাদাম থেনার্দিয়েরের চেহারা বেশ বলিষ্ঠ, হাড়গুলো দারুণ শক্ত আর মোটা। মাথার চুলগুলো লালচে। যেন কোনও সৈনিকের স্ত্রী; মোটাসোটা এবড়ো-খেবড়ো চেহারা। অঙ্গসৌষ্ঠবের মধ্যে কোনও সূক্ষ্মতা নেই। তবু দেহটা তার যতই রুক্ষ হোক, যত সব জনপ্রিয় গল্প-উপন্যাস পড়ে তার মনটা বেশ কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠে। তার বয়স তিরিশের বেশি হবে না। দেহে তখনও তার ছিল পূর্ণ যৌবন। দরজার সামনে না বসে থেকে সে যদি খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকত তা হলে তার বলিষ্ঠ পুরুষালি চেহারা দেখে ভয় পেয়ে যেত ফাঁতিনে। ফলে কোনও কথাই সে তাকে বলতে পারত না।
থেনার্দিয়েরের সামনে বসে ফাঁতিনে তার জীবনকাহিনী সব বলল। তবে কিছুটা পরিবর্তিত আকারে বলল। সে বলল, সে ছিল প্যারিসের এক শ্রমিকের স্ত্রী। তার স্বামী সম্প্রতি প্যারিসে মারা গেছে। সে সেখানে কোনও চাকরি না পেয়ে গ্রামাঞ্চলে যাচ্ছে কাজ খুঁজতে। সে আজ সকালেই প্যারিস থেকে রওনা হয়। কিছুটা পথ গাড়িতে আর কিছুটা পথ হেঁটে সে মঁতফারমেলে এসে পৌঁছেছে। তার কোলের শিশু মেয়েটিও কিছুটা হেঁটেছে। তার পর ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে তার কোলে।
কথা বলতে বলতে ফাঁতিনে একবার তার কোলের ঘুমন্ত শিশুটাকে আদর করে চুম্বন করতেই সে জেগে উঠল। তার মা’র মতো নীল বড় বড় চোখ দুটো খুলে চারদিকে তাকাতে লাগল। ছোট ছোট শিশুরা এইভাবে অনেক সময় পরিবেশকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে খুঁটিয়ে দেখে আর হয়তো ভাবে সারা পৃথিবীতে একমাত্র তারাই দেবদূত আর সবাই মানুষ। এরপর ফাঁতিনের শিশু মেয়েটি চারদিকে তাকিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে হঠাৎ জোর হাসতে লাগল। তার মা তাকে থামাবার চেষ্টা করলেও থামাতে পারল না, আরও জোরে খিল খিল করে হাসতে লাগল এবং তার মার কোল থেকে নেমে যেতে চাইল। মা’র কোল থেকে নেমে শিশুরা যে শিকলটাতে দোলনার মতো করে দুলছিল সেটা দেখে আনন্দে কী বলল। মাদাম থেনার্দিয়ের তার মেয়েদের দোলনা থেকে নামিয়ে বলল, এবার তোমরা সকলে মিলে খেল।
শিশুদের এই বয়সে তাদের বন্ধুত্ব খুব তাড়াতাড়ি গড়ে ওঠে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই তিনটি শিশু একযোগে খেলা করতে লাগল। তারা পরম আনন্দে মাটিতে গর্ত খুঁড়তে লাগল। ফাঁতিনের বাচ্চা মেয়েটি একটা কাঠের টুকরো পেয়ে তাই দিয়ে গর্ত খুঁড়তে লাগল। গর্ত নয় যেন ইঁদুরের কবর।
এদিকে তাদের মায়েরা কথা বলতে লাগল। থোর্দিয়ের ফাঁতিনেকে বলল, তোমার মেয়ের নাম কী?
ফাঁতিনে বলল, কসেত্তে।
আসলে তার মেয়ের নাম ছিল ইউফ্রেজি। ইউফ্রেজি নামটাই চলতি কথায় বলতে বলতে সেটাকে কসেত্তে করে তুলেছে তিনে। যেমন করে অনেক সময় জোসেফ থেকে সাধারণের মুখে মুখে চলতি কথায় বোপিতা আর ফ্রঁসোয়া সিলেক্তে হয়ে দাঁড়ায়। ভাষাগত এই রূপান্তর ভাষাবিজ্ঞানীদের বিস্ময়ে অভিভূত করে তোলে।
থেনার্দিয়ের আবার প্রশ্ন করল, ওর বয়স কত?
ফাঁতিনে বলল, তিন বছরের কাছাকাছি।
বাচ্চারা তখন একই সঙ্গে এক প্রবল আশঙ্কা আর আনন্দের উত্তেজনায় দল বেঁধে দাঁড়িয়ে কী দেখছিল। কিছু একটা ঘটেছে। মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে একটা পোকা বেরিয়ে পড়ায় তারা সকলেই একই সঙ্গে ভয় পেয়ে যায় আর আনন্দের আবেগে উত্তেজিত হয়ে ওঠে। তারা তিনজনে তখন ঘন হয়ে দাঁড়ায়।
মাদাম থেনার্দিয়ের তাদের পানে তাকিয়ে বলল, শিশু কত তাড়াতাড়ি পরস্পরকে চিনে ফেলে। যেন মনে হচ্ছে ওরা তিন বোন।
কথাটা শুনে উৎসাহিত হয়ে উঠল ফঁতিনে। এই কথাটাই সে শুনতে চাইছিল। সহসা সে মাদাম থেনার্দিয়ের একটা হাত তুলে নিয়ে বলল, তুমি আমার মেয়েকে তোমার কাছে রেখে দেবে ভাই?
মাদাম থেনার্দিয়ের চমকে উঠল। হ্যাঁ বা না কোনও কিছুই বলল না। ফাঁতিনে আবার বলতে লাগল, আমি যেখানে যাচ্ছি সেখানে ওকে নিয়ে যেতে পারি। আমাকে এখন কাজ খুঁজতে হবে এবং সঙ্গে বাচ্চা থাকলে কাজ পাওয়া যায় না। ও অঞ্চলের লোকরাই বড় একগুয়ে এবং যুক্তিহীন। ঈশ্বর যেন এখানে আমাকে পথ দেখিয়ে এনেছেন। আমি তোমার মেয়েদের দেখে ভাবলাম যার বাচ্চারা এমন সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন তার মা না জানি কত ভালো! ও যদি তোমাদের এখানে থাকে তা হলে ওরা ঠিক তিন বোনের মতো খেলা করবে। বল, তুমি ওর দেখাশোনা করবে এখানে রেখে?
