সবাই অন্যমনা হয়ে ঘটনাটা দেখতে ব্যস্ত থাকায় থোলোমায়েস ফেবারিতেকে কাছে পেয়ে তার দিকে এগিয়ে গেল। ফেবারিতে বলল, কিন্তু চমক কোথায়? তোমরা যে বলছিলে আমাদের চমকে দেবে?
খোলোমায়েস বলল, ঠিক বলেছ। এখন তার সময় হয়েছে। ভদ্রমহোদয়গণ, এবার মেয়েদের চমক দেখাতে হবে। মহিলাগণ, কয়েক মিনিট ধৈর্য ধরে একটু অপেক্ষা করতে হবে।
ব্ল্যাকিভেল বলল, তা হলে প্রথমে চুম্বন দিয়ে শুরু করা যাক।
থোলোমায়েস বলল, আর সে চুম্বন হবে কপালে।
এরপর প্রত্যেকটি প্রেমিক তার প্রেমিকাকে চুম্বন করল। তার পর পুরুষরা একযোগে সারবন্দিভাবে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। তাদের ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে দেখে হাততালি দিয়ে উঠল ফেবারিতে। বলল, কী মজার ব্যাপার!
ফাঁতিনে বলল, বেশি দেরি করো না কিন্তু, আমরা অপেক্ষা করে থাকব।
.
৯
মেয়েরা সবাই জানালার ধারে বসে রইল রাস্তার দিকে তাকিয়ে। তারা দেখল পুরুষরা হাতধরাধরি করে যেতে যেতে একবার ঘুরে দাঁড়িয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ল। তার পর শ্যাম্প এলিসির পথে অদৃশ্য হয়ে গেল।
ফাঁতিনে চিৎকার করে একবার বলল, বেশি দেরি করো না।
জেফিনে বলল, ওরা কী আনবে বলে মনে হয়?
ডালিয়া বলল, আমার মনে হয় নিশ্চয় সুন্দর কিছু আনবে।
ফেবারিতে বলল, আমার তো মনে হয় সোনার একটা কিছু আনবে।
অদূরে জলের ধারে আবার কী একটা গোলমাল শুনে সেদিকে দৃষ্টি আকৃষ্ট হল ওদের। গাছের ফাঁক দিয়ে ওরা দেখতে পেল জলের ধারে কিসের একটা গোলমাল হচ্ছে। তখন ডাকগাড়ি যাবার সময়। শ্যাম্প এলিসি শহরটার পাশ দিয়ে নদীর বাঁধটার ধার ঘেঁষে ডাক নিয়ে অনেক ঘোড়ার গাড়ি দক্ষিণ ও পশ্চিম দিকে জোর গতিতে এগিয়ে চলেছিল। গাড়িগুলোর উপর যাত্রী মানুষগুলো ত্রিপল দিয়ে ঢাকা ছিল। পথের উপর পড়ে থাকা পাথরখণ্ডগুলোকে চাকার আঘাতে গুঁড়ো করে দিয়ে দুপাশের জনতাকে পাশ কাটিয়ে গাড়িগুলো এমন জোরে যাচ্ছিল যাতে মনে হচ্ছিল এক প্রচণ্ড ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে উঠেছে যেন গাড়িগুলো। গাড়িগুলোর গতিবেগের এই উন্মত্ততা দেখে মেয়েরা বেশ মজা পাচ্ছিল।
ফেবারিতে বলল, হা ভগবান! কী গোলমাল! মনে হচ্ছে কতকগুলি পুরনো লোহার তাল আকাশে উড়তে চাইছে।
ওরা এক ঝাঁক এলম গাছের ফাঁক দিয়ে দেখতে পেল অনেকগুলো গাড়ির মধ্যে একটা ঘোড়ার গাড়ি ছুটে যেতে যেতে হঠাৎ এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। তার পর আবার ছুটতে ছুটতে চলে গেল। তা দেখে আশ্চর্য হয়ে গেল ফাঁতিনে।
ফাঁতিনে বলল, ডাকগাড়ি কিন্তু থামে না কোথাও। এটা অস্বাভাবিক।
ফেবারিতে বলল, ফাঁতিনের ব্যাপারটাই আলাদা। যে কোনও সাধারণ ঘটনা দেখেও ও আশ্চর্য হয়ে যায়, শোন, মনে করো আমি একজন যাত্রী, আমি ড্রাইভারকে একসময় বললাম, আমি এখন সামনের দিকে বেড়াতে যাচ্ছি। তুমি ফেরার সময় আমাকে তুলে নিয়ে যাবে। আমি ওই বাঁধের উপর দাঁড়িয়ে থাকব। সুতরাং ড্রাইভার আমাকে ফেরার পথে তুলে নিয়ে যাবেই। এটা প্রতিদিনই হয়। জীবন সম্বন্ধে তোমার কোনও অভিজ্ঞতাই নেই।
কিছুক্ষণ এই ধরনের কথাবার্তা বলতে লাগল। তার পর ফাঁতিনের মনে সেই কথাটা ঘুরে এল। সে বলল, কই, সেই বিস্ময়ের চমক কোথায়?
ডালিয়া বলল, হ্যাঁ, সেই বিরাট বিস্ময়ের চমক কোথায় গেল?
ফাঁতিনের একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ওরা বড় দেরি করছে।
ফাঁতিনের কথাটা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হোটেলে যে তাদের খাবার পরিবেশন করছিল সে একটা খামের চিঠি নিয়ে এসে তাদের দিল।
ফেবারিতে বলল, এ কিসের চিঠি?
হোটেল-চাকরটি বলল, আপনাদের লোকেরা যাবার সময় এই চিঠি আপনাদের হাতে দেবার জন্য দিয়ে গেছেন।
ফেবারিতে চিঠিটা ছিনিয়ে নিয়ে বলল, আরও আগে দাওনি কেন?
ফেবারিতে বলল, কোনও ঠিকানা নেই চিঠিখানার উপর। তবে ভেতরে কী লেখা আছে দেখি। এই হচ্ছে বিস্ময়ের চমক। এই কথাগুলো খামটার উপরেই লেখা আছে।
তাড়াতাড়ি চিঠিটা খাম থেকে বার করে ভাঁজ খুলে জোর গলায় পড়তে লাগল ফেবারিতে, হে প্রিয়তমাবৃন্দ! তোমরা প্রথমেই জেনে রাখ, আমাদের পিতামাতা আছে। তোমাদের কাছে হয়তো বাবা-মা’র বিশেষ কোনও দাম নেই। কিন্তু আইনের দিক থেকে আমরা বাবা-মার কথা শুনতে বাধ্য। তাঁদের এখন বয়স হয়েছে। তাঁরা স্বভাতই উদ্বিগ্ন আমাদের জন্য। তারা চান আমরা এখন তাদের কাছে ফিরে যাই। আমরা তাঁদের বাইবেলবর্ণিত অমিতব্যয়ী পুত্রের মতো যারা ঘরে ফিরে গেলেই তারা মোটা বাছুর কেটে ভোজ দেবার কথা বলেছেন। যেহেতু আমরা কর্তব্যপরায়ণ সন্তান, তাঁদের কথা আমাদের শুনতেই হবে। তোমরা যখন আমাদের এই চিঠিটা পড়বে তখন পাঁচটা দ্রুতগতিসম্পন্ন ঘোড়া আমাদের বাড়ির পথে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা যেন দূরে, বহু দূরে পালিয়ে যাচ্ছি। তুলোর পথে ধাবমান গাড়িগুলো যেন তোমাদের প্রেম আর যৌবনের ফুলে ভরা পথ থেকে আমাদের উদ্ধার করে সমাজজীবনের নানারকম কর্তব্যের পথে নিয়ে চলেছে আমাদের। আমরা এখন আমাদের সেই সামাজিক কর্তব্যের পথে ঘন্টায় প্রায় ছয় মাইল বেগে এগিয়ে চলেছি। আপন পরিবার ও সমাজের প্রতি কর্তব্য আছে আমাদের। আমরা সদাচরণের মাধ্যমে যথাযথভাবে সে কর্তব্য পালন করি, দেশ এটাই আশা করে আমাদের কাছ থেকে। আমরা হব পুলিশের বড় কর্তা, সন্তানের পিতা, স্থানীয় রক্ষীবাহিনী ও আইনসভার সদস্য। আমাদের এই আত্মত্যাগের জন্য তোমরা। আমাদের সম্মান করো, শ্রদ্ধা করো, আমাদের জন্য কিছুটা চোখের জল ফেলো, তার পর আমাদের জায়গায় একে একে বিকল্প প্রেমিক গ্রহণ করে। এ চিঠি পড়ে তোমাদের অন্তর যদি দুঃখে বিদীর্ণ হয় তা হলেও আমাদের করার কিছুই থাকবে না। তোমরা যা খুশি করতে পার। বিদায়।
