আগন্তুক যুবতী মাতাটিকে দেখে গরিব মনে হচ্ছিল। সে হয়তো কোনও শহরে শ্রমিকের কাজ অথবা কোনও গাঁয়ে চাষির কাজ করে। বয়সে সে যুবতী এবং সুন্দর ছিল, কিন্তু তার পোশাক-আশাক দেহগত লাবণ্য প্রকাশের উপযুক্ত ছিল না। তার মাথায় চুল ছিল প্রচুর এবং সে চুলের একটি গোছা মাথায় শক্ত করে পরা টুপির পাশ দিয়ে বেরিয়ে এসে তার চিবুকের উপর ছড়িয়ে পড়েছিল। সে যদি একবার হাসত তা হলে হয়তো তার সুন্দর ঝকঝকে দাঁতগুলো দেখা যেত। কিন্তু সে হাসেনি। জমাটবাঁধা এক অব্যক্ত বিষাদের জন্য তার মুখটা ম্লান আর চোখদুটো শুকনো দেখাচ্ছিল। সে তখন খুব ক্লান্ত ও অবসন্ন হয়ে পড়েছিল। তার কোলের ঘুমন্ত শিশুটার পানে সে সকরুণ দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিল। তার গায়ে ছিল ক্যালিকো কাপড়ের জামা আর মোটা পশমের একটা কোট। গলায় জড়ানো ছিল একটা বড় নীল রুমাল। তার হাত দুটো ছিল খসখসে এবং ডান হাতের তর্জনীটাতে ছিল সূচ ফোঁটার দাগ। এই যুবতী মেয়েটিই হল ফাঁতিনে।
আসলে সে ফাঁতিনে হলেও তাকে তখন চেনা যাচ্ছিল না। তবে ভালো করে খুঁটিয়ে দেখলে বেশ বোঝা যাচ্ছিল তার দেহসৌন্দর্য তখনও অটুট ছিল। কিন্তু বিষাদের কতকগুলি কুটিল রেখা, এক অব্যক্ত দুঃখবাদের এক নীরব নিরুচ্চার সূচনা নেমে এসেছে তার অত্যুজ্জ্বল গাল দুটিতে। তার মসলিন পোশাক-আশাকের সেই পারিপাট্য, আনন্দের উজ্জ্বলতা, গানের অবিচ্ছিন্ন সুরধারা সব চলে গেছে তার জীবন থেকে। গাছের উপর শুভ্রোজ্জ্বল তুষারকণাগুলো নিঃশেষে ঝরে গেলে যেমন গাছের শূন্য শাখাগুলোকে কালো কালো দেখায় তেমনি ফাঁতিনের জীবনে থেকে সব আনন্দের উজ্জ্বলতা আর সুরের ধারা নিঃশেষে চলে গিয়ে কেমন যেন বিবর্ণ ও ম্লান হয়ে উঠেছিল তার সমগ্র মুখমণ্ডল।
ফাঁতিনেদের সেই প্রমোদভ্রমণের পর দশটি মাস কেটে গেছে। তার মধ্যে কী ঘটে গেছে তার জীবনে তা অনুমান করা খুব একটা কঠিন হবে না।
তার যে জীবন একদিন এক নিবিড় নিচ্ছিদ্র ঔদাসীন্যে ভরে ছিল, সে জীবনে নেমে এল এক কঠোর বাস্তব সচেতনতা, এল লাভ-ক্ষতি আর দেনাপাওনার এক অবাঞ্ছিত হিসাবপ্রবণতা। তাদের প্রেমিকরা চলে যেতেই ফাঁতিনে ফেবারিতে, ডালিয়া আর জেফিনের সঙ্গে সব যোগাযোগ হারিয়ে ফেলে। সে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে তাদের থেকে। সে শুধু একা নয়, যে বন্ধন ছিঁড়ে নির্মমভাবে সকলে চলে যায় সে বাঁধন মেয়েরাও সঙ্গে সঙ্গে ছিঁড়ে ফেলে মুক্ত করে ফেলে নিজেদের। সকলেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে পরস্পর থেকে। এই বিচ্ছেদের ঘটনার এক পক্ষকাল পরে কেউ যদি তাদের পারস্পরিক বন্ধুত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিত তা হলে তারা নিজেরাই হয়তো আশ্চর্য হয়ে যেত। ফাঁতিনে একেবারে নিঃসঙ্গ ও অসহায় হয়ে পড়ে। এইসব প্রেমের ক্ষেত্রে বিচ্ছেদটাই স্বাভাবিক এবং এক অবশ্যম্ভাবী ব্যাপার। সন্তানের পিতা সন্তানকে ছেড়ে চলে গেলে তার সব ভার স্বাভাবিকভাবেই মার ওপরে এসে পড়ে। এবার নিজের রুজি-রোজগারের ওপর সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করতে হয় ফাঁতিনেকে। থোলোমায়েসের সংস্পর্শ এবং সাহচর্যে আসার পর থেকে তার আগেকার চাকরিটাকে ঘৃণার চোখে দেখতে থাকে সে। কাজ বা রুজি-রোজগারের ওপর সব আগ্রহ হারিয়ে ফেলে, সঙ্গে সঙ্গে আমোদ-উৎসবের প্রতি দেখা দেয় এক অত্যধিক প্রবণতা। যেসব কাজ বা চাকরি আগে সে সহজেই পেত, সেসব কাজকে সে অবহেলা করতে থাকায় সব যোগাযোগ হারিয়ে ফেলে সে। সব চাকরির পথ একে একে বন্ধ হয়ে যায় তার সামনে। ফলে যখন তার সত্যি সত্যিই চাকরির দরকার দেখা দিল তখন চেষ্টা করেও চাকরি পেল না কোনও। সে লিখতে-পড়তে জানত না, ছোটবেলায় সে শুধু কোনওরকমে নাম-সই করতে শেখে। সে একজনকে টাকা দিয়ে থোলোমায়েসকে পাঠাবার জন্য তিনখানা চিঠি লেখায়, কিন্তু থোলোমায়েস একটা চিঠির উত্তর দেয়নি। আজ সে যখন মেয়ে কোলে করে রাস্তায় বার হয় তখন রাস্তার লোকেরা তাকে বিদ্রূপ করে। উপহাসের সুরে কী সব বলাবলি করতে থাকে। ফলে থোলোমায়েসের ওপর কঠোর হয়ে ওঠে তার মনটা। এখন সে কী করবে এবং কোথায় যাবে? সে অন্যায় করেছে ঠিক, কিন্তু আসলে সে সৎ এবং গুণবতী। সে যখন দেখল অধঃপতনের এক অতলান্তিক খাদ তার সামনে পথরোধ করে। দাঁড়িয়ে আছে তখন সে ভয়ে পিছিয়ে না গিয়ে সাহস ও ধৈর্যসহকারে তার সম্মুখীন হল। সে তার জন্মস্থান তার দেশের শহর মন্ত্রিউল-সুর-মেরে ফিরে যেতে চাইল। সেখানে তাকে অনেকে চেনে এবং তাদের মধ্যে কেউ না কেউ আশ্রয় বা কাজ দিতে পারে তাকে। কিন্তু সে ক্ষেত্রে তার এই অবৈধ সন্তানের জননী হিসেবে কুমারী মাতার অনপনেয় কলঙ্কের কথাটাকে সম্পূর্ণ গোপন রাখতে হবে। কলঙ্কের বোঝাটাকে কোথাও নামিয়ে যেতে হবে। আবার কেউ সেকথা না জেনে তাকে গ্রহণ করে তাকে আশ্রয় দিলেও পরে যদি সব কথা জেনে ফেলে তা হলে আবার বিচ্ছেদ অনিবার্য এবং সেটা হবে প্রথম বিচ্ছেদের থেকে আরও বেদনাদায়ক, আরও মর্মবিদারক। কিন্তু ফাঁতিনে মনে মনে সংকল্প করে ফেলেছিল। জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য উপযুক্ত সাহসের অভাব ছিল না ফাঁতিনের। সেই সাহসের সঙ্গে সৈনিকসুলভ ভঙ্গিতে সংকল্পসাধনে এগিয়ে চলল সে।
ভালো পোশাক পরা ছেড়ে দিয়েছিল ফাঁতিনে। সিল্কের যা কিছু পোশাক ছিল তা সে তার মেয়ের জন্য রেখে দিয়েছিল। তার ঘরে দামি জিনিসপত্র যা কিছু ছিল তা সব বিক্রি করে দিয়ে দুশো ফ্রাঁ পায়। কিন্তু তার থেকে সব দেনা শোধ করে মাত্র আশি ঐ অবশিষ্ট থাকে। তার পর বসন্তের কোনও এক সকালে বাইশ বছরের এক যুবতী ফাঁতিনে কোলে এক বাচ্চা নিয়ে প্যারিস শহর ত্যাগ করল। যারা তাকে তখন শহর ছেড়ে চলে যেতে দেখে তারা সত্যিই দুঃখ প্রকাশ না করে পারেনি তার জন্য। একমাত্র তার এই শিশুসন্তান ছাড়া জগতে আর কেউ নেই তিনের। সন্তানটিরও তার মা ছাড়া আর কেউ ছিল না। ফাঁতিনেকে তার মেয়েকে প্রায়ই স্তনদুধ খাওয়াতে হত। তার ফলে তার শরীর ক্ষয় হয়। তার বুকটা দুর্বল হয়ে পড়ে। সে প্রায়ই কাশতে থাকে।
