প্রায় দুই বছর ধরে আমরা তোমাদের যথাসম্ভব সুখ দিয়েছি। আমাদের প্রতি কোনও বিদ্বেষভাব পোষণ করো না।
স্বাক্ষর : ব্ল্যাকিভেল
ফেমিউল
লিস্তোলিয়ের
ফিলিক্স থোলোমায়েস
পুনঃ–ডিনারের টাকা আমরা দিয়ে দিয়েছি।
মেয়েরা পরস্পরের দিকে তাকাতে লাগল।
ফেবারিতেই প্রথম নীরবতা ভঙ্গ করে কথা বলল, যাই হোক, এটা কিন্তু বেশ মজার ঠাট্টা।
জেফিনে বলল, সত্যিই ব্যাপারটা বড় মজার।
ফেবারিতে বলল, আমি বেশ বলতে পারি এটা ব্ল্যাকিভেলের পরিকল্পনা। এজন্য তাকে আরও ভালোবাসতে ইচ্ছে করছে। ভালোবাসতে না বাসতেই ওরা হারিয়ে যায়। এটাই হল জগতের রীতি।
ডালিয়া বলল, না, এটা থোলোমায়েসের পরিকল্পনা। এটা কখনও তার মাথা ছাড়া আর কারও মাথা থেকে বার হতে পারে না।
ফেবারিতে বলল, তা যদি হয় তা হলে ব্ল্যাকিভেল নিপাত যাক, আর থোলোমায়েস দীর্ঘজীবী হোক।
ডালিয়া-জেফিনে একসঙ্গে বলে উঠল, থোলোমায়েস দীর্ঘজীবী হোক।
কথাটা বলেই হাসতে লাগল ওরা।
প্রথমটায় ফাঁতিনেও হাসতে লাগল ওদের সঙ্গে। কিন্তু ঘণ্টাখানেক পরে সে তার ঘরে গিয়ে একা একা কাঁদতে লাগল। এটা তার জীবনে প্রথম প্রেম। থোলোমায়েসের কাছে সে অনুগত স্ত্রীর মতো বিলিয়ে দিয়েছিল নিজেকে। তার একটি সন্তান গর্ভে ধারণ করেছে সে।
১.৪ প্যারিসের অনতিদূরে
চতুর্থ পরিচ্ছেদ
১
এই শতাব্দীর প্রথম ভাগে প্যারিসের অনতিদূরে মঁতফারমেল গাঁয়ে একটা ছোট হোটেল ছিল। হোটেলটা এখন আর নেই। হোটেলটা রুয়েন দু বুলেঙ্গার অঞ্চলে অবস্থিত ছিল আর সেটা ব্রেনাদিয়ের দম্পতি চালাত। হোটেলটার সামনে দরজার উপর একটা কাঠের বোর্ডের উপর ছবি আঁকা ছিল। তাতে একটা সৈনিক তার পিঠের উপর তারকাচিহ্নিত সেনাপতির পোশাক পরা অবস্থায় আর একজনকে বয়ে নিয়ে চলেছে। ছবিটিতে রঙের সাহায্যে চাপ চাপ রক্ত আর ধোঁয়ার রাশি দেখানো হয়েছে। ছবিটার মাথার উপর লেখা আছে, দি সার্জেন্ট অব ওয়াটারলু।
কোনও হোটেলের সামনে কোনও যাত্রীবাহী গাড়ি বা মালবাহী ওয়াগন বা বড় ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকাটা এমন কিছু অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। কিন্তু ১৮১৮ সালের বসন্তের এক সন্ধ্যায় হোটেলের সামনে এক বিরাট মালবাহী ওয়াগন দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে একজন চিত্রকর রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে আশ্চর্য হয়ে যায়। ওয়াগনটার শেষের দিকে লোহার পাটাতনওয়ালা একটা অংশ বড় বড় দুটো চাকার উপর দাঁড়িয়েছিল। তার থেকে একটা লোহার শিকল ঝুলছিল। সে শিকল দিয়ে গোলিয়াথ, হোমারের পলিফেমাস বা শেকসপিয়ারের ক্যালিবনের মতো দৈত্যদের বাধা যেত।
ওয়াগনটা তখন রাস্তাটা জুড়ে দাঁড়িয়েছিল। তখন তার অন্য কোনও কাজ ছিল না। তার থেকে ঝুলতে থাকা শিকলটার একটা অংশ মাটির উপর পড়েছিল আর দুটো বাচ্চা মেয়ে সেটা ধরে দোলনার মতো দুলছিল। বাচ্চা দুটির মা কাছেই বসেছিল। একটি মেয়ের বয়স আড়াই বছর আর একটি মেয়ের বয়স মাত্র দেড় বছর। একটা শাল দিয়ে তাদের মা বাচ্চা দুটিকে শিকলটার সঙ্গে জড়িয়ে রেখেছিল যাতে মেয়ে দুটি খেলা করতে করতে পড়ে না যায়। মা ভাবছিল শিকলটা বাচ্চাদের খেলার পক্ষে সত্যিই একটা মজার বস্তু। মেয়ে দুটিও তাতে খুবই আনন্দ পাচ্ছিল। তাদের তখন দেখে লোহার স্তূপের উপর দুটো ফুটন্ত গোলাপের মতো মনে হচ্ছিল। তাদের চোখগুলো বেশ উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল আর তাদের গোলাপি গানগুলো হাসিতে ফুলে উঠেছিল। তাদের মধ্যে একজনের মাথার চুল বাদামি আর একজনের চুল কালো। তাদের নির্দোষ নিষ্পাপ মুখগুলো আনন্দের উত্তেজনায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। ছোট মেয়েটির অনাবৃত পেটটা দেখা যাচ্ছিল। ক্রীড়ারত আত্মভোলা এই শিশুদের সরল সুন্দর এক দৃশ্যের পটভূমিকায় ওয়াগনের উপর দিকটা একটা বিরাটকায় দানবের বিকৃত মুখের মতো দেখাচ্ছিল। শিশুকন্যাদের মার চেহারাটা তেমন সুন্দর না হলেও এই দৃশ্যের সঙ্গে তাকে বেশ মানিয়ে গিয়েছিল। সে তখন হোটেলটার সামনে বসে তার মেয়েদের দোলাচ্ছিল তন্ময় হয়ে। সূর্যাস্তের এক রঙিন আভা তাদের মুখের উপর তখন ছড়িয়ে পড়েছিল। শিশুরা যখন শিকলটা ধরে ঝুলছিল পালাক্রমে তখন শিকলটা থেকে একটা কাঁচক্যাচ শব্দ হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল নিষ্প্রাণ লোহার শিকলটা যেন এক অস্পষ্ট অস্ফুট প্রতিবাদে ফেটে পড়ছিল। মা যখন তার শিশুসন্তানদের নিরাপত্তার দিকে সতত সজাগ দৃষ্টি ছড়িয়ে তাদের দেখাশোনা করছিল তখন তার মুখের উপর একই সঙ্গে পশু ও দেবদূতের মিশ্রিত ভাব ফুটে উঠছিল।
শিশুদের দোলাবার সময় মা অনুক্ত সুরে একটা গান গাইছিল। সে তখন এমন তন্ময় হয়ে আত্মভোলো এক ভাবের আবেশে বিভোর হয়ে ছিল যে হোটেলের সামনের রাস্তায় কী হচ্ছিল না-হচ্ছিল সে বিষয়ে তার কোনও খেয়াল ছিল না।
হঠাৎ কার কণ্ঠস্বরে তার চমক ভাঙল। কে তাকে বলল, আপনার মেয়ে দুটি খুবই সুন্দর মাদাম।
শিশুকন্যাদের মা তাকিয়ে দেখল তার সামনে এক যুবতী মেয়ে কোলে একটি সুন্দর মেয়ে নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তার সঙ্গে আছে ভ্রমণকারী একটা ভারী বড় ব্যাগ।
আগন্তুক যুবতী মহিলার কোলে যে শিশুটি ছিল তার বয়স দুই থেকে তিনের মধ্যে। সে তখন নিশ্চিন্তভাবে তার মা’র কোলে ঘুমোচ্ছিল। সে একটা লিনেনের সুন্দর ফ্রক পরে ছিল। তার আপেলের মতো গোলাপি গাল দেখে বেশ বোঝা যাচ্ছিল তার স্বাস্থ্য ভালো। চোখ দুটো বেশ বড় বড়।
